করোনার ভূত ও থিয়েটারের ভবিষ্যত - লিখলেন ফণীভূষন মন্ডল

         



।। এক ।।

          পেন্নাম হই বাবুমশাই, পেন্নাম । অপরাধ লিবেননি গো, অপরাধ লিবেননি। কি কইরবো বলেন - হাতও মিলাইতে পারবো না, আর কোলাকুলিও কইরতে পারবো না। সবই বারন, বিধি বাম; থুড়ি করোনা বাম । পিরানের যে বড় মায়া গো, কি আর কইরবো বলেন ? এই যা, ভদ্দরনোকজনের সাথে কথা কইতে বসে এ কি ভাষা ! আর হবে না, এই বারের মতো মাপ কইরা দ্যান ।

     ¤ অদ্ভুতুড়ে আগন্তুক ¤

          করোনার ভূতকে আমরা এতদিনে সবাই হাড়ে হাড়ে চিনে গেছি । না জেনে কি উপায় আছে বলুন ! প্রতিদিন এই ভূতের ছানাদের হানা বেড়েই চলেছে। বিজ্ঞানও চোখ কপালে তুলেছে তার দৌরাত্মে ! এই করোনা ভূতের জুজু আমাকে আপনাকে আমাদের সবাইকে ঘরবন্দি করেছে ছু-মন্তরের তুড়িতে । যেখানে গোটা মানব সমাজ সংকটের কিনারে দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছে, সেখানে থিয়েটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে বসা আপনাদের কাছে একটু বাড়াবাড়ি ঠেকতে পারে; তবুও একেবারে গুরুত্বহীন, অপ্রাসঙ্গিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি ?


         আচ্ছা বেশ, যদি উড়িয়ে না দেওয়াই যায় তাহলে আসল সংকটটা কোথায় ? আরে মশাই এটা বলতে এত কি গুরুগম্ভীর ভাবতে বসলেন বলুন তো ? মোদ্দা কথায় সংকটটা অস্তিত্বের - আর সেই একই সুতোয় বাঁধা আমাদের মানব সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির হাজারো অনুষঙ্গ। আর হ্যাঁ, সবটাই কেমন যেন করোনা ভূতের অশরীরী ছোঁয়ায় পেন্ডুলামের মতো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে দুলছে বলুন তো ! কিন্তু এভাবে আর কতদিন ! আর কত মাস বা বছর আমাদের করোনা ভূতের অঙ্গুলি হেলনে নাচতে হবে ? তা অবশ্য এই মুহূর্তে নিক্তি মেপে বলা কঠিন ! তাই সেই মাপ-ঝোকের অনুমান নিয়ে হাপিত্যেশ না করে বরং সংস্কৃতির অঙ্গ স্বরূপ থিয়েটারের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনা নিয়ে নতুন উদ্যমে তলিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করা যাক।


          কি হল বাবুমশাইরা, আপনাদের মুখগুলো সব বাংলার পাঁচ হয়ে ভ্রু-যুগল কেমন যেন তেরছা মেরে গেল ? ও বুঝেছি। আপনারা ভাবছেন তো আমি কোথাকার আদার ব্যাপারী হয়ে থিয়েটারের আলোচনা করতে এসেছি ? না না, দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। ধৈর্য ধরুন, দেখুনই না, কারা কিভাবে বিশ্ব-মহামারী করোনা পরবর্তী থিয়েটারের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে নাটকের দরবারে ভাবনা-চিন্তা পেশ করেন।

     ¤ নাটকের দরবারে ¤

          হ্যাঁ রে ভোলা, বাকিদের কোনো পাত্তা নেই যে, ব্যাপার কি ? লকডাউনে রিহার্সাল বন্ধ বলে কি সব এই ভর সন্ধ্যায় নিজেদের লক করে বাড়িতে সিরিয়াল দেখতে বসলো নাকি ? তা সিরিয়ালও তো বন্ধ, তবে কি সব রিপিট টেলিকাস্ট দেখছে ! যাক গে, আমি একটা সিরিয়াস আলোচনার জন্য সবাইকে ডেকে পাঠালাম - তা কারোর কোনো হেলদোল নেই দেখছি ! এই দেড় দু-মাসেই কি তবে থিয়েটারি ডিসিপ্লিনে জং ধরে গেলো নাকি। এতক্ষণ ধরে আমি বকে যাচ্ছি, আর তুই ব্যাটা এসব কি করছিস বল তো ? বলেই চুপ মেরে গেলেন নটবরবাবু।



          কি যে বলেন, সোসাল ডিসটেনস্ মেনন্টেন করতে হবে না ? তাই তো চৌকিগুলো সব দূরত্ব বজায় রেখে সাজিয়ে রাখছিলাম। আর আপনি খামোখা তেতে যাচ্ছেন। সবাই আসবে, তবে আধা ঘন্টা চল্লিশ মিনিট লেট হতেই পারে - এইটুকুতু কনসিডার করাই যায় লকডাউনের বাজারে ! কি করা যায় তো নাকি ? ও নটবরদা তা সিরিয়াস আলোচনাটা কি নিয়ে একটুখানি বলুন দেখি ? নতুন কোনো নাটকের আইডিয়া আপনার মাথায় এসেছে বুঝি ?

