১১ এপ্রিল ২০২০ রবিবার 'এই সময়' পত্রিকায় প্রকাশিত দেবাশিস রায়ের নাটক
ভবিষ্যতের স্মৃতি
দেবাশিস
( সন্ধ্যা নেমে আসছে। গঞ্জের এক পুরোনো বাড়ির বারান্দায় বসে আছেন দুজন বৃদ্ধ মানুষ।একজনের বয়স সাতানব্বই। অন্যজন আটাত্তর। দেবাংশু আর দেবপ্রতিম সম্পর্কে বাবা আর ছেলে। )
দেবপ্রতিম – বাবা, ও বাবা! শুনছো?
দেবাংশু – অ্যাঁ!
দেবপ্রতিম – আজ আমার নাতনি আসবে।
দেবাংশু – আসুক না, কী অসুবিধা। চাল একটু বেশি নিলেই হবে।
দেবপ্রতিম – তোমার মনে আছে সুনন্দিতাকে?
দেবাংশু – সে এখনো বেঁচে আছে?
দেবপ্রতিম – এই দেখো, কিছুই মনে নেই। সুনন্দিতা হোলো তোমার নাতনি দেবলীনার মেয়ে।
দেবাংশু – দেবলীনা কলেজে ভর্তি হয়েছে? আগেই বিয়ে করে বোসলো?
দেবপ্রতিম – বাবা এটা দুহাজার একুশ সাল।
দেবাংশু – হ্যাঁ, বরিশাল তো?
দেবপ্রতিম – না, তোমাকে আর বোঝানো গেলো না। এটা পশ্চিম বাংলা। উত্তর চব্বিশ পরগনা।
দেবাংশু – আমার মাতৃদেবীর বাবা, মধুসূদন গুপ্তকে নিজের চোখে কাঁদতে দেখেছে! আমার মাজননী তখন শাড়ী গুটিয়ে ইঁদুর বিলাই খেলত।
দেবপ্রতিম – মধুসূদন গুপ্তটা আবার কে বাবা?
দেবাংশু – তাকে আর চিনবে কী করে? যাও, পারো তো স্লেট পেনসিল নিয়ে তার পায়ের গোড়ায় বসে থাকো।
দেবপ্রতিম – আমি তো বুড়ো হয়ে গেছি বাবা। লেখাপড়া আর ভালো লাগে না।
দেবাংশু – বয়স কত হোলো তোমার? এর মধ্যেই চুল পেকে গেল!
দেবপ্রতিম – বাবা আটাত্তর চলছে।
দেবাংশু – আমার তাহলে কত হোলো?
দেবপ্রতিম – আপনার সাতানব্বই হোলো।
দেবাংশু – তুমি কত তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে গেলে দেবাংশু।
দেবপ্রতিম – বাবা, এটা কি স্বগতোক্তি?
দেবাংশু – কেন, স্বগতোক্তি কেন?
দেবপ্রতিম – আমার নাম দেবপ্রতিম। আমি আপনার বড় ছেলে।
দেবাংশু – ওহো! তাহলে দেবাংশুটা কে?
দেবপ্রতিম – দেবাংশু আপনার নিজের নাম।
দেবাংশু – তুমি সবকিছু গুলিয়ে দিচ্ছ আজকাল! বলি মতলবটা কী তোমার? যাকগে, কী যেন বলছিলাম?
দেবপ্রতিম – মধুসূদনের কাছে যেতে বলছিলেন। সে কে?
দেবাংশু – সেই লোক হোলো হিন্দু বাঙ্গালী, যে প্রথম মড়া কেটেছিল।
দেবপ্রতিম – শবব্যবচ্ছেদ!
দেবাংশু –হ্যাঁ, ওটা ছিল একটা মাইলস্টোন। জানো তো, নিজের অতীতকে নির্মোহে কাঁটাছেড়া করতে না শিখলে কেউ ভবিষ্যতের স্মৃতি তৈরি করতে পারে না।
দেবপ্রতিম – ভবিষ্যতের স্মৃতি!
দেবাংশু – তুমি আমার সন্তান তো?
