কুমার রায় বলেছিলেন - নাট্যকর্মের সামাজিক মূল্য নির্ণয় করা শিল্পকর্ম হিসাবে তার সততা এবং সার্থকতা দিয়ে বিচার করা হবে

লেখাটা কুমার রায়ের ১৯৮৭-৮৮ সালের । সে সময়ে বাংলা নাটকে পরিস্থিতির উপর চোখ রেখে কুমার রায় লিখছেন এ রচনা । গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন চলছে, নাট্য প্রতিযোগিতা চলছে ,রাজ্যে আগের সরকার, নাট্য একাডেমি আছে।প্রচুর দল, প্রচুর নাটক।
দেখুন তো পরিস্থিতি  প্রায় এক কিনা!পুরনো লেখা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়লে  তা থেকে শিল্পকর্মের একটা রেফারেন্স ফ্রেম পাওয়া যায়।বহুরূপী তখনও ১লা মে তাঁদের নতুন নাটক নামায়। ১লা মে বহুরূপী ৭০ ছোঁবে । আজকের ব্লগ এ শ্রীযুক্ত কুমার রায়ের লেখাটি রইলো।




শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, অমর গাঙ্গুলীদের সাথে কুমার রায়



।। একটি আলোচনা ।।


কুমার রায় 


নবনাট্য আন্দোলন বা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের বিভিন্ন দিক দিয়ে পত্র পত্রিকায় এক সময় একটা সজীব আলােচনা শুরু হয়েছিল তাতে তর্ক ছিল, কটাক্ষ ছিল, উত্তেজনা ছিল এবং কিছু নিরপেক্ষ আলোচনা ছিল। সেই কাল বোধকরি শেষ হয়ে গেছে। সত্তরের দশক থেকে ব্যাপারটা কেমন পাল্টে গেল। কেন এমন হল? এ সমীক্ষা অবশ্যই করা যায়। মনে পড়ে আমাদের এক বন্ধু এক সময় বলেছিলেন, "বাংলা সাহিত্যে প্রশ্ন চিহ্ন উঠে গেছে।" তার এই তীর্যক উক্তি অনেকাংশে সত্যি, নাটকের ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। এই পর্বের সূত্রপাত বোধকরি সেই সময়, যখন সবাই কেমন আত্মতৃপ্ত বােধ করছিলেন, যেন সমস্যাহীন আপন আপন কর্মক্ষেত্রে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। এই পর্বে কোন তর্ক নেই, প্রশ্ন নেই, আছে আত্মকথন নেই।




এখন যে আলোচনাটা সবচেয়ে বেশী করে হচ্ছে - সেটা নাট্যদলগুলির নাভিশ্বাস নিয়ে, বাংলা থিয়েটারের দুর্দিন নিয়ে, কেননা গ্রুপ থিয়েটারের দর্শক দাক্ষিণ্য ক্রমশঃ কমে যাচ্ছে। অথচ গ্রুপ থিয়েটারের কাজের অন্যতম দায়িত্ব ছিল নতুন দর্শক তৈরি করা। ষাটের দশক পর্যন্ত সে কাজটা হয়েছিল - এবং দর্শকও এই থিয়েটারে সামিল হচ্ছিল। আজ কেন এমন অবস্থা হল? এ প্রশ্নটা জরুরী।




দর্শকের আবেগ এবং আকাঙ্ক্ষাকে কি গ্রুপ থিয়েটারের কর্মীরা অবজ্ঞা করেছেন? বােধ হয় করেছেন। দর্শক কী প্রত্যাশা করেছিল - এবং কী না পেয়ে ফিরে গেল এটা ভাববার সময় এসেছে। 



নাট্য আন্দোলনের প্রথমাবধি সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা উচ্চারিত হয়ে আসছে গুরুত্ব সহকারে। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা যত কথা বলেছি তার সিকি ভাগ কথাও আমরা বলিনি নাট্য সমগ্রতা নিয়ে। অথচ দায়বােধের কথাটা যেমন মানুষের জন্য সমাজের জন্য তেমন‌ই প্রত্যেকটি আলাদা শিল্পের জন্য নির্দিষ্ট দায়বােধের কথা থাকে। এসব দিয়েই নাট্যসমগ্রতা গড়ে উঠবে।



আমরা যে আদর্শ রাষ্ট্রের কল্পনা করি তা মানুষের কল্যাণ করতে পারবে তখনই যখন সে রাষ্ট্র আদর্শ অনুযায়ী সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। তার সঙ্গে যদি অসম্পূর্ণতার ছাপ থাকে তবে সে কল্যানধর্মী রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনা। তেমন‌ই  শিল্পকে, এক্ষেত্রে থিয়েটারকে সামাজিক দায়িত্ব সম্পন্ন করে তুলতে পারি যখন শিল্প হিসেবে সেটা সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। কেননা, কোন নাট্যকর্মের সামাজিক মূল্য নির্ণয় করা শিল্পকর্ম হিসাবে তার সততা এবং সার্থকতা দিয়ে বিচার করা হবে।



পড়ুন - নাট্যকার পানু পাল, আলো করলেন তাপস সেন, দর্শক উৎপল দত্ত, সাল ১৯৫৩, আর...


সমাজ প্রগতির বক্তব্যে ঠাসা অনেক নাটক হয়েছে - কিন্তু খুব কম নাটকেই এই সার্থকতা এবং সততা শিল্পের মানদণ্ডে নির্ণীত হয়েছে। নাট্যকর্মের নিজস্ব মান উপেক্ষা করে তার প্রগতিশীলতা প্রতিপন্ন হয় না। আমরা যে সামাজিক দাবীর কথা বলছি সেই সূত্রে শিল্পের বিশিষ্ট মানের দাবীটাও সামাজিক দায়দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যেকটি কাজের একটি নির্দিষ্ট মান আছে, সেই মানের উন্নতি না ঘটলে সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিচ্যুতি ঘটে। বাংলা নাটক নিয়ে এই আশঙ্কার কারণটা এই সমাজিক দায়িত্বের বিচ্যুতি।



বাক্‌বিতন্ডার মধ্যেও বেশ কিছু নিদর্শন নাট্যচর্চ্চার ক্ষেত্রে দিকদর্শক হয়ে আছে, যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব সেসব নিদর্শনে আবশ্যকীয় শর্ত পালন করা হয়েছে। প্রকাশের গাফিলতি ঘটলে অর্থাৎ দর্শকের কাছে যা কিছু প্রকাশ তাতে গাফিলতি ঘটলে নাট্যকর্মের পুরো চেহারাটা পালটে যাবে। দর্শক হতাশ হবে। শিল্পকর্মের সমগ্রতার ঘাটতি পড়বে। কাজেই ওই প্রয়োজনীয় শর্তকে বাদ দিয়ে তার সামাজিক সচেতনতার কোন বিচার ন্যায্য হতে পারে না।





বলা বাহুল্য নাট্য আন্দোলনের সামাজিক ও শৈল্পিক সংকটের স্তর বহুবিধ এবং বহু আয়তন বিশিষ্ট। শুধু মূল সংকট চিনে নেবার জন্যে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন।




Post a Comment

0 Comments