পথনাটককে পোস্টার ড্রামা বলতে আমি রাজি নই - বলেছিলেন পথনাটকেরই জনক পানু পাল




ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য পূর্ণেন্দু শেখর পাল বা পানু পাল-এর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর নাতনী মধুমিতা পাল -এর লেখা

আগের পর্বটি পড়ুন এই লেখাটি ক্লিক করে  (প্রথম পর্ব) 

।।  ২  ।।

প্রথম পর্বের পর.>   এত কিছু কথা বলেছি, কিন্তু বলা হয়নি ওর “হাঙ্গার এন্ড ডেথ”, অন্যতম মাইলস্টোন একটা বিখ্যাত সৃষ্টি আইপিটিএ যুগের। রংপুরের বিনয়ের বোন শ্রীমতী রায়চৌধুরী দাদু ভাইয়ের সঙ্গে নাচেন নৃত্যনাট্যটিতে। এই নৃত্যনাট্যে দাদুভাই হতেন ডেথ আর রায়চৌধুরী হতেন হাঙ্গার। এমনও কথিত আছে গ্রামেগঞ্জে, এই নৃত্যনাট্য দেখে তাদের যা কিছু আছে চাল-ডাল তাদের গায়ের সামান্য গয়না সমস্ত খুলে পার্টি কমরেডদের হাতে তুলে দিতো। নৃত্যনাট্য দেখার পরে হাপুস নয়নে কেঁদেছিল সরোজিনী নাইডু, দাদুভাই স্তম্ভিত হয়ে গেছিল। তেতাল্লিশের মন্বনতরের উপরে ওখানে এটি তৈরি হয়েছিল, করেছিল পানু পাল।

 পানু পানু অন্যত্র বলেছেন, "একবার তো অতি উৎসাহের আতিশয্যে গায়ের জামাটা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম বিদেশি বস্ত্র পেড়ানোর আন্দোলনে। বাড়ি ফিরে খুব ভয়ে ভয়ে ব্যাপারটা বাবাকে জানাতেই বাবা বললেন সব ঠিক আছে তবে একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে জামাটা বিদেশি কাপড়ের ছিল না। এই ছিল আমার বাবা, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বাবার ছিল নাচ, গান ইত্যাদিতে প্রবল উৎসাহ যদিও ঠাকুরদার ছিল ভীষণ আপত্তি। ছোটবেলা থেকেই তাই অবচেতনেই চলছিল একদিকে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ অন্যদিকে সাংস্কৃতিক মননশীলতার চর্চা।

এরই মধ্যে একবার জেলখাটা হয়ে গেল, যা পরাধীন এবং  স্বাধীন ভারতবর্ষে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।  তখন বয়স মাত্র ১২, খুব সামান্য কারণে বিপর্যয় ঘটেছিল। কুড়িয়ে পাওয়া একটা কৌতুক বোমা বন্ধুদের সঙ্গে কৌতুহলবশে ফাটিয়ে ফেলার অপরাধে। বিদেশী শাসকদের কাছে সন্ত্রাসবাদি আখ্যা পাবার মতো উপযুক্ত বয়স আমার হয়েছে। এক বছরের জেল, অভিজ্ঞতাটা একটানে দূর দূর নিয়ে গেল আমায়। আর হেমচন্দ্র বক্সের কাছে ছোটবেলার পড়াশুনা পরবর্তীকালে ডাকাতির আসামী হিসাবে চালান হয়েছিলেন আন্দামানে নিশ্চয়ই মনে আছে সবার। এভাবেই কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে প্রস্তুত হলাম। কলেজে পড়াকালীন সময়ে প্রায় অগোচরে ভালোবেসে ফেললাম নাচকে, প্রথাগত কোন অনুশীলনের মধ্যে নয় একান্তভাবেই নিজের তাগিদে রংপুর ঘুরতে ঘুরতে যেগুলো সংগ্রহ করেছি সেই তাগাদাতে। চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি করেছিলাম ছন্দ এবং সুরের একটা অন্যরকম ভাষা। সেই সময় একটা সুযোগ এলো উদয় শংকর-এর অনুষ্ঠান দেখবার। আমার তরুণ রক্তে নৃত্যের মাদকতা যখন ছড়িয়ে পড়ছিল আমার পুরো শরীরে। অনুষ্ঠান হয়ে গেল, যখন এদিকে আমি নৃত্যে মশগুল অন্যদিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের চেতনা তৈরি হচ্ছে মনের গভীরে। জীবনের মূলে আছে যে মানুষ সেই মানুষের জন্য আন্দোলন- কৃষক আন্দোলন। যেমনভাবে গ্রামীণ পরিবেশ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল আমার নৃত্যের ভাষা তেমনি গ্রামীণ জনজীবন হয়ে উঠেছিল আমার রাজনৈতিক চেতনার উৎস। তাই বারবার আমি এ কথাটাই জোর দিয়ে বলতে চাই- আমি কৃষক আন্দোলনের লোক। তাই শহর কেন শুনবে আমার কথা ? মনে রাখবে আমার গভীরে বেড়ে ওঠা আশা-আকাঙ্খা-আন্দোলনের কথা ?