দেবপ্রতিম – হ্যাঁ বাবা।
দেবাংশু - আমি যখন তোমার মা জননীকে বিবাহ করি, তখন তুমি ছিলে আমার ভবিষ্যতের স্মৃতি। বুঝেছ? যে জাতি ভবিষ্যতের স্মৃতি সযত্নে লালন করতে জানে না, তারা একদিন অতীতের গৌরব ভাঙিয়ে খেতে খেতে নি:স্ব হয়ে যায়।
দেবপ্রতিম - সুনন্দিতা অনেকদিন পর দেশে ফিরছে বাবা। আমার নাতনি। ওর তো কেউ নেই। বিদেশ বিভুঁইয়ে একা পড়ে থাকে মেয়েটা।
দেবাংশু- সে একা কেন? পরিবার কোথায়?
দেবপ্রতিম - আপনার মনে নেই। ওর বাবা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তার আর খোঁজও পাওয়া যায়নি। তার একবছর পর উনিশশো আটানব্বই-এর এপ্রিলের ষোলো তারিখ, আমার মেয়ে, মানে আপনার নাতনি দেবলীনা রেক্টাম ক্যানসারে
মারা যায়।
দেবাংশু - খুব কষ্ট পেয়েছিল মেয়েটা ব্যাথায়!
দেবপ্রতিম - তখন সুনন্দিতার তিন বছর বয়স।
দেবাংশু - আজ কি সে আসবে? এতো ছোটো মেয়ে, তার জন্য একটু দুধভাত রেখেছো তো?
দেবপ্রতিম - বাবা, সে এখন বড় হয়ে গেছে। ছাব্বিশে পড়েছে।
দেবাংশু - আচ্ছা। সে কোথায় থাকে আজকাল? বরিশালে নাকি ময়মন সিংহে, তোমার মাতুলালয়ে?
দেবপ্রতিম - বাবা সেই মেয়ে আজ প্রাগ থেকে আসছে।
দেবাংশু - ক্যাপিটাল অফ চেকোস্লোভাকিয়া।
দেবপ্রতিম - হ্যাঁ।
দেবাংশু - তার সাথে কে আসছে? তার বর?
দেবপ্রতিম - না বাবা, সে একাই আসছে। বিয়ে হয়েছিল এক বিদেশী অন্ত্রেপ্রনোরের সাথে। চিনির ব্যবসায়ি। সে বিয়ে টেকেনি।
দেবাংশু - সে কি এবার থেকে আমাদের সাথে থাকবে?
দেবপ্রতিম - জানি না। শুধু বলেছে আজ আসছে।
দেবাংশু - একজন বাড়ল। একজনের চাল বেশি নিতে বলবে।
দেবপ্রতিম - দাঁড়ান বাবা। আলোটা জ্বালাই। অন্ধকার হয়ে গেছে।
( দেবপ্রতিম উঠে গিয়ে আলো জ্বালান। দেখা যায় একটা ট্রলিব্যাগ নিয়ে বারান্দার সিঁড়িতে এসে দাঁড়িয়েছে সুনন্দিতা। ছোটো করে কাটা চুল। ঝকঝকে নির্মেদ চেহারার সুনন্দিতা। চোখে সবুজ আর স্বছ ফাইভারের কম্বিনেশনে, ডিজাইন করা ফ্রেমের লাক্সারি চশমা।)
দেবাংশু - কে রে? ফুসফুস এলি নাকি? নস্যি এনেছিস বাবা?
দেবপ্রতিম - মিলি!
সুনন্দিতা - মাই গড! দেবাংশু তো দারুন জোয়ান আছে দেখছি এখনো! দাদান, তুমি বুড়ো হয়ে গেছো।
দেবাংশু - এটা কে রে? আমাকে নাম ধরে ডাকছে? টাংগাইলের কেউ?
দেবপ্রতিম - বাবা এ হোলো সুনন্দিতা। আমার নাতনি। তোমার গার্জিয়ান।
দেবাংশু – এই যে বললি মিলি!
দেবপ্রতিম - ওর ডাক নামই তো মিলি। তোমারই দেওয়া।
দেবাংশু - ওকে ক্ষমা করে দে।
মিলি - ( হাসে ) ক্ষমা করবে কেন দেবাংশু? আমি কি অপরাধ করেছি?