          তোকে নিয়ে যে কি করি না ভোলা ! নতুন নাটকের কথা ভাবার মতো এখন কি সেই পরিস্থিতি হতভাগা ? দেখছিস না লাখে লাখে শ্রমিক কিভাবে এ-রাজ্যে ও-রাজ্যে আটকে পড়েছে, তাদের কাজ-কারবার বন্ধ, হাতে টাকা নেই, দু-বেলা খেতে পাচ্ছে না, বাড়ি পর্যন্ত ফিরতে পারছে না। দুনিয়াটা কেমন থমকে গেছে দেখছিস না - ট্রেন বাস, কল-কারখানা, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, রেস্তরাঁ-মল, থিয়েটার থেকে সিনেমা হল - সব, সবই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। তা তোদের নতুন নাটকটা দেখবে কে শুনি ? আর তর্কের খাতিরে না হয় ধরেই নিলাম - দু'মাস চার মাস বা ছ'মাস পরে লকডাউন উঠে গেলো, তারপরেই কি সাথে সাথে লোকে তোর নাটক দেখতে দৌড়বে ?

ছাতার থিয়েটার পথে নামল কোন দরকারে ? লকডাউনের নিয়ম মান্য হল কী ?


          তা অবশ্য ঠিক বলেছেন, কিন্তু একদিন না একদিন তো থিয়েটার হলগুলো সব খুলবে, প্রথম প্রথম একটা বা দুটো সিট গ্যাপ রেখে দর্শকদের বসানো হবে, দু-চারটে তো শো হবে নাকি ? আর তখন যদি চমকে দেওয়ার মতো কোনো প্রোডাকশন করা যায় না, তাহলে তো অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যাবে গো নটবরদা। সেই রকম একখান্ জব্বর নাটক ধরলে কেমন হয় ?

          লোকজন এমনিতেই গত দেড় - দু'মাস ধরে যেভাবে চমকে আছে না, নতুন করে চমকাতে গেলে পেঁদিয়ে হাতে হ্যারিকেন ধরিয়ে দেবে। তোর মাথায় কোন্ রাম ছাগলের ঘিলু ঢোকানো আছে বল তো, নাকি তুই লকডাউনের পর কুম্ভকর্ণের মাইক্রো ভারসানে এই দেড় মাস বাদে ঘুম থেকে উঠলি ? আরে এটা শম্ভু মিত্তিরের কাল নয়, যে দর্শক তাঁর অভিনয় দেখার জন্য ভোর থেকে লাইন দেবে। সামনে যে সময়টা আসতে চলেছে না তা করোনা পরবর্তী কাল, যেখানে একটা বড়োসড়ো রকমের বদল ঘটে যাবে। এখন থেকে সেরকমই কিছু কিছু নমুনা চোখে পড়ছে, আর বাকিটা সময়ের অপেক্ষায় ট্রায়াল রুমে কসরত ক করোর ভূতরছে। যাক গে যেটা বলছিলাম, লকডাউনের পরে যখন ধীরে ধীরে চাকা গড়াতে শুরু করবে তখন দেখবি কত লোক চাকরি খুইয়ে হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছে, আর গোটা দেশজুড়ে একটা জগাখিচুড়ি অবস্থা। তখন ক'টা লোক নিজের গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে থিয়েটার দেখতে যাবে শুনি ?