রাজেন তরফদার এর নাগপাশ ছবিতে গণশিল্পী পানু পাল ও মৃণাল সেনের স্ত্রী শ্রীমতি গীতা সেন কে এই ছবিতে পাওয়া যাচ্ছে 


১৯৩৮ এ প্রথমবার কলকাতায় এলাম, তখন কলকাতার রাজনৈতিক আন্দোলনের পেক্ষাপটে সুভাষ বোস-এর সাহসী পদচারণা আর সাংস্কৃতিক মন্ত্রী ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের নতুন আন্দোলনের আবেগ। উত্তেজনাগুলো আমার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিল। প্রায় দু’বছর কলকাতায় কাটিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফিরে গেলাম রংপুর। ওখানে কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে তৈরি করলাম তরুণ নাটকের দল। প্রথম নাটক “রোল নাম্বার ৪৯”। আমার প্রথম মঞ্চস্থ করা হালকা হাসির নাটক। পশ্চিম ইউরোপে তখন নেমে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো ছায়া, আর তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র বিশ্বে। এবার আন্দোলন-  শিল্পকে করে তুলতে হবে সংগ্রামের হাতিয়ার। চারিদিকে তার তোড়জোড়। শিল্পের সংজ্ঞা দ্রুত বদলে যাচ্ছে “ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে” আসছে সাম্যবাদের ঢেউ। আমারও রাজনৈতিক চেতনায় উঁকি দিচ্ছে নতুন শ্রেণীহীন শোষণমুক্ত বিশ্বের ভাবনা। বলশেভিক কাগজ ইন্ডিয়া এবং আরও অসংখ্য নিষিদ্ধ সাম্যবাদী চেতনার বই পত্রিকা ইত্যাদি আমার চেতনাকেও ধারালো করছিল। ততদিনে আমি অবশ্য নিজেকে আরও বেশি করে জড়িয়ে ফেলেছি কৃষক আন্দোলনের মধ্যে। অক্লান্তভাবে ছুটে বেড়াচ্ছি এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে, এক মহকুমা থেকে অন্য মহকুমায় সংগঠনের প্রয়োজনে। একদিকে কৃষকদের ন্যায্য দাবি দাওয়া চাহিদাকে সাম্যবাদী আন্দোলন, অন্যদিকে তাদের মুখের ভাষার প্রথম ইত্যাদির অন্নেষণ- এই দুইয়ের মধ্যে আমার জীবন তখন উত্তাল।"