দেবপ্রতিম - আসলে বাবা এখন সব গুলিয়ে ফেলে। তোকে বোধ হয় আর কেউ ভেবেছে। চল ঘরে চল। স্নান করবি?
মিলি - একটু দাঁড়াও। তোমাদের পাশে একটু বসি। লাইটটা নিভিয়ে দাও। কেমন অদ্ভুত লাগছে। এতো ভালো লাগছে যে, কান্না পাচ্ছে। এই বারান্দার দেওয়ালে এখনও আমার পেনসিল দিয়ে আঁকা হিজিবিজি ছবিগুলো রয়ে গেছে। এই দাগ টানা, মাথায় গোল্লা আঁকা ছবিটার নিচে লিখে রেখেছিলাম, 'আমার বাবা হারিয়ে গেছে।'
( দেবপ্রতিম লাইট নিভিয়ে দেন। নবীন রাতের লাজুক আলোয় তিনজন পাশাপাশি বসে থাকে। রাতের পোকারা ডাকাডাকি করে। চাঁদ আনমনে উঠে আসে। বেশ কিছুক্ষণ সময় চলে যায়। )
দেবাংশু - তুমি যে এতদিন আমাদের সাথে দেখা করতে আসোনি, সেই অপরাধ থেকে তোমাকে ক্ষমা করে দিতে বলেছিলাম।
গান -
নিরুপমা ভুলে গেছে,
হাসিখেলা, কবেকার কথা।
যখন বিকেল ছিল
হেলে পড়া গুলঞ্চ লতা।
নিরুপমা ভুলে গেছে,
কেন হয়েছিল ছাড়াছাড়ি;
সেদিন সন্ধ্যা ছিল
অভিমানী একতলা বাড়ি।
( মেঝেতে আসন পেতে খেতে বসেছে মিলি, দেবাংশু আর দেবপ্রতিম। গঞ্জের হিমেল রাত ঘিরে আছে ওদের। )
মিলি - আমি তোমাদের নিয়ে যেতে এসেছি দাদান।
দেবপ্রতিম - কোথায়?
মিলি - চেকোস্লোভাকিয়া।
দেবপ্রতিম - আমরা!
মিলি - হ্যাঁ। তুমি আর এই ছেলেটা, দেবাংশু, তোমরা আমার সাথে থাকবে।
দেবাংশু - না।
মিলি - না!
দেবাংশু - আমি ওদের ছেড়ে কোথাও যাবো না।
মিলি - কাদের ছেড়ে?
দেবপ্রতিম - এখন ভালো করে খাতো মিলি। কাল সকালে কথা বলা যাবে।
( দেবাংশু খাওয়া থামিয়ে মিলির দিকে তীব্র চোখে তাকিয়ে থাকেন। মিলি আর দেবপ্রতিম নীরবে খেতে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় চলে যায়। )
দেবাংশু - তুমি আমাদের নিয়ে যাবে কেন?
মিলি - তুমি খাও। কাল কথা বলব।
দেবাংশু - না, আমি এখনই কথা বলতে চাই।
দেবপ্রতিম - বাবা, ও তো থাকছে কাল। পরে এসব নিয়ে কথা বলা যাবে।
দেবাংশু - শোনো সুনন্দিতা, আমি একবার নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে এসেছি সেই কোন ছেলেবেলায়। আর সেই স্মৃতি মোছার চেষ্টা করতে করতেই কেটে গেছে আমার জীবন। আমার ছোটোবেলার সেই ফেলে আসা বন্ধুদের মুখ, তাদের গায়ের গন্ধ, আমার পাড়াগাঁয়ের পাঠশালা, বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া বিলের খুদে মাছের দঙ্গল, ঈদ আর দূর্গাপুজায় ঘেমো ফতুয়া গায়ে, বন্ধুর বাবাচাচাদের স্নেহমাখা আলিঙ্গন; এসব জমানো সম্পদ বিলিয়ে দিতে দিতে বুঝেছি, কতটা ফকির হলে মানুষ পুনর্জন্মের স্বপ্ন দেখতে দেখতে, খালি হাতে একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে।
দেবপ্রতিম - বাবা, আজ থাক। তোমার শরীরটা-
দেবাংশু - জানো সুনন্দিতা, সত্যি কথা বলি, তোমাকে আমার ভালো মনে নেই।
মিলি - সেটা তো স্বাভাবিক দেবাংশু। আমি যখন এবাড়ি থেকে মার সাথে চলে যাই, তখন তো প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। কতকাল আগে।
দেবাংশু - না সুনন্দিতা, তা নয়। আসলে আমি বরিশাল থেকে খালি পায়ে এই নীলগঞ্জে চলে আসার দিন থেকে শুধু স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করে গিয়েছি। নাহলে আমি এই দেশে টিকতে পারতাম না। কাজ করতে পারতাম না। মাকে ছেড়ে এসেছিলাম মামাবাড়ি টাঙ্গাইলের কোকডহরা গ্রামে। ওরা বলেছিল আমরা এখানে এসে বাসা বানালে মাকে পাঠিয়ে দেবে। মা আর আসেনি।
মিলি - মা আসেনি?
