আবা–র রবীন্দ্রনাথ ? - এ একেবারে অতিষ্ঠ করে ছাড়লো। - তীর্থঙ্কর চন্দ




রবীন্দ্র অনুরাগীদের প্রতি একটি বিনম্র নিবেদন

তীর্থঙ্কর চন্দ



   আবা–র রবীন্দ্রনাথ ?

   আবার মানে? অনেক আলোচনা অনেক চর্চা করে রবীন্দ্রনাথের একেবারে শেষপর্যন্ত বুঝে ফেলেছেন মনে হয়!

   না, তা বুঝিনি–কিন্তু এই সার্ধ্বশতবর্ষে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সবাই মিলে যেভাবে হামলে পড়েছে, এ একেবারে অতিষ্ঠ করে ছাড়লো।

   আপনার হয়তো সেরকম একটু মনে হচ্ছে ;

   শুধু আমার কেন, অনেকেরই মনে হচ্ছে।

  কী জানি, তবে অন্ততঃ এই একটা বছর যদি রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্রগুলো একটু বেশি পড়া যায়, যা এখনও বাকি, তাহলে ওই থানা থেকে চায়ের দোকান পর্যন্ত সব জায়গায় রবিঠাকুর যেভাবে শুধু তাঁর দাড়ি বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত হচ্ছেন, তার একটা মোটামুটি মর্যাদা দেওয়া সম্ভব।

    আপনি রবিঠাকুরের সব লেখা পড়েছেন?

    না।

    অ।

   তাতে কী!

   দেখুন, একটা স্পষ্ট কথা বলি, রবীন্দ্রনাথের লেখা বলেই সব একেবারে সমান আকর্ষণীয়, বিষয়টা তা নয়।

   অবশ্যই। আর সেইজন্যই তো অনেক আকর্ষণীয়, কিছু বাদ রয়ে গেল কিনা, সেসব জেনে নিতে হবে।

  অতো পরিশ্রম না করে বেছে বেছে পড়ে নিলেই তো হয়।

   বাছতে গেলেও তো একটা চেষ্টার প্রয়োজন। সেটাই করুন। ধরুন, এই একটা বছরে হয়তো রবিঠাকুরের সবগুলি নাটক পড়ে ফেললেন কিংবা চিঠিপত্র, শান্তিনিকেতন–শ্রীনিকেতন তৈরির ইতিহাস! আর এমনও তো হতে পারে, এই একটু বিস্তারিত পড়তে গিয়ে আপনার আগের যেসব ধারণা–চিন্তা তার বদলও ঘটতে পারে। নতুন অভিজ্ঞতার আগেকার কোনো একটি কম আকর্ষনীয় লেখায় এখন একেবারে অন্য অর্থ ব্যয় করতে পারলেন কিংবা ধরুন—

   ভেবে দেখবোখন, এবার উঠি। অনেকগুলো কাজ সারতে হবে।

  হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসুন। আবার নিশ্চয়ই দেখা হবে।

  সম্ভবনা কম। চলি।

       এটা ঠিকই রবীন্দ্রনাথের সার্ধ্বশতবর্ষ জন্মজয়ন্তী  উপলক্ষে চারদিকে বেশ একটা 'রবিঠাকুর' 'রবিঠাকুর' হাওয়া উঠেছিল। অন্তত আমাদের পরিচিত গণ্ডীর নাট্যদলগুলি রবিঠাকুরের গল্প উপন্যাস কবিতা অবলম্বনে নাট্য–প্রযোজনায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এক প্রতিষ্ঠিত নাট্য–পরিচালক তো রবিঠাকুরের অসামান্য সব চিঠিকে নাট্যে ধরার একটা পরিকল্পনাও করছিলেন। আর এসবই যে একেবারে শূন্যে সৌধনির্মান, তা নয়; এর প্রতিটাই নতুন কিছু সম্ভবনা নিয়ে আসছে। তবে এটাও ঠিক, রবীন্দ্রনাথের যে–কোনো একটা গল্প কবিতার মোটামুটি নাট্যরূপ দিয়ে ফেলা খুব একটা কঠিন কাজ না। কিন্তু সে তো সব একেবারে সহজ পথে হাঁটা। প্রায় একশো–সোয়াশো বছর আগেকার এক আশ্চর্য ক্ষমতাসম্পন্ন চিন্তাবিদের গভীরতর বোধের প্রকাশ যে সব সৃষ্টিতে, তাকে প্রকৃত অর্থে প্রকাশ করা, আরোও বেশি নিষ্ঠা ও শ্রম দাবি করে। আবার এমনটাও হতে পারে, কেউ হয়তো সেই বহুস্তরীয় সুগভীর বোধের এমন এক প্রকাশ ঘটালেন, যা আমরা সাধারণেরা বুঝতেই পারলাম না। সমস্যা সেই পুনর্নির্মাণেও।  ফলে, যত সহজে একটা সীমাহীন ভাঁড়ার হিসাবে রবীন্দ্রনাথকে গণ্য করা হচ্ছে, সেখানকার প্রকৃত সম্পদ আহরণ সম্ভব তত সহজ নয়।