একটা গানের কথা খুব মনে পড়ছে, এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে সংগ্রহ করেছিলাম গানটা। এ প্রসঙ্গে বলি, আমি যখন খুব ছোট তখন দাদুভাই এই গানটা না প্রায়ই বাড়িতে করতো, মনে নেই। একটু পাঁচালী টেনে টেনে একই রকম সুর বারবার ফিরে আসছে। গানটা রংপুরের কোন একটা জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। গানটা এইরকম- ডাঙ্গর বধুয়া তুই ঘোরাবার বালুচর সেই কয়তর আনিয়া দিল আন্ধার নিশাকালে রে, বধুয়া তুই কয়তর নারো, কয়তর  চারও, কয়তর এর নাইরে পইরা। পিদিম জালাইয়া দেখো, দাঁড়াক কাওয়ার বাচ্চারে কাউয়ার বাচ্চা। ডাঙ্গর বধুয়া তুই আবার চালু রে কাটার আনিয়া দিল আন্ধার নিশাকালে রে, ডাঙ্গর বন্ধুয়া তুই।


পানু পালের কোথায়,


১৯৪৩, বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবী আর বিশ্বযুদ্ধ সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলছে দেশে অন্নের হাহাকার। রংপুরে অনাথ আশ্রম খোলা হলো যেখানে ঠাঁই পেল ৪৩ জন অনাথ ছেলে মেয়ে। সেই বছরই আবার রংপুরে মহকুমা কৃষক সম্মেলন তোড়জোড় চলছে। অনুষ্ঠানে সরোজ মুখার্জি আসবেন। অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায় দিন-রাত ডুবে রয়েছি এই সময় অবলম্বনে একটা নৃত্যনাট্যের পরিকল্পনা করি। তুমুল আলোড়ন ফেলেছিল নৃত্যনাট্যটি। এদিকে ৪৩ গড়িয়ে ৪৪ সাল। কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন কলকাতায়। আমিও রংপুর স্কোয়াড নিয়ে হাজির হলাম ওখানে। তখন এইসব রাজনৈতিক সম্মেলনে প্রচুর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। আমরা সেখানে মঞ্চস্থ করলাম নৃত্যনাট্য “হাঙ্গার এন্ড ডেথ”। প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল নৃত্যনাট্যটি কলকাতাতে। উচ্ছ¡সিত লেখা বেরোচ্ছে কাগজে আর আমি রংপুরের কৃষক আন্দোলনের এক কর্মী হঠাৎ করে কলকাতার সাংস্কৃতিক জগতের পাদপ্রদীপে চলে এলাম। কলকাতা সম্মেলন শেষে আবার ফিরে গেলাম রংপুর। নতুন অভিজ্ঞতায়  আরো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মঞ্চ গঠনের কথা মাথায় জমা বাঁধছে। কিন্তু ভাবনার জল শুকোতে শুকোতে ডাকলো কলকাতা থেকে। পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডেকে পাঠিয়েছেন সারা ভারত কৃষক সম্মেলন (৪৪) উপলক্ষে অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়া যেতে হবে। একা প্রায় এক বস্ত্রে চলে গেলাম বিজয়ওয়াড়া। কিছুদিন পর অবশ্য উষা দত্ত (নৃত্যশিল্পী) এবং অন্যান্যরা যোগ দিয়েছিলেন। ওখানে অনুষ্ঠিত হলো নৃত্যনাট্য “ক্ষুধা ও মন্বন্তর এন্ড ডেখ”। এখনো মনে পড়ে কি প্রচন্ড আলোড়ন তুলেছিল নৃত্যনাট্যটা। দেওয়ার পালা শেষ করে এবার বোম্বাইয়ে নতুনভাবে গুছিয়ে নিয়ে তৈরি হলো বেঙ্গল স্কোয়াড। মালাবার হইছে প্রথম অভিনয়  "ক্ষুধা ও  মন্বন্তর” এবং বিজন ভট্টাচার্যের লেখা জবানবন্দির হিন্দিতে অনুবাদ করা “অন্তিম অভিলাষ”। এসময় খুব মনে পড়ে শম্ভু মিত্রের সহযোগিতার কথা। সুহাসিনী দেবী, যিনি ছিলেন সরোজিনী নাইডুর বোন, অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে তিনি এতটাই উচ্ছসিত হলেন যে আমাদের আমন্ত্রণ করলেন এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অনেকের মধ্যে বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিত, সরোজিনী নাইডু যিনি অনুষ্ঠান শেষে প্রায় কেঁদে উঠে বলেছিলেন, ‘ইজ দিস আওয়ার বেঙ্গলি ?' পরে কোন এক সমুদ্র তীরে প্রায় ৮ হাজার দর্শকের সামনে অনুষ্ঠানটা হয়েছিল। সেখানেই পরিচিত হলাম পৃথ্বীরাজ কাপুর, তখন যদিও খুব ছোট  হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় সেই সব বিখ্যাত মানুষদের সঙ্গে। বোম্বাই থেকে চলে গেলাম সূরাত, আমেদাবাদ ইত্যাদি স্থানে অনুষ্ঠান করতে। শেষে আবার মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে কলকাতা।