দেবাংশু - না, মা আর আসেনি। বাবাও আর মাকে ডাকেনি কোনোদিন। আমাদের বাড়িতে, বাবা, আমার মায়ের কোনো ছবি রাখতে দিত না। আজ তোমাকে যেমন আমার মনে নেই, আমার মায়ের মুখও আমার মনে নেই। ভুলে যাওয়ার অভ্যাস করতে করতে, আজ আমার জীবন বিস্মৃতির গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি ইচ্ছামতো আর কিছু মনে রাখতে পারি না।
মিলি - খেয়ে নাও। তোমার যা বয়স হয়েছে তাতে সবটা মনে রাখাও কঠিন। তবু তো তুমি এতোকিছু মনে রেখেছো।
দেবাংশু - তোমার সাথে কথা বলতে খুব ভালো লাগছে সুনন্দিতা। তুমি তো আসলে আমার ভবিষ্যতের স্মৃতি। আমার অনেক ফেলে আসা গল্পের শেষে, তুমি আজ কিছুটা নতুন করে খুঁজে পাওয়া।
( মিলি দেবাংশুকে জড়িয়ে ধরে। )
মিলি - তুমি আমার সাথে চলো দেবাংশু। আমি তোমাকে খুব যত্ন করে রাখবো। আমরা তিনজন অনেক গল্প কোরবো। আমার বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট জঙ্গল আছে, আর তার পাশে একটা সবুজ নদী। তোমার ভালো লাগবে।
দেবাংশু - সুনন্দিতা, তুমি থেকে যেতে পারো না আমাদের সাথে?
মিলি - আমি ?
দেবাংশু - হ্যাঁ। থেকে যাও না আমাদের চারজনের সাথে।
মিলি - চারজন!
দেবপ্রতিম - বাবা রাত হয়ে গেছে। এই ওষুধ তিনটে খাও। আর ওকে একটু রেস্ট করতে দাও। কতদূর থেকে এসেছে।
দেবাংশু - ওদের কথা বোলবো না মেয়েটাকে?
দেবপ্রতিম - কাল বোলো। সারাদিন সময় পাবে তো।
মিলি - কাদের কথা দাদান?
দেবাংশু - রামমোহন রায়ও যাকে বাঁচাতে পারেনি। আমাদের বংশের মেয়ে ছিল সে, সৌদামিনি। সাত পুরুষ আগে বোধহয়। এই বাড়িতে এসে যখন মাকে ভুলে যাবার চেষ্টা করছি, তখন দেখি আগুনে ঝলসে যাওয়া একটা বাচ্চা মেয়ে, বারান্দায় বসে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চন্ডীমঙ্গল’ আওড়াচ্ছে। আমি ভয় পাইনি। আমার ভালো লাগলো। আজ যেমন তোমাকে দেখে ভালো লাগলো, সেদিন ওকে দেখেও আমার তেমন ভালো লেগেছিল। আমি সেদিন দেশে ফেলে আসা বন্ধুদের হারিয়ে, নতুন বন্ধু পেলাম।
( বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে যান দেবাংশু। তার চোখ দিয়ে জল নামে। মিলি তার হাত ধরে।)
মিলি - তারপর?
দেবাংশু - তারপর জানলাম এটা তার বাপের বাড়ি। নবছর বয়সে শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিল মাটির পুতুল কোচরে নিয়ে। সেবাড়িতে মেয়েদের জুতো থাকতো না।
মিলি - জুতো থাকতো না?