          কিন্তু একটা কথা ভুললে চলবে না, একশো দুশো কিংবা পাঁচশো টাকা টিকিট কেটে শহরের থিয়েটার হলে যারা নাটক দেখতে আসতো তাদের একটা বড়ো অংশ আবারও আসবে। আর তখন তো সিট ক্যাপাসিটি এমনিতেই তিনশোর জায়গায় একশো থেকে টেনেটুনে বড়জোর দেড়শো হবে। ফলে একদমই থিয়েটার হবে না বা দর্শক আসবে না তা কিন্তু নয়।

          আচ্ছা বেশ, তোর কথাই না হয় ধরলাম যে থিয়েটার হল চালু হবে এবং দর্শকও আসবে। কিন্তু এটা ভেবে দেখেছিস কি হলের ভাড়া থেকে প্রোডাকশন কস্ট - সব মিলিয়ে প্রতি শোয়ে যা খরচ হয়, সেটা কি টিকিট বিক্রির টাকা থেকে উঠে আসবে ? নাকি প্রতিটি শোয় দলগুলো লোকসান করে নিজেদের গ্যাঁট থেকে ভর্তুকি দিয়ে চমকে দেওয়ার মতো প্রোডাকশন চালিয়ে যাবে ? কি হল ভোলা, কিছু বল। এখন মাথা চুলকোলে হবে, চমকে দেওয়ার মতো শুধু প্রশ্ন করবি আর ভড়কে দেওয়ার মতো উত্তর দিবি না - তা কি করে হয় ?

          তা কেই বা কাকে এই বাজারে চমকাচ্ছে আর ভড়কে দিচ্ছে নটবরদা ? আরে ভোলা তুই এভাবে অপরাধীর মতো বসে বসে মাথা চুলকোচ্ছিসই বা কেন ? এসব জিগ্যেস করে সটান একটা চৌকিতে বসলো সন্দীপন।

          না চুলকে যে ভোলার কোনো উপায় নেই সন্দীপন। তবে যাই বলো, ভোলা কিন্তু একেবারে দমবার পাত্র নয়। তোমাদের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে ওই কিন্তু আমার সাথে আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী হল। আরে অসীমা, তনুশ্রী তোমরাও এসে পড়েছ দেখছি, তা দাঁড়িয়ে কেন বসে পড়। ও বুঝেছি, চৌকিগুলো ওভাবে সাজানো আছে দেখে অবাক হচ্ছ তো ! ওটা কিন্তু ভোলার কৃতিত্ব, সোসাল ডিসটেনস্ মেনে ওই সব সাজিয়েছে। তা তোমরা নির্ঘাত ভাবছ তো হঠাৎ এই বুড়োভাম তোমাদের জরুরি তলব পাঠালো কেন ? নিশ্চয়ই এটা বুঝতে পারছ যে এই তলব রিহার্সালের জন্য নয়, তবে কিসের জন্য ডেকে পাঠানো ? যাক গে, এবার তাহলে আসল কথায় আসা যাক। এই বলে নটবরবাবু বেশ গা-ছাড়া দিয়ে বসলেন।

     ¤ অভিনয়ের বারান্দায় ¤

          দেখো ঘরবন্দি থাকতে থাকতে একটা বিষয় বারংবার মনে হচ্ছিল লকডাউন পরবর্তী সময়ে থিয়েটার কি আগের মতো থাকবে, নাকি অনেকখানি বদলে যাবে ? আর যদি বদলে যায় তবে তার ধাঁচাটা কেমন হবে ? এসবের হদিশ পেতেই তোমাদের আজ ডেকে পাঠানো। কেননা একা একা তল খোঁজার চেয়ে যদি আমরা সকলে মিলে প্রত্যেকের ভাবনা চিন্তাগুলোকে একত্র করে চেষ্টা করি তাহলে পুরোটা না হলেও ভবিষ্যৎ থিয়েটারের একটা তো আদল আন্দাজ করতে পারবো। আর হ্যাঁ, এই চিন্তা বা দুশ্চিন্তা - যাই বলো না কেন, শুধু যে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে এমনটা কিন্তু নয়, বরং আমদের মতো সকলেই যারা থিয়েটার করে তাদের সবার মনে হয়তো এতো দিনে বিষয়টা কাঁটার মতো বিঁধতে শুরু করেছে। কি বলো তোমরা ?

          একদমই ঠিক বলেছ নটবরদা। এই তো সেদিন বাড়িতে কোনো এক কথার সূত্রে হিমাংশুর প্রসঙ্গ উঠলো, তখন মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেলো জানো। আরে হিমাংশুকে দেখছি না যে, ও কি আজ আসবে না নাকি ?

