দেবাশিস রায়ের নতুন নাটক 'আক্ষরিক' আজ মঞ্চস্থ হলো অনীক প্রযোজনায় - THEATRE FORUM


সত্য জিৎ 

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

একটা রিদম, একটা শব্দ গোটা একটা নাটককে ভাসিয়ে নিয়ে চলল ।

নতুন চরিত্ররা এলো, ইতিহাস তৈরী হতে হতে বেয়ে চলল । আবিষ্কার হলো নতুন প্রজন্ম । শুধু আনমনে রয়ে গেলো...

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক । ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক । ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক । ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক । ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক । ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক । ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক । ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।


স্যার বিভাস চক্রবর্তী মহাশয়ের কথার সূত্র ধরে এবার মূল বিষয়ে আসি, আজ নাটক শেষ হবার পর উনি বলেন,

'আমি দীর্ঘদিন থিয়েটার চর্চার মধ্যে দিয়ে থিয়েটারের অনেক কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি । থিয়েটারের মধ্যে দিয়ে অনেক কিছু করা যায় । কিন্তু থিয়েটার দেবাশিসকে দিয়ে যে কী কী করিয়ে নেবে সেটা অকল্পনীয় ।'


তখন সম্ভাব্য সাল ১৭৭৭ খ্রিঃ । 'ঠক, ঠকঠক' আওয়াজের আবহে বাংলার প্রথম মুদ্রণাক্ষর সৃষ্টি হচ্ছে । ছাপাখানায় মুদ্রণের সময় ছেনিকাটা, ঢালাই করা চলনশীল বা বিচল যে ধাতব হরফ ব্যবহার করা হয় তার সৃষ্টি হচ্ছে এই প্রথমবার । স্রষ্টা পঞ্চানন কর্মকার ।

এরপর সৃষ্টি হবে একের পর এক ইতিহাস । তারপর বাংলা তথা বাঙালীরা ধীরে ধীরে ভুলে যাবে বাংলা ভাষার এই অন্যতম অনন্য ইতিহাসকে । যা খুঁড়ে খুঁড়ে বার করে আনবেন ঔপন্যাসিক রজত চক্রবর্তী এবং নাট্যরূপ দিয়ে সহজ দৃশ্যায়নের মধ্যে দিয়ে পঞ্চানন কর্মকারকে মানুষের মনে গেঁথে দেবেন নির্দেশক দেবাশিস রায় । তার জন্য আপনাকে অনীক প্রযোজিত 'আক্ষরিক' নাটকের পরবর্তী শো দেখতে হবে ।


গ্রামের সাধারন লৌহজীবী পরিবারের মানুষ পঞ্চানন, যিনি ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে খোদাই করে জীবিকা নির্বাহ করেন । তার হাতের কাজ ছিল অপূর্ব, নিখুঁত ।  লৌহজীবী পরিবারের সন্তান হলেও কয়েক পুরুষ আগে তাঁরা ছিলেন 'লিপিকার' । তাম্রপটে, অস্ত্রশস্ত্রে অলঙ্করণ বা নামাঙ্কনের কাজে তারা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ।পঞ্চার জীবন-চরিত্রেও পূর্বপুরুষদের এই শিল্পবৃত্তির গুণপনার প্রকাশ ঘটে । লিপিকার পঞ্চানন ও তাঁর দাদা গদাধর এর তরুণ থেকে যুবক, যুবক থেকে বৃদ্ধ হয়ে ওঠার জীবন কাহিনী উঠে আসে এই নাটকে । ন্যাথালিয়েন ব্র্যাসি হ্যালহেড নিজ স্বার্থে পঞ্চাননকে দিয়ে বাংলা অক্ষরের হরপ তৈরী করিয়ে নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন, তবে বেইমানি করেন তাঁর সাথে । কোথাও একটি শব্দেরও উল্লেখ রাখেন না পঞ্চাননের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে । একজন কিংবদন্তী লিপিকার শিল্পীর এই যন্ত্রনার কথা আমরা বাঙালিরা সত্যিই জানি না । মোটা মোটা বই পড়ে জানতে চাইওনা কখনও । এক সাহেব বেইমানি করলেও আর এক সাহেব উইলিয়াম কেরি যথাযোগ্য সম্মান দিয়েছিলেন পঞ্চানন কর্মকারকে । শেষ জীবন পর্যন্ত কেরির সঙ্গেই হাতে হাত রেখে সৃষ্টি করে গিয়েছেন একাধিক ভাষায় নতুন নতুন হরপের । পাশাপাশি নিজের শিষ্য তথা জামাতা মনোহর কর্মকারকে সযত্নে তার সমস্ত জ্ঞান ও কলাকৌশল শিখিয়ে যান । মনোহর কর্মকার পরিশ্রম, সাধনা ও মেধা পাথেয় করে আরবি, ফারসি, গুরুমুখি, মারাঠি, তেলুগু, বর্মি, চীনা প্রভৃতি সহ অন্তত চোদ্দোটি বিভিন্ন ভাষার হরফ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন ।