দেবাংশু - না। কারণ, তারা যাতে বাড়ির বাইরে বেরোতে না পারে কোনোদিন।
মিলি - আশ্চর্য তো!
দেবাংশু - সেই সৌদামিনি আমাকে তার সব কথা বলতে লাগলো। আমি জানি, আজ ও তোমাকে দেখে লজ্জা পেয়ে লুকিয়ে আছে। ওদের বাড়িতে নতুন মানুষের সামনে বেরোনো ছিল নিষেধ।
মিলি - কিন্তু ওর গায়ে পোড়া দাগ -
দেবাংশু - আঠেরোশো একুশ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পাঁচ তারিখ ওকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। স্বামীর সাথে চিতার আগুনে ওঠার জন্য বাঁশ দিয়ে মেরে ওকে অজ্ঞান করে দিয়েছিল আগেই। ওর ফাটা মাথায় একটা পানাফুল লেগে আছে সেই দুশো বছর ধরে। ওর সাথে আমাকে এখোনো ইঁদুর বিলাই খেলতে হয়। ওকে ছেড়ে যে আমি কোথাও যেতে পারবো না সুনন্দিতা।
মিলি - সহমরণ!
দেবাংশু - 'হরকত উল মুজাহিদিন'-এর নাম তো শুনেছো, কিন্তু 'তুফহাত উল মুওয়াহহিদিন'-এর কথা শুনেছো কোনোদিন?
মিলি - নাতো!
দেবাংশু - আঠেরোশো তিন সালে রামমোহন রায় এই নামে এক পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। এই পত্রিকা ছিল যুক্তিবাদীদের হাতিয়ার। ঐ নামের মানে হোলো 'একেশ্বরবাদীদের উপহার'। যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে কূপমন্ডূকতা দূর করার সেই চেষ্টার ফসল মিলতে মিলতে কেটে গিয়েছিল আরো পঁচিশটা বছর। এই লড়াইয়ের মাঝেই বাংলার ঘরে ঘরে মরে গিয়েছিল এইসব কিশোরী সৌদামিনিরা।
মিলি - আর কে আছে এই বাড়িতে দেবাংশু?
দেবাংশু - আর আছে মায়া।
মিলি - মায়া!
দেবপ্রতিম - আমার মা।
দেবাংশু - আমার স্ত্রী মায়া। তৃতীয় সন্তান হতে গিয়ে ভুল চিকিৎসায়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটা মরে গেল। উনিশ বছর বয়স তখন তার। কিন্তু সে আমাকে ছেড়ে যেতে পারলো না। আর একমাত্র তাকেই আমি ভুলে যাবার চেষ্টা করিনি কোনোদিন।
মিলি - সেও আছে এ বাড়িতে?
দেবাংশু - আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমি বরিশালের ‘ব্রজমোহন কলেজ’-এ পড়ি। এক এলোমেলো, বিষন্ন অধ্যাপকের সঙ্গ করতাম খুব। কিছুই না, মজা নদীর পাড়ে চুপচাপ বসে থাকা, ক্ষেতের আল ধরে বাংলা ভাষা নিয়ে আবেগের কথা বলতে বলতে হেঁটে যাওয়া। তাও রোজ নয়, ঐ এক আধদিন হয়তো। কিন্তু মানুষটার মধ্যে বড় ভালোবাসা ছিল। এই গাছপালা, আকাশ, মাটি, জলের জন্য, গলার কাছে জমে থাকা একটা রঙ্গীন দুঃখ ছিল। সেই আশ্চর্য বিষন্নতার উত্তরাধিকার বাঙ্গালি জীবনের গৌরব হয়ে গেলো একদিন। আর সেই লোক দুহাতে ডাবের থোকা নিয়ে, চলন্ত ট্রামকে আলিঙ্গন করে, পরাবাস্তবের পাড়ায় পারি দিল আর একদিন। সেদিন ছিল বাইশে অক্টোবর, উনিশশো চুয়ান্ন সাল।
মিলি - তোমার এখোনো মনে আছে সেই দিনটার কথা?