          আসবে অসীমাদি, আসবে। ও সেই সাতটায় এসে আমাকে বলে গেছে কাছে পিঠেই ওর একটা ছোটো কাজ আছে, সেটা সেরেই কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। আপনি যেকথা বলছিলেন ... বলেই ভোলা থেমে গেলো।

কী কী না হলে থিয়েটারটাই হবে না ? - সৌমিত্র বসু


           হ্যাঁ হিমাংশুর কথাই বলছিলাম - ছেলেটা বাবার চায়ের দোকান সামলে রোজ সন্ধ্যে সাতটায় সবার আগে রিহার্সালে আসে আর সেই সাড়ে দশটা-এগারোটায় সবার শেষে বাড়ি ফেরে। শুধু থিয়েটার করবে বলেই সে আর তেমন কোনো রোজগারের ধান্দা করলো না ! এখন তার চায়ের দোকান বন্ধ, তাই অগত্যা পেট চালাতে ভ্যানে করে সব্জি বেচচ্ছে। কিছু মাস পর যখন লকডাউন উঠে যাবে তখন কি লোকজন তার দোকানে আগের মতো চা খেতে আসবে ? আর যদি সেই সংখ্যাটা একেবারেই কমে যায় তাহলে তাকে তো অন্য কোনো রোজগারের বন্দোবস্ত করতে হবে। তখন সে কিভাবে থিয়েটার করবে, আদৌ কি করতে পারবে ?

          ইমোশনাল হও না অসীমা, এ বড়ো কঠিন বাস্তব। আমরা সবাই মিলে এই দুর্দিনে আমাদের দলের তিনজন - হিমাংশু, শ্যাম আর কানাইকে খুব কমই সাহায্য করতে পেরেছি। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি আমি আমার ষাট বছরের জীবনে দেখিনি। যাইহোক, অসীমা কিন্তু আমাদের দলের হিমাংশুর কথা টেনে এনে আজকের আলোচনার একটা প্রাসঙ্গিক খেই খুব সহজেই ধরিয়ে দিল। কেননা থিয়েটারের প্রধান স্তম্ভই তো হল অভিনয়, আর সেই অভিনয়ের ভর কেন্দ্রে আছে অভিনেতা। এবার যদি অভিনেতার জীবন ও জীবিকা চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়ায় তখন কি সেই অভিনেতার পক্ষে অভিনয় করা সম্ভব ? এই মূল ভিতটাই যদি নড়ে যায় তখন থিয়েটারের কাঠামোটাই তো চিড়্ খেতে শুরু করবে, এমনকি ধসেও পড়তে পারে। এই ভাবনাটিকে কি তোমরা একেবারে অমূলক বলে উড়িয়ে দিতে পারবে ?

          আজ আর অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না নটবরদা। অসীমাদির কথার রেশ ধরে আপনি যেভাবে আমাদের সামনে থিয়েটারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে জরুরী প্রশ্ন রাখলেন তা কিন্তু বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। কেননা একটা নাট্যদলে অনেকজন অভিনেতা অভিনেত্রী মিলে অভিনয়টা করে। এবার তাদের মধ্যে সবাই তো আর সরকারি চাকরি করে না বা স্বচ্ছল ব্যাবসাদারও নয়, থাকলেও তারা অনুপাতে খুবই কম। বাকিদের মধ্যে কয়েকজন কমবয়সী ছেলে মেয়ে, যারা সদ্য পড়াশোনা শেষ করেছে বা এখনও করছে; তাদের অধিকাংশই থিয়েটার করার পাশাপাশি চাকরির চেষ্টায় আছে। ফলে করোনা-উত্তর পর্বে সরকারি বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই চাকরির বাজারে যখন সংকট ঘনিয়ে আসবে তখন এই কমবয়সী ছেলে মেয়েদের ক'জনই বা থিয়েটার করবে ? আবার যারা ছোটখাটো কাজ বা ব্যবসা করে প্রাণের টানে থিয়েটার করতেন তাদের মধ্যেই বা কতজন আসতে পারবেন নিজের বেঁচে থাকার লড়াইটা জারি রাখার পর ? ফলে সবটা মিলিয়ে কীরকম একটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে গো নটবরদা, সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে !

          আমারও এই ক'দিনে লম্বা অবসর পেয়ে হঠাৎ ভাবতে বসে সব তালগোল পাকাতে শুরু করেছিল সন্দীপন - তাই তোমাদের আজ ডেকে পাঠানো। তোমার এই দুশ্চিন্তাটা বোধহয় এখন গোটা থিয়েটার করিয়ের মনের গভীরে সিঁদুরে মেঘের মতো উঁকি দিতে শুরু করেছে, আর তা করাটাই স্বাভাবিক। তাহলে অভিনয়ের কি হবে ?