     বলা হয়, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির যেসব দিকগুলি নিয়ে তুলনায় কম আলোচনা হয়েছে, তাঁর চিত্রকলা এবং নাটক এদের অন্যতম। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে ওই উক্তির পর বিষয়দু'টিকে মুখ্য করে বেশ কিছু আলোচনা, পুস্তক প্রকাশ হয়েছে। তাঁর নাটকগুলি নিয়ে অবশ্য কোনো প্রাবন্ধিকের বিশ্লেষণ অথবা কোন প্রতিষ্ঠিত প্রযোজক পরিচালকের নিজস্ব নির্মাণ প্রক্রিয়াটিই আলোচিত হয়েছে বেশী। কিন্তু একেবারে সমাজ–রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, দর্শকের মুখপাত্র হিসাবে নাটকের সংযোগ ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়ে লেখাপত্র আছে, কিন্তু খুবই কম। আরেক বিশ্ববরেণ্য কালজয়ী নাট্যকার শেক্সপিয়ার–এর নাটক নিয়ে যেভাবে চুলচেরা বিচার, এমনকি যেসব শব্দ ব্যবহার করেছেন ওই এলিজাবেথ–এর যুগের নাটককার— সেসবের উৎস ইত্যাদিও বিচার করে নাটকের সৌকর্য বা সীমাবদ্ধতা প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে। হয়তো আরও চারশো বছর পর রবীন্দ্রনাথও তেমন মর্যাদা পাবেন। কিন্তু আজও তেমন ব্যাপক চর্চা হয়নি, একথা মেনে নিতেই হয়।


   রবীন্দ্রনাথের নাটক আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। প্রায় একশ বছর আগে বিশ্বনাট্য সাহিত্য যখন একভাবে নিজেকে প্রকাশ করছিল, রবীন্দ্রনাথ সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়েই নিজে লিখেছিলেন একেবারে স্বতন্ত্র শৈলীতে, বিষয়কে আরও গভীরতর দিক থেকে দেখাতে চেয়েছিলেন তিনি। বাংলা নাটক রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে এক বিস্ময়কর অভিনবত্ব নিয়ে এসে হাজির হয়েছিল–এসব মতামত, উক্তি নানাভাবে আলোচিত প্রমাণিত হয়েছে বহু প্রাজ্ঞ মানুষের দ্বারা। কিন্তু এটাও বিস্ময়ের, রবীন্দ্রনাথের নাটক তাঁর প্রতিকৃতি আর রচনাবলীর মতোই আমাদের কাছে কেবল দূর থেকে দ্রষ্টব্য বস্তু হিসেবেই রাখা আছে। একদল মনে করছেন, নাট্য–পরিচালক প্রযোজকরা রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলি প্রযোজনায় নিয়ে আস্তে উদ্যোগী নন; আর একদলের বক্তব্য—বাংলাদেশের মানুষ ওইসব নাটককে দর্শক হিসেবে মর্যাদা দেবার যোগ্যতা অর্জন করেনি। আমাদের সময়কার সর্বজনমান্য নাটককার মোহিত চট্টোপাধ্যায় যেমন প্রযোজক–পরিচালকদের অভিযুক্ত করেন, তেমনি বাংলাদেশের দর্শকেরা দায়ী হন শিশির ভাদুড়ি থেকে কুমার রায়–এর বিচারে ( দ্রষ্টব্যঃ নাট্যচিন্তা বিশেষ রবীন্দ্র সংখ্যা ) সপ্তাহে তিনদিন সন্ধ্যাবেলায় রবীন্দ্রনাথের নাটক দেখার মতো দর্শক এই পোড়ার বাংলাদেশে নেই— এমন বেদনার ভাষা শোনা গেছে বহু প্রাজ্ঞ নাট্যব্যক্তিত্বের কাছ থেকে। কথাটি আংশিক সত্য। আংশিক এইজন্যে, একসময় সাধারণ রঙ্গালয়ে রবিবাবুর নাটক প্রচুর অভিনয় হতো। মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিক্রমেই বলা যায়, "—গ্রেট ন্যাশনাল, এমারেল্ড, বেঙ্গল থিয়েটার, কর্ণওয়ালিশ মঞ্চ, নাট্যমন্দিরে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিককার নাটক প্রচুর অভিনীত হয়েছে; কিন্তু 'রাজা'  থেকে 'রথের রশি' কেউ ছুঁয়েও দেখেননি।" মোহিতবাবুর প্রবন্ধটির নামও "রবীন্দ্রনাট্য উপেক্ষার সেই তিমির"। এখন এইসব উষ্মা বা ক্ষোভের সঙ্গতঃ প্রকাশকে একটু গভীরভাবে না ভাবলে প্রায় সব দোষারোপই গিয়ে পড়বে অসহায় অশিক্ষিত দর্শকদের উপর। কেমন আশ্চর্য মনে হয় না কি, এক সময় যাঁরা রবীন্দ্রনাথের নাটক গ্রহণ করেছেন, মোহিতবাবুর বক্তব্য অনুযায়ী–সেই তাঁরাও কেন পরের নাটকগুলি সম্পর্কে উৎসাহ দেখাননি! কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা কি রুচিহীন বোধশূণ্য হয়ে গেলেন? সেই সময়কার নাটক নিয়ে বলার আগে সংক্ষেপে সেই সময়কার অর্থাৎ মোকাম কলকাতার জনগোষ্ঠী সম্পর্কে একটু বলে নেওয়া প্রয়োজন।