পানু পালের  নিজের হাতের লেখার 1979 সালের ডাইরি। যখন ওনাকে  নাগপাশ সিনেমার জন্য টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে ডেকেছিলেন ,সেখানে গিয়ে উনার কি অভিজ্ঞতা সেটা উনি নিজের হাতে লিখেছেন



কি লিখবো? শুধু চেতনার আগুন ছড়িয়ে দেবার কথা? কিন্তু নিজেদের মধ্যে কোথায় সেই উত্তাপ? কোথায় সেই চেতনা? শুধু  স্বার্থপর ,ক্ষুদ্রতা সেইসব নিয়েই যেন সবাই মত্ত। যে রাজনৈতিক চেতনাকে সঙ্গী করে এগিয়ে গিয়েছিলাম তার লেশমাত্র নেই নিজেদের মধ্যে। তবুও এর মধ্যেই এই সমস্ত অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করেই ধারণা হচ্ছিল আইপিটিএ গঠন করার। আবার রংপুর ও কৃষক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলন দেখতে দেখতে চলে এলো ১৯৪৬-এর অন্তর্র্বর্তী নির্বাচন। সেই সঙ্গেই আমার জীবনের অন্য এক অধ্যায়। ভোটের আর তখন মাত্র ১৭ দিন বাকি। বিয়ে ঠিক করে ফেললেন, পাত্রী ময়মনসিংহের শেরপুর গ্রামের শ্রীমতি মমতা দত্ত। খেপি চলেছে এখনো আমার অসহায়  নিঃস্ব জীবনের একমাত্র সহায়।



নির্বাচনের কিছুদিন আগের কথা। ভবানী সেন আসছেন রংপুরের সমাবেশে। প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততা তখন। সমাবেশের সাংগঠনিক প্রস্তুতি অন্যদিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কাজ। এমন ব্যস্ততার মধ্যে অতি দ্রুত প্রায় এক নিঃশ্বাসে লিখে ফেললাম ‘প্রিমিয়ার কথা’ বলে পাঁচালী ধর্মী একটি লেখা। সমাবেশে তার আবৃত্তি হল। ভবানী সেন পর্যন্ত ভীষণ উৎসাহিত হয়ে বললেন আর একটা কপি তাকে তখনই দিয়ে দিতে। পরের সপ্তাহেই সেটা ছাপা হল স্বাধীনতা কাগজে এবং আরো প্রচুর ফোল্ডারে ছাপিয়ে বিলি করা হল বিভিন্ন জেলায়।


নির্বাচনের পালা শেষ হতে না হতেই চিঠি পেলাম হেমাঙ্গ-র (হেমাঙ্গ বিশ্বাস) কাছ থেকে। পার্টির নির্দেশে সিলেট যেতে হবে স্কোয়াড তৈরীর জন্য। আমার লেখা নাটক ‘রক্তের ঋণ’, কাটুন ধর্মী নাচ ‘ফ্রিডম মেড ইন ইংল্যান্ড’ আর হেমন্ত থাকতোই। তখন ওর গলায় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র নবজীবনের গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে আসামের রাজধানী শিলংয়ে গেলাম। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ এতটাই উৎসাহিত হলেন যে তিনি আমাদের যাবতীয় কর মুক্ত করে দিলেন। অনুষ্ঠান না করেই ফিরে আসতে হলো ।
এরপর  আগামীকাল  || ৩ || পর্ব পড়ুন