          দেখুন নটবরদা, আমার যেটা মনে হচ্ছে যে লকডাউন উঠে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে একটা দুটো করে অভিনয় শুরু হবে। তবে তা হাতে গোনা কয়েকটা দলই শুরু করতে পারবে, যেখানে সারা পশ্চিমবঙ্গে কয়েকশো দল আছে ! এই ধরুন না আমাদের দলের কথা - সব মিলিয়ে বারোজন সদস্য, তার মধ্যে আমরা পাঁচজন সরকারি চাকরি করি আর অমিতের পৈতৃক সূত্রে অভাব নেই, ফলে বাকি ছ'জন যদি নিজেদের রোজগারের চক্করে থিয়েটারে অনিয়মিত হয়ে পড়ে তখন আমরা কি অভিনয় করে উঠতে পারবো ? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অধিকাংশ দলেরই এরকমই একটা অনুপাত দাঁড়াবে, তখন কি আর আগের মতো থিয়েটার করা যাবে ? আর যদি করা সম্ভবও হয় তাহলে থিয়েটারের চালু ফর্মাটের বিস্তর রদবদল ঘটবে বলে আমার অন্তত মনে হয়।



          কিসের এতো রদবদলের কথা বলছ গো তনুশ্রীদি ? ভেতরে ঢুকতে ঢুকতেই হিমাংশু নিজেই বলতে শুরু করল - করোনার চক্করে এমনিতেই জীবনটা পাল্টে গেছে আর থিয়েটার পাল্টাবে না তা কি করে হয় ! যাক গে, আমি মাঝখানে ঢুকেই গোল পাকালাম।

          আরে না না, তুই কেন গোল পাকাতে যাবি, করোনাই যতো পাজি নচ্ছার। তুই বোস্ তো আগে, থিয়েটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নটবরদা উদ্বিগ্ন হয়েই আজ আমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। তনুশ্রীর চিন্তাটা কিন্তু আরও উদ্বিগ্ন বাড়িয়ে দিল। সত্যিই তো এরপর ক'টা দলই বা সারভাইভ করতে পারবে ? হয় তাদের পাঁচ-ছ'জন অভিনেতা অভিনেত্রী নিয়ে নাটকের কথা ভাবতে হবে নয়তো দীর্ঘদিন দলের অভিনয় বন্ধ রাখতে হবে। এবার যদি তারা সীমিত অভিনেতা অভিনেত্রী নিয়ে নাটক করার কথা ভাবেন তাহলে নাটকের কনটেন্ট নিয়েও যথেষ্ট ঘষা-মাজা করতে হবে। ফলে একটার সঙ্গে আর একটা বিষয় যেভাবে জড়িয়ে আছে তা কিন্তু অনিবার্যভাবে বদলে যেতে বাধ্য হবে। জানি না, আদতে কোথায় গিয়ে থিয়েটারটা পৌঁছবে !

          একদমই আমাদের মনের কথা বলেছ অসীমাদি। আর এটা তো ঠিকই যে, থিয়েটারের বেশ একটা বড়োসড়ো বদল আসতে চলছে, কিন্তু কোন্ কোন্ দিক থেকে এবং কতরকমভাবে বদল আসতে চলেছে তা এখুনি বলা মুশকিল। তাই ওসব কথার ফাঁকে আমি বরং একটু অন্য কথা বলি। দেখো কোনো না কোনো সমস্যা তো থাকবে, আর থিয়েটার সেই সমস্যাকে ঠিক কাটিয়ে উঠবো। এখন আমরা হাতে অনেকটা সময় পেয়েছি, আর সেই সময়টাকে যদি পজিটিভলি কাজে লাগাই তাহলে অন্যরকমভাবে ভাবা যেতে পারে। মানে আমরা সবাই কম বেশি বলতাম - ইস্ যদি একটু ফাঁকা সময় পেতাম তাহলে থিয়েটারের বইপত্র আরও খুঁটিয়ে পড়তে পারতাম। কিংবা নানারকম ফিজিক্যাল অ্যাক্টিং নিজের মতো করে প্র্যাকটিস করতে পারতাম বা দেশ বিদেশের ভালো অভিনেতা অভিনেত্রীর অভিনয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পারতাম - এইরকম আরও অনেক কিছু। এখন যদি আমরা এই 'ইস্'-গুলোকে নিজেদের মতো করে যতটা সম্ভব ঝালাতে পারি তাহলে সেটা পারফর্মার হিসেবে কম কি ! বরং তা উপরি পাওনা হতে পারে !

          খাসা বলেছ হিমাংশু, এই প্র্যাকটিসটাতো আমাদের সবাইকে করতেই হবে। এবার আমরা বরং অভিনয় থেকে বেরিয়ে দর্শকদের দিকে আলো ফেলি। ঝপ করে আলো নিভে গেল, পুরো পাড়াটাই লোডশেডিং-এ অন্ধকার। (চলবে...) 

Post a Comment

0 Comments