    ১৮৫৭–র সিপাহী বিদ্রোহের পর বানিয়া ইংরেজের রথ তখন বল্গাহীন। এ দেশ লুটে নেবার জন্য চারিহাত বাহির করিয়াছে বলা যায়। বিভিন্ন জায়গায় নগর পত্তন করে সেইখানে এদেশীয় একদল তাঁবেদার উচ্ছিষ্টভোগীদের মধ্য দিয়ে চলবে সেই অবাধ লুট। সেইসব নগরে গড়ে উঠছে আপিস আদালত এবং আনুষঙ্গিক আরও যা যা প্রয়োজন। এদিকে শহরের কাছে দূরের গ্রামগুলির অবস্থা খুবই করুণ। বাংলার মাটি 'পুণ্য' হবার দিন শেষ। বেঁচে থাকার জন্য কাজের খোঁজে নগরে ভিড় জমাচ্ছেন ভূমি–চ্যুত কৃষকেরা। নগরী গড়ে ওঠার সময় প্রয়োজন বহু মানুষের শ্রমের— যাঁরা অভাবী কিন্তু তখনও সক্ষম এবং আর কিছুদিনের মধ্যেই যাঁরা গজ্জু পালোয়ানের মতো উচ্ছিষ্ট, রাজার এঁটো হয়ে যাবেন। কলকাতার এঁড়া প্রায় ঘেটো করে আছেন। গ্রামীণ সভ্যতার সমস্ত সংস্কৃতির রূপগুলি উপসত্ত্বভোগী ওই বাবুদের বিলাসী লোভের সামনে কেমন বিকৃত হয়ে যেতে থাকে। যাই হোক, অতি অল্প সংখ্যক বিদেশী বানিয়ার দল, তারপরের স্তরে একটি অপেক্ষাকৃত স্থূল মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের অবস্থান এবং একেবারে নিচে অসংখ্য খেতে খাওয়া সাধারণ মানুষ। একটি ত্রিভুজাকৃতি জনসমষ্টির বিন্যাস তখন কলকাতায় এবং প্রত্যেক স্তর তাঁদের নিজস্ব সামাজিক–সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই আছেন।




    প্রাবন্ধিক রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী তাঁর 'রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থের প্রস্তাবনায় যে কথাটি বলেছেন, তার গুরুত্ব যথেষ্ট। ১৭৯৫–এ ইউরোপীয় ধাঁচের থিয়েটারের প্রথম প্রকাশ সম্পর্কে শ্রীচক্রবর্তী লেখেন,' — গোরাসিমের এ নাট্যপ্রয়াস বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও পরবর্তীকালে ইংরাজি শিক্ষিত বাঙালিদের নাট্যভাবনা দেশিয় ঐতিহ্যকে গ্রহণ করে নয়, বর্জন করেই বাঙালির আধুনিক নাট্যপ্রয়াস চরিতার্থ হতে চেয়েছে, ধনী ব্যক্তিদের বাড়িতে বিদেশী আদর্শে প্রস্তুত রঙ্গালয়ে।' ধনাঢ্য ঠাকুর পরিবারেও এইরকম চর্চাই প্রকাশ ঘটেছিল। যদিও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যমভ্রাতা গিরীন্দ্রনাথের যাত্রাধর্মী পালা কিংবা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'অশ্রুমতী' বা 'কিঞ্চিৎ জলযোগ' সাধারণ রঙ্গালয়ে অভিনীত হয়েছে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে যে নাট্যচর্চা ঠাকুরবাড়িতে শুরু হলো, তার ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা, বিষয়ের বিন্যাস তো বটেই।


  *"এই অবিশ্রাম কর্ম ও জীবনসংগ্রামের মধ্যে একটা শান্তি এবং সন্দেহ এসে ক্ষীণস্বরে বলছে, ওগো একটু বোসো, একটু থামো— এসব কি হচ্ছে একটু ভাবো, একটু ভাবতে সময় দাও। মানুষ কেবল হাঁসফাঁস করে খাটবার জন্যে হয় নি, মাঝে মাঝে চুপচাপ করে ভাবা আবশ্যক।"

                                                                     —শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর





টেকনিক্যাল সহযোগিতা  :  রঞ্জিতা রায়

'নাট্যমেব জয়তে' পত্রিকার ১০ মার্চ ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত

Post a Comment

2 Comments

অনন্যসাধারণ লেখা ।
Satya Jit said…
ধন্যবাদ