সাম্প্রতিক পথনাটকের ছবি

Post a Comment

2 Comments

Satya Jit said…
শ্রী বিমল মজুমদার লিখেছেন,
যাঁরা এই ব্লগ পড়ছেন ,তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী আছেন, তাঁদের জন্য এই রচনাটি এখানে সংযুক্ত করা হলো ।

পানু পাল , ভাল নাম পূর্ণেন্দু শেখর পাল। ভাল নামের চেয়ে পানু পাল নামেই সমধিক পরিচিত এবং বিখ্যাত। পথ নাটকের জনক নাট্যকার ,অভিনেতা,নৃত্য শিল্পী পানু পালের জন্ম বৃটিশ ভারতের রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহাকুমায়। পথনাটকের জনক হলেও তার সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয় নৃত্য দিয়ে।
জন্ম ১৯১৯ সালের ২০ জানুয়ারী্ । বাড়ীতে সংস্কৃতি চর্চার আবহ ছিল, ছিল রাজনৈতি চর্চাও। কিশোর বয়েসেই বিদেশী দ্রব্য জ্বালাও আন্দোলনে নিজের জামা পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিশোর বয়েসেই জড়িয়ে পড়েন কৃষক আন্দোলনের সাথে। তখণ বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরে চলছিল তুমুল কৃষক আন্দোলন। মাত্র ১২ বছর বয়েসে জেল খাটার অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। কুড়িয়ে পাওয়া একটি কৌটা বোমা ফাটানোর জন্য ।এক বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হন। ছোট বেলায় শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী হেম চন্দ্র। তার প্রভাব তাকে প্রগতি শীল চিন্তা চেতনায় প্রভাবিত করে।
কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে কলেজে পড়ার সময় ভালবেসে ফেলেন নাচ। কোন প্রথাগতো শিক্ষা ছিলনা,একান্ত ভাবে নিজের তাগিদে চার পাশের প্রকৃতি ওপরিবেশ থেকে অনুপ্রানিত হয়ে সৃষ্টি করেন ছন্দ ও সুরের ভাষা। সে সময় উদয় শঙ্করের একটি অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়ে যায়।তার তরুণ রক্তে নৃত্যের মাদকতা ছড়িয়ে পড়ে। নিজের এটা অনুষ্ঠান হয়ে যায় এবং প্রশংসা লাভ করে। একদিকে কৃষক আন্দোলনের ফলে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ অন্যদিকেসাংস্কৃতিক মননশীলতার চর্চা,একজন স্বাচ্চা প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মীতে রুপান্তরিত হন পানু পাল।কৃষক আন্দোলনের কর্মী হিসেবে ঘুরে বেড়ান এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রাম, এক মহাকুমা থেকে অন্য মহাকুমা। একদিকে কৃষকদের ন্যায্য দাবী দাওয়া চাহিদাকে সাম্যবাদী আন্দোলনে রূপদান অন্যদিকে তাদের মুখের ভাষা,লোকাচার ,প্রথা ইত্যাদি অন্বেষন তার পরবর্তী সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে হৃদ্ধ করেছে।
এই সময় হাতে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু বই,রজনী পাম দত্তের বই Modern India.আরো অসংখ্য নিষদ্ধ সাম্যবাদী বই,পত্রিকা ইত্যাদি। যা তার চেতনাকে অরো শানিত করে।
১৯৪১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে রংপুর মহাকুমা কৃষক সম্মেলনে অতিথি হয়ে আসেন প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা সরোজ মুখার্জি। সেখানে মঞ্চস্ত হয় পানু পালের লেখা নৃত্য নাট্য ”মৃত্যু ও ক্ষুধা”[ Death and Hungr] সরোজ মুখার্জি এটি দেখে খুব উদবুদ্ধ হন। তিনি কলকাতায় ফিরে শ্রদ্ধানন্দ পার্কে ফেসিবাদ বিরোধী লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্মেলনে ”ক্ষুদা ও মৃত্যু ”নৃত্য নাট্য নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেখানে “ক্ষুধা ও মৃত্যু” নৃত্য নাট্য ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরের দিন পত্র পত্রিকায় অনুষ্ঠানের ছবি ও পানু পলের প্রশংসা প্রচারিত হয়।সেখানে উপস্থিত হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও নির্মলেন্দু চৌধুরী পানু পালের খুব প্রশংসা করেন। রংপুরে ফিরে সংগঠনের কাজে মনোযোগ দিতেই কলকাতা থেকে টেলিগ্রাফ পান। অনুষ্ঠান করতে যেতে হবে অন্ধ প্রদেশের বেজোয়ারায় সেখানে সারাভারত কৃষক সম্মেলন ।
সেখানে মঞ্চস্ত হয় নৃত্যনাট্য ”ক্ষুধা ও মৃত্যু” । সেখান থেকে কলকাতায় ফিরে রংপুর যেতে চাইলে পার্টির নির্দেশে বম্বে যেতে হয় বেঙ্ল স্কোয়াডের সদস্য হয়ে। অন্যান্যের সাথে সফর সঙ্গী ছিলেন শম্ভু মিত্র। বম্বের মালাবার হিলসে মঞ্চস্ত হয় “ক্ষুধা ও মৃত্যু”।প্রায় আট হাজার লোক দেখেন নৃত্য নাট্র টি। সবাই মুগ্ধ হন। সেখানে উপস্থিত স্বধীনতা সংগ্রামী সরোজিনি নাইডু কেঁদে ফেলেছিলেন। এরপর পরের কমেন্টে...
Satya Jit said…
শ্রী বিমল মজুমদার লিখেছেন, আগের কমেন্টের পর...

