ইরফান সেরকমভাবে প্রধান চরিত্র পেত না, চরিত্র নির্মাণে ইরফানের ক্ষেত্রে অনেক বেশী সময় লাগতো



লিখলেন নাট্যবিদ্যালয়ের ইরফান খানের জুনিয়র
(নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)

ফোনে শুনে অনুলেখন রঞ্জিতা রায়  : ১৯৮৪ সালে Nation School of Drama এ ইরফান ভর্তি হয় । তার তখন আঠারো বছর বয়স। সবচেয়ে কম বয়সে একজন অভিনেতা। বরাবরই খুবই চুপচাপ, ইন্ট্রোভার্ট একজন মানুষ হিসাবে তাকে পাই। অলোক চ্যাটার্জী, ইরফান, অমিত ব্যানার্জী, মিতা বশিষ্ট এই সমস্ত অভিনেতারা একসাথে তাদের অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেছিল। অনেক ঘটনা মনে পড়ছে। যেমন, ইরফান সহজে কারোর সাথে খুব একটা কথা বলত না, কোনো কিছুতেই তাপ উত্তাপ তার ছিল না, সব কিছুই ছিল মাপা এবং সব সময়ই তাকে দেখে মনে হত সে যেন কিছু ভাবছে। 


এরকম একটা সময়ের কথা মনে পড়ছে সীতারাম পাঞ্চল, নির্মল পান্ডে এরা টেনিস খেলছে  সে সময় ইরফান ও গেছে।  নির্মল পান্ডের খেলা শেষ হওয়াতে ইরফান হাতে তুলে নিয়েছে ব্যাট এবং সীতারাম পাঞ্চলকে প্রথমে সে সার্ভ করছে লম্বা লম্বা উচুঁ উচুঁ করে, সীতারাম পাঞ্চাল সেগুলো বরাবরের মতো ফিরিয়ে দিচ্ছে। এটা দীর্ঘক্ষণ চলার পরে আসল খেলা শুরু হয় এবং সে খেলাটিতে ইরফান হারে। হেরে চলে যাওয়াতেও তার কোনো তাপ উত্তাপ ছিল না। কোনো দুঃখ অথবা রাগ বা এসব কিছু নেই কিন্তু সীতারাম পাঞ্চাল সে সময় ওকে দেখে বলেছিল, 'আরে ও কি ভাবে ? ভাবে আমি খেলতে জানি না !' 




আসলে এই যে পরোখ করার ব্যাপারটা... কে কতটা খেলতে জানে সেটা খুব নীরবে করে দেখে গেছে এবং সমস্ত অভিনয় জুড়ে তার এই মোটিভেশন ভীষণ তাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে । Given circumstances, প্রদেয় শর্ত দেওয়া আছে, সংলাপ আছে, প্রপস আছে, সেট আছে, আলো আছে, কিন্তু কোনো রিয়্যাকশন সে কেনো করবে ? কী জন্য করবে ? এইটাই তাকে সব সময় ভাবিয়ে বেড়াতো। কি মোটিভেশনে সে ওখানে বসলো ? কী মোটিভেশনে সে উঠবে, কি মোটিভেশনে সে শুয়ে পড়বে বা আদৌও শোবে কিনা এইটা সব সময় তার ভাবনা ছিল  এবং এই চিন্তাতেই সে মশগুল থাকত এবং একা একা অভিনয়ের রিঅ্যাকশনের মোটিভেশন ও ডায়লগের সাবটেক্সট নিয়ে হেটে বেঁড়াত রাষ্ট্র বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জুড়ে । 



অলোক চ্যাটার্জী সে সময়ের খুবই উচুঁ দরের একজন স্টেজ অভিনেতা। অলোক চ্যাটার্জী সমস্ত নাটকে প্রধান চরিত্র পেত এবং ইরফান সেরকমভাবে পেত না, কারণ একটা প্রধান চরিত্র করতে যে সময় দিতে হয়, সেই সময়টা ইরফানের ক্ষেত্রে অনেক বেশী লাগতো। অলোক চ্যাটার্জী সেটা খুব অনায়সে কম সময়ে খুব ভালো দক্ষতায় সেটাকে পরিপূর্ণ করতে পারতো । কিন্তু ইরফানকে সেই একই অভিনয় যদি সময় দিয়ে করানো হতো, তাহলে দেখা গেছে যে ইরফানের অভিনয়টা আরো অন্যরকম অন্য মানের হয়েছে।




 এই যে গল্প গুলো বলে যাচ্ছি, এই গল্প গুলো তার শিক্ষানবিশ বয়স থেকে তার যে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল সেই যাত্রা থেকে পরবর্তীতে যে আমরা সিনেমা দেখছি তাতেও আমরা দেখতে পাবো। তার একটা অন্যরকম কিছু করার যে ঝোঁক। পঁয়ত্রিশ বছরের কর্মজীবনে তিনি পঞ্চাশটির বেশী দেশীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং পদ্মশ্রী পেয়েছেন ২০১১ তে। সালাম বম্বে’তে  অভিনয় করে তার চলচ্চিত্রের প্রথিত একটা জায়গা তিনি পান। যদিও তারপরে বেশ কিছু চলচ্চিত্রে ব্যর্থ হন। ওই ব্যর্থ হওয়ার কারণও ওই, নিজের মতো চরিত্র বা সেই চরিত্র ভাবার জন্য  সময় সেটা কোনো প্রযোজক তাকে দিত না। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা ২০০৩ এ চারি হাসিল বা মকবুল দেখেছি এবং সফল ভাবে তাকে দেখেছি। Life in a metro  তেও তাকে দেখেছি। খুব সফলতার সাথে অন্যরকমের একটা অভিনয় তিনি দিয়েছেন আমাদেরকে এবং শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ফ্লিম ফেয়ার, বাফটা,  এগুলো সমস্ত তো পেয়েছেনই, কিন্তু ইরফানের এই যে মগ্নতা, কেনো করছি কাজটা। শুধুমাত্র সংলাপ নয়, শুধুমাত্র একজন ক্যারেক্টার এসে একটা জেশ্চার করবে বা তাকে দেখে তার যে রিয়্যাকশন সেই রিয়্যাকশনটা কেন করবো ? কি জন্য করবো? তার পিছনে কী কারণ, এই যে বিষয়টা নিয়ে ইরফানের দীর্ঘদিনের তার যাত্রা এইটা খুব শিক্ষণীয় একজন অভিনেতা শিল্পীর পক্ষে। ইরফানের এই বিষয়টাই খুব মনে পড়ছে। 



অবিশ্বাসের বাতাবরণে থিয়েটার আঙিনা - সংস্কারপন্থীরা নব্য শাসনে মন্ত্রী, এমএলএ হলেন - জনগন আহ্লাদিত


ইরফান চলে গেল খুবই অল্প বয়সে। ৫৪ বছর বয়সে তার এই চলে যাওয়াটা আমাদের মত বেঁচে থাকা বয়সে সিনিয়রদের বেশ যন্ত্রণার। । সে যদি সুস্থ হয়ে আসতো, সম্ভবত আমাদের দেশ এবং বিদেশ মিলিয়ে আরো আরো ভালো ভালো অভিনয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করত। কারণ তার মধ্যে নতুন, অন্যরকম, একটু সরে গিয়ে, একটু অন্যরকম ভাবে ভেবে করার প্রবণতা ছিল, যা ভারতীয় অভিনয়শৈলীতে, বা চলচ্চিত্র শিল্পে, বা নাট্যশিল্পে খুবই দূর্লভ।





Post a Comment

0 Comments