ছাতার থিয়েটার পথে নামল কোন দরকারে ? লকডাউনের নিয়ম মান্য হল কী ?






ইছাপুর : কোভিড 19 মোকাবিলায় WHO(হু )এর নির্দেশ মেনে যে লকডাউন, তার আসল উদ্দেশ্য যদি জীবন বাঁচানো হয়, তবে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ আর পরিযায়ী শ্রমিকরা এই ভয়াবহ কষ্টের শিকার হত কি? দীর্ঘ লকডাউনে বিধ্বস্ত মানুষ। তারই মধ্যে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আমফানে ক্ষতিগ্রস্ত দুই চব্বিশ পরগনা সমেত গোটা বাংলা। লকডাউন থাকা দরকার কি দরকার নয় এই বিতর্কে না গিয়ে সোজা কথায় যা বলা যায়,তা হল মানুষের বেঁচে থাকা দরকার। সেই দরকারেই পথে নামল ছাতার থিয়েটার। ঘরে ফেরা শ্রমিক আর ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ছাতার থিয়েটার একটি ত্রাণ উদ্যোগ। ২৮ মে ইছাপুর আনন্দমঠে জনতার মাঝখানে অভিনীত হল ছাতার থিয়েটার। 




লকডাউনের বিধিনিষেধ মেনে নির্দিষ্ট শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সামাজিক বন্ধনের নজির গড়ে দেখাল এই উদ্যোগ। দূরত্ব বজায় রাখতে এতে ছাতার ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের রাজ্যের মদের দোকানগুলোতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে ছাতার ব্যবহার চালু হয়েছে আর রেশন দোকানগুলোর লাইনে সাইকেলের টায়ার পেতে তার মাঝখানে উপভোক্তাদের দাঁড়াতে বলা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় দূরত্ব বাড়াতে চুনের গন্ডিও কেটে দেওয়া হচ্ছে।অন্যদিকে কেরালায় ছাতা ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে দূরত্ব রাখার পদ্ধতিটি কার্যকর হয়েছে। নাটকের চরিত্ররা এবং দর্শকরা সকলে ছাতার ব্যবহার করে ও গন্ডীতে দাঁড়িয়ে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। লকডাউনের নিয়ম মেনে এই সময়ের কথা,মানুষের দুর্দশার কথা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলতে পেরেছে এই থিয়েটার, সাথে সাথে বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন থিয়েটারের জন্য নতুন রাস্তা।ছাতার থিয়েটারের রূপকার শুভঙ্কর দাশশর্মা জানান,'সবাই বিভিন্নভাবে উপায় খুঁজছিলেন,আমিও খুজছিলাম। 




  অতীতেও বিপর্যয়ের মোকাবিলায় আমরা গান গেয়ে, কবিতা বলে,নাটক করে টাকা তুলে বন্যাত্রাণের কাজ করেছি, কিন্তু লকডাউনের সময় যোগাযোগের মাধ্যম শুধুই ইন্টারনেট হয়ে দাঁড়িয়েছে,ফান্ড তোলা মানে অনলাইন টাকা তোলা। সেটার পাশাপাশি পারফর্মেন্স করে কৌটো পাতার কাজটাও চালাতে হবে, একজনের হাজার টাকার থেকে হাজার জনের একটাকা শুধু বেশি ভারী নয়, বেশি দামীও বটে। থিয়েটারের প্রধান কাজ তো জনসংযোগ, তাই মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগের জন্য  পরীক্ষামূলকভাবে ছাতার থিয়েটার হল।' এই নাটকের অভিনেতা শোভন রায় বলেন, 'ভয় পাওয়ার থেকে সতর্ক হওয়া বেশি জরুরী।মানুষ আমাদের ছাতার থিয়েটারের পাশে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সাহস ও সমর্থন দিচ্ছে' ।অপর অভিনেতা সমিত দাশশর্মা জানান,'মানুষের পাশে দাঁড়াতে আর মানুষকে সতর্ক করতেই এই কাজ।এই কাজটা থেকে শিখলাম,থিয়েটার এখনো জনবিচ্ছিন্ন হয়নি,মানুষের সাথেই আছে'। অভিনেত্রী রিয়া মাহালি জানান,'ছাতার থিয়েটার আমাদের ত্রাণউদ্যোগ।অনলাইনে সাহায্য করার ক্ষমতা বা দক্ষতা যে গরীব মানুষের নেই, তিনি আমাদের ছাতার থিয়েটারে দু টাকা দিয়েও পাশে থাকতে পারছেন।গরীবের পাশে গরীবই দাঁড়াবে।আমরা লাগাতার ছাতা পেতে যাব। আরো বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।' অপর এক অভিনেতা শুভদীপ দাস বলেন,'লকডাউনের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করছে রাষ্ট্র, সেটা মেনে নিতে পারছি না বলেই রাস্তায় অভিনয় করতে নামলাম।'



নাটকে আমরা দেখতে পাই,করোনা আর আমফান পরস্পরকে দোষারোপ করে আর নিজেকে অপরের চেয়ে বেশি ভয়ংকর বলে দাবী করে। শেষে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ওদের থেকে বড় খুনী সেই মানুষরা যারা ধর্মের নামে,জাতের নামে, ভাত কেড়ে নিয়ে মানুষ মারে। 
এ প্রসঙ্গে নাট্যকর্মী শুভঙ্কর দাশশর্মা স্পষ্ট জানান, 'আগামী দিনগুলোতে পাড়ায় পাড়ায় অভিনীত হবে ছাতার থিয়েটার। সরকারী বিধিনিষেধ মেনেই হবে। মতপ্রকাশ বন্ধ করার জন্য যদি কোন আইনও আনা হয়, মানুষ সে আইন মানবে কেন?'

২৮ তারিখে ইছাপুরে ছাতার থিয়েটারের শো এর পর গোটা বাংলার নাট্যকর্মীরা নতুন আশায় বুক বাঁধছেন।খেটে খাওয়া মানুষ যদি থিয়েটারের ছাতা হয়, তবে ছাতার থিয়েটার আরো ছড়িয়ে পড়বে।

Post a Comment

0 Comments