অর এক স্বধৗনতা সংগ্রামী বিজয় লক্ষী পন্ডিত এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন , তিনি তাঁর রাজ্যে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে ছিলেন।
১৯৪৩ সালে আইপিটিএ প্রতিষ্ঠিত হয়্ প্রথম নাটক ”নবান্ন”। রচনা বিজন ভট্টাচার্য। নির্দেশনা শম্বুমিত্র ও বিজন ভট্টাচার্য। নাটক পেল নতুন ভাষা, নতুন চরিত্র। এতোদিন নাটক হতো পৌরানিক অথবা ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়ে। এবার পাত্র পাত্রী সাধারণ মানুষ,সংলাপের ভাষা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে্ই পানু পাল আইপিটিএর সাথে যুক্ত ছিলেন।
নাটকের নতুন ধরণ পানু পালকে বেশ আলোড়িত করেন।
কলকাতা থেকে ফিরে নতুন ভাবে কাজে মনোনিবেশ করেন। ১৯৪৬ সালে অন্তবর্তীকালীন নির্বাচনের প্রচরের জন্য লিখেন “পিরু মিয়ার কথা” পাঁচালী ধর্মী একটি লেখা। এখানে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা ভবানী সেন। লেখাটি ভবানী সেনের এতো পছন্দ হয় , তিনি একটি কপি চেয়ে নেন এবং স্বাধীনতা পত্রিকার ছাপার ব্যাবস্থা করেন। ফোল্ডার আকারে ছেপে বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দেন নির্বাচনের প্রচারে কাজে লাগানোর জন্য। নির্বচনের কাজ শেষ হতে নাহতেই ১৯৪৬ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বসের সাথে আইপিটি এর কাজে আসামের সিলেট অঞ্চলে যেতে হয়।।সেখানে নতুন ছেলে মেয়ে জোগাড় করে আইপিচটএ গড়ে তোলেন। সে খানে তার লেখা নাটক “ রক্তের ঋণ” আর কার্টুন ধর্মী নাচ Freedom made in England
সাথে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান। ১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষ স্বাধীনতার বছর অনেক স্বপ্ন ভঙ্গের বছর। পানু পাল তখনো সিলেটে। সিলেটের ভবিষ্যৎ তখনো অনিশ্চিৎ । ভারত না পাকিস্তান কোন দেশে অবস্থান হবে।তখনো তারা মানে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, বিশ্বনাথ মুখার্জী , নির্মলেন্দু চৌধুরী ,পানু পাল সিলেট অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পরে সিলেট গণভোটে পাকিস্তানে থেকে যায়।