এই ইতিহাস নিয়ে আদেও বাংলায় আগে কখনও নাটক হয়েছে কি ? বা বলা যেতে পারে কোনো নির্দেশক বা নাট্যদল সাহস দেখাতে পেরেছেন কি ? আমার স্বল্প জ্ঞানের পরিসরে জানা নেই এখনও ।



পঞ্চানন কর্মকার এবং মুদ্রণাক্ষর সৃষ্টির এই ইতিহাস একটি কঠিন টেক্সট । সেই বিষয়কে এত সহজ ভাষায়, সাধারণ জীবনের গল্পে মঞ্চে নিয়ে আসা একমাত্র দেবাশিস রায়ের পক্ষেই সম্ভব (ব্যক্তিগত মত) । ওই যে বিভাস স্যার বলেছেন 'থিয়েটার যে দেবাশিস'কে দিয়ে কী কী করিয়ে নেবে, তা অকল্পনীয় ।' 

অভিনয় নিয়ে প্রশংসা করার মত সময় এখনও আসেনি । কারন আজকে সন্ধ্যা ৬:৩০ এর শো'টাই ছিলো প্রথম রান থ্রু । শো শুরুর আগে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত রিহার্সাল চলেছে । ফলে অভিনেতারা যে এখনও নিজেদের সম্পূর্ণটা দিতে পারেননি, তা তাদের পারফরম্যান্সে চোখে পড়েছে । পরবর্তী শো গুলিতে এই খামতি থাকবে না, তা নিশ্চিত ভাবে আশা রাখা যায় । তবুও এর মাঝেও অভিনয়ে নজর কেড়েছে অভিনেতা অরূপ রায়, অংশুমান দাশগুপ্ত, তপতি ভট্টাচার্য, নিশিথ পাল, প্রশান্ত দত্ত, সমৃদ্ধি ব্যানার্জীরা । আলাদা করে নজরে আসে সৌমেন চক্রবর্তীর অভিনয়, ধ্রুব মুখার্জির কন্ঠ । এছাড়াও অভিনয়ে যারা মঞ্চ জুড়ে মাতিয়ে রাখলেন প্রীতম, অর্ক, অভীক, প্রান্তিকা, পারমিতা, আলপনা, ইতি, কৌশিক, দেবাঞ্জন, চৈতালী, শ্রেষ্ঠা, সুলগ্না, ভাস্কর, অনুভব, নীলাদ্রী, সৌরভ, সৃজক সহ মোট ৩২ জন । আলো, আবহ, মঞ্চ, পোশাক ইত্যাদি নির্দেশক দেবাশীষ রায়ের পরিকল্পনায় যথাযথ বাস্তবায়ন করেছে ভাস্কর মুখার্জি, শুভঙ্কর দে, সুভম, সুকুমার, বিজু দা, গৌতম দা, বাবু দা সহ অন্যান্যরা । যন্ত্র সংগীতে ঋদ্ধিবেশ এবং রূপ অসামান্য । 



৬৮ বছর বয়সে এসে প্রায় ৫০ বছরের থিয়েটার জীবন অতিবাহিত করে দেওয়া ও সকলের আড়ালে থাকা নাট্যকর্মী ও দক্ষ-সংগঠক অভিজিৎ সেনগুপ্ত প্রথমবার অভিনয় করলেন এই নাটকে । এও এক ইতিহাস হয়ে থাকলো ।


এবার একটু নিজের স্বাভাবিক ছন্দে আপনাদের কাছে অনুরোধ জানাই, এই নাটকটি বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিন । কারণ এই নাটকের যে বিষয়বস্তু, তা এই প্রজন্মের প্রত্যেকের জানা উচিত । বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের । নাটক শেষে পরিচালক দেবাশিস দার সাথে কথা হচ্ছিল, তিনি তখন বলছিলেন, 'আমাদের বাংলায় আমাদের নিজেদের কত কত অজানা ইতিহাস আছে, সাহিত্য আছে যা এখনো সেভাবে পাতা উল্টে দেখেনি বাঙালিরা । থিয়েটারের মঞ্চে আমরা মেতে থাকতে চাই শেক্সপিয়ার, ব্রেখটে । আমাদের উচিত আমাদের নিজেদের ভাষা, নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের ইতিহাসকে বাংলা থিয়েটারের মঞ্চে আরো বেশি বেশি করে তুলে আনা । আমি সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি ।'


বর্তমানে দেবাশিস রায় নামটা বাংলা থিয়েটারের এক জাদুকরের নাম । যার জাদুতে নিমেষেই সৃষ্টি হতে পারে নতুন নতুন ইতিহাস । যদি তার নাটক মঞ্চে গিয়ে না দেখেন, তবে আপনি সেই ইতিহাস সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে বঞ্চিত থাকবেন ।

আর মননে থেকে যাক আজকের নাটকের ঘোর...

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

ঠক, ঠকঠক ।

Post a Comment

0 Comments