দেবাংশু - ভুলে যাবো কী করে! সেইদিন,
ঠিক সেইদিনই, আমার জীবন থেকেও চলে গিয়েছিল মায়া। আর মায়ার গর্ভের ভেতরে পৃথিবীর অন্ধকার না দেখা বাচ্চাটাও। আমার ভবিষ্যতের স্মৃতি। বাংলার গ্রামে গঞ্জে, সেসব দিনে, হাতুড়ে ডাক্তারদের হাতে এমন অনেক মায়েদের প্রাণ বেরিয়ে গেছে ভুল চিকিৎসায়।
মিলি - মায়াও তাহলে এই বাড়িতে আছে।
দেবাংশু - আছে। খুব আছে। ওকে খুব সাবধানে রাখি আমি। ও আমার চিরকালের গর্ভবতী তরুণী স্ত্রী।
মিলি - তাহলে তো ওদের ফেলে, তোমরা যাবে না আমার সাথে।
দেবাংশু - তাই তো বলছি, তুমিই থেকে যাও না আমাদের চারজনের সাথে।
গান -
একটা ঘরের ছাদের ওপর
আর একটা ঘর থাকে।
একটা খাঁচার একলা পাখি
আর একটাকে ডাকে।
সকাল আসে, বিকেলও হয়,
হাওয়ায় ওড়ে ধুলো,
কেউ জানে না কোথায়, কাকে,
কখন যে কেউ ছুঁলো।
( সকাল হয়েছে। কুয়াশা এসে ঢুকে পড়েছে বারান্দায়। ট্রলি হাতে বেরিয়ে আসে মিলি। দেবাংশুকে দুহাতে ধরে দরজায় এসে দাঁড়ান দেবপ্রতিম। )
দেবপ্রতিম - আবার আসিস।
দেবাংশু - তোমাকে ভুলে যেতে আবার আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে সুনন্দিতা।
মিলি - দেবাংশু, আমি হয়তো চেষ্টা করেও ভুলতে পারবো না তোমাদের, আর এই দুটো দিন। জানো দেবাংশু, তোমাকে, তোমাদের একবারই নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল। আর আজকের আমরা বারবার ঘরছাড়া, দেশছাড়া হয়ে স্বেছায় উদ্বাস্তুর মত ঘুরে বেড়াই এরাজ্য থেকে ও রাজ্য, এদেশ থেকে ওদেশ। আমরা দেশভাগের দুর্ভাগা নই। আমরা আত্মখন্ডনে রপ্ত হয়ে যাওয়া, স্মৃতিহীন ভবঘুরে প্রজন্ম। কাজের জন্য, রুজির জন্য, ভীড়ের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে কোনক্রমে ঝুলে ঝুলে, একা একা বেঁচে থাকার জন্য, নিজের থেকেই পালিয়ে বেড়াই আজকাল। আমরা ক্ষেপে উঠি নিজেরই বিরুদ্ধে। নিজেদের কাছেই নিজেদের স্বাধীনতা দাবী করি। নিজেকে মারার জন্যই, আতঙ্কবাদী হয়ে, নিজের মাথার ভেতরেই জমাতে থাকি পাইপগান, মর্টার, কার্বাইন অথবা আর ডি এক্স। ছোটোবেলা থেকে শুধু টিঁকে থাকার জন্য অপমানিত হতে হতে, হার স্বীকার করতে করতে, এক্সপ্লয়টেড হতে হতে, কম্প্রোমাইজ করতে করতে, তোমাদের শিখিয়ে দেওয়া আবেগ, ভালোবাসা, বিশ্বাস, সততা, আত্মসম্মানের মত ভ্যালুজগুলো, শরীর আর মাথা থেকে টেনে খুলে, ছিঁড়ে ফেলতে ফেলতে একদিন, নিজেদেরই চিনতে পারি না আর। নিজের বদলে তারপর একটা অপরিচিত, আনপ্রেডিক্টেবল মানুষের সাথে ঘর করতে হয় সারা জীবন। আমাদের গায়ে লেগে থাকে আমাদেরই ছোরা, গুলি, গ্যাসোলিনের পোড়াকাটা দাগ। সেগুলো ঢাকার জন্য আমরা দামী কস্মেটিকসের