১৯৪৮ সালে পানু পাল রংপুর হয়ে কলকাতায় চলে যায়। সদ্য স্বধীন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ, গননাট্টের অবস্থাও ভাল নয়। তখন পরিচয় হয় ঋত্বিক ঘটক ও মৃনাল সেনের সাথে।তখন লিখেন নাটক ’দখল’। মৃনাল সেন দখল মঞ্চায়নের ব্যাবস্থা করেন। এই সময় অভিনেত্রী শোভা সেনের মাধ্যমে নিমাই ঘোষের সিনেমা” ছিন্নমূল” এ অভিনয় করার সুযোগ পায়।
আইপিটিএর সাথে ভুল বোঝাবুঝি কারনে ’৫০ এর শুরুতে ঢাকায় চলে আসেন।বুলবুল চৌধুরীর সাথে বানিজ্যিক ভিত্তিতে কয়েকটি ব্যালে তৈরী করে চট্টগ্রাম, ঢাকা,কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ইত্যাদি জায়গায় অনুষ্ঠান করেন। তারপর পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী,লাহোর মুলতান,পেশোয়ার আরো অনেক জায়গায় অনুষ্ঠান করে প্রায় দুই বছর পার করে কলকাতায় ফিরে যান। ১৯৫২ সালে স্বধীন ভারত বর্ষে সাধারণ নির্বাচন। ইতিপূর্বে উমানাথ ভট্টাচার্যের বাড়ীতে পরিচয় হয়েছে উৎপল দত্তের সাথে। তখন লিখেন নাটক” ভাঙ্গা বন্দর।”এবং মঞ্চায়ন করেন। তারপরলিখেন নাটক বিচার ,বিসর্জণ। এদিকে নির্বচন এগিয়ে এলে, পানু পালের মাথায় কাজ করতে থাকে , কি করে বেশী মানুষের কাছে অরো জোড়ালো ভাবে নাটকের বক্তব্য পৌঁছে দেয়া যায়। কি করে নাটককে চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে যাওয়া যায়্। এই ভাবনা থেকেই লিখেন নাটক “ভোটের ভেট”। নাটকটি পড়ে ইৎপল দত্ত খুব উৎসাহ বোধ করেন , এবং অভিনয় করতে আগ্রহ বোধ করেন। নাটকে চারটি চরিত্র। অবিনয় করেন উমানাথ ভট্টাচার্য,উৎপল দত্ত, ঋত্বিক ঘটক ওপানু পাল। ১৯৫২ সালে কলকাতা শহীদ মিনারে এক নির্বচনী সভায় প্রথম মঞ্চায়িত হয় ”ভোটের ভেট”। বাংলায় প্রথম পথ নাটক। উৎপল দত্ত যাকে বলতেন পোস্টার ড্রামা। প্রথম মঞ্চায়নেই সফলতা। বিভিন্ন এলাকার প্রার্থীদের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেতে লাগলেন এবং নানান জায়গায় অভিনিত হতে লাগলো। নাটক পরিবেশনার নতুন আঙ্গিক ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সেই থেকে পথ নাটকের প্রচলন হয়্। একনো যা সমান ভাবে জনপ্রিয় এবং প্রাসংগিক।'