আড়ালে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলি। নিজেকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে রোজ রাতে উদ্দাম নেশা করি। দেবাংশু, আমরা জানি না আমাদের মা-বাবা আমাদের আদৌ ভালোবাসে কিনা, অথবা পরস্পরকে ভালোবাসে কিনা! আমরা জানি না আমাদের আসল ঘর এই গ্রহের ঠিক কোনখানে! আমরা জানি না কে থাকবে আমাদের পাশে শেষ পর্যন্ত! তবু প্রতি সকালে আমরা আমাদের ছেঁড়াখোড়া অস্তিত্বকে, পুরোনো লোটাকম্বলের মতো গুটিয়ে, কাঁধে নিয়ে, ধুঁকতে ধুঁকতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি জীবনের উৎসবে সামিল হতে। আমাদের পাশে তখন আমাদেরই মত কীবোর্ডে আঙ্গুল চালাতে থাকে কোনো ঋণগ্রস্ত পাঞ্জাবী , তার পাশের টেবিলে থাকে কোনো জেলখাটা পাকিস্তানি, তার পাশে নাইরোবি থেকে আসা কোন গরীব লাজুক যুবক, যার হয়তো সেই মুহূর্তে ভালোলাগছে তার পাশের কেবিনে উদাস হয়ে, ফাইল ঘেঁটে চলা কোনো কোরিয়ান মেয়েকে, যে আজ রাতে বাধ্য হয়ে ডেট করতে যাবে ইরান থেকে আসা তার নতুন বৃদ্ধ বসের সাথে, নাহলে তাকে ছাঁটাই করে দেশে পাঠানো হবে একদিনের নোটিশে।
( অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না। )
মিলি - এসো তোমরা, লজ্জা পেয়ো না।
দেবপ্রতিম - কাকে ডাকছিস মিলি ?
মিলি - সৌদামিনি আর মায়াকে!
( ঘর থেকে বেরিয়ে আসে আগুনে ঝলসে যাওয়া, কিশোরী সৌদামিনি, আর গর্ভবতী তরুণী মায়া। তাদের হাতে টিনের বাক্স, মুখে হাসি। পায়ে নতুন জুতো। পরনে জিন্স আর টিশার্ট। )
মিলি - ওরা আমার সাথে যাচ্ছে দাদান। ওরা আমাকে কাল রাতে বলেছে, ওদের বাইরে বেরোবার খুব ইচ্ছে। ওরা আমার কাছে ভালোই থাকবে, চিন্তা কোরো না। কই, দাঁড়িয়ে কেনো? চলে এসো তোমরা।
দেবপ্রতিম - কী বলছিস মিলি! তুইও কি -
( একটা রোগা জোয়ান ছেলে গেট খুলে বাড়িতে ঢোকে। তার হাতে স্মার্ট ফোন। )
দেবপ্রতিম - ফুসফুস, তুই এতো সকালে?
মিলি - আমি ফুসফুসকে বলে দিয়েছি। ও আজ থেকে চব্বিশ ঘন্টাই তোমাদের দেখাশোনা করবে। ওর মায়না আমি অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার করে দেবো। আর মাঝে মাঝে ভিডিও কল করে কথা বোলবো তোমাদের সাথে। ওর কাছে তোমাদের জন্য কেনা দুটো ফোন আছে। ও সব শিখিয়ে দেবে। আসি দেবাংশু, দাদান আসি। আবার আসবো ছুটি পেলেই। ওদের নিয়েই আসবো।
( মিলি দুজনকে প্রনাম করে।)
মিলি - চলো সৌদামিনি, এসো মায়া, লজ্জা পেয়ো না আর।
( ওরা বেরিয়ে যায়। )
গান -
আজ আর একটাও কথা নেই,
আজ শুধু পাশ ফিরে শোওয়া।
কাল তুমি কাছে থাকবেই,
থাকবে তোমার হাত ছোঁয়া।
কেউ ভোলে, কেউ মনে রাখে,
কারো থাকে শুধু অভিমান।
কেউ বাঁচে, মরে গিয়ে ফের,
কথা ভুলে গিয়ে গায় গান।
( অনেক দূরে এরোপ্লেন মাটি ছেড়ে শুণ্যে উঠে যায়। )

0 Comments