অবিশ্বাসের বাতাবরণে থিয়েটার আঙিনা - সংস্কারপন্থীরা নব্য শাসনে মন্ত্রী, এমএলএ হলেন - জনগন আহ্লাদিত



কাঁকড়ার আত্মবন্ধক মেফিস্টোর কাছে


প্রদীপ ভট্টাচার্য্য

নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা

বহরমপুর রেপার্টরি থিয়েটার


বঙ্গনাট্যের ভাগ্যাকাশে এ এক 'অদ্ভুত আঁধার'। দিশাহারা নাট্যশিল্পী, নাট্যকর্মীবৃন্দ। এরই মাঝে কতিপয় নাট্যব্যক্তিত্ব কিছু বিধান দিচ্ছেন, এই অন্ধকার থেকে কী করে বেরিয়ে আসা যায়। বেশিরভাগই আক্ষেপের সুরে বলছেন, 'হৃতসম্মান ফিরে পেতে হলে ইতিবাচক কাজগুলি সারতে হবে আরও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে, আরও দ্রুত গতিতে। স্ব স্ব রাজনীতিতে অবিচল বিশ্বাস রেখেও আমরা যেন কোনও রাজনৈতিক দলের লেজুড় না হয়ে যাই, মিডিয়ারও নয়।'

          কেউ বলছেন 'একমাত্র অমুখবাবুই পথে নামছেন। অনেক সুস্থ চিন্তাশীল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চুপ করে আছেন, কেন?'

          কেউ কেউ আক্ষেপ করছেন, 'সিনিয়রদের কেউ মানছে না, সরাসরি গালিগালাজ করছে।'
     আমার নিজের কাছেই প্রশ্ন, সত্যিই তো, এরকম পরিস্থিতি তৈরি হল কেন? এটা তো একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘ, দীর্ঘ সময় লেগেছে। সবটা না পারলেও কিছুটা বুঝতে পারছি বা উপলব্ধি করতে পারছি।

          আমাদের নাট্যচর্চা অনেকটা এক ঝুড়িতে বসবাসকারী কাঁকড়া সমষ্টি। আমরা জান্তে ও অজান্তে শাসককুলের খাদ্যে পরিণত হওয়ার 'বাসনা' পোষণ করেছি, আবার অন্য কোনও নাট্যবন্ধু সেই আকাঙ্খা পোষণ করলেই কামড়ে ঠ্যাং ধরে নীচে নামিয়েছি।  বাকি বন্ধুরা এই ঘটনায় আড়ালে হেসেছে, মজা পেয়েছে।

          শাসককুলের আনুগত্য পাওয়ার 'লোভ' কোনদিনই আমরা ত্যাগ করতে পারিনি। এক - আধটা প্রযোজনা দর্শক আনুকূল্য পেয়েছে কি ধরাকে সরা জ্ঞানে দাবি করেছি ( মনে পোষণ করেছি ), এর জন্য অমুক সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। প্রতিযোগিতায় গোষ্ঠী তৈরি করেছি। যখন মনের বাসনা পূর্ণ হয়নি তখনি ব্যক্তি ক্রোধ কলমের আগায় বেরিয়ে এসেছে। মধ্যবিত্ত 'আমি' র প্রকাশ সদম্ভে জাহির করেছি।  আচ্ছা, কাঁকড়ারা কোন শ্রেণীভুক্ত? এরা কি পোকা ? না। পোকার থেকে বড়। তাহলে কি পশুপাখি শ্রেণীভুক্ত ? না। সে এক অদ্ভুত গোছের প্রাণী । জলেও আছে, ডাঙাতেও আছে। ঐ মাঝামাঝি । এটাই সর্বনেশে ! সর্বভাবে বড় হওয়ার সাধ আছে, কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে সেটাও হয়ে ওঠে না। তার আগে কোন না কোন ভাবে ধরা পড়ে যায় জালে ।

         আদর্শবান ব্যক্তিত্ব নাট্যজগতে থাকা সত্বেও তাঁদের অনুসরণ না করে কেবলমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে ভোগেরস্বার্থে নিজেকে ব্যবহার করেছি। পশ্চিমবঙ্গের নাট্যক্ষেত্র গুলির সার্বিক উন্নতির প্রয়াস না করে ইংরেজদের মতো এক একটি কলোনি ( উপনিবেশ ) তৈরির চেষ্টা করেছি ।  ভারত রাষ্ট্র কোনদিনই চায়নি নাট্য চর্চা অনুশীলন ইত্যাদি সমান্তরাল ভাবে রাজনীতির সমগোত্রীয় হোক এবং এর ইচ্ছে ডানাগুলোকে কি ভাবে মুড়ে নিজেদের সপক্ষে তাঁবেদারির পর্যায়ভুক্ত করা যায় তার জন্য সর্বদা সচেষ্ট। এদের উদ্বাস্তু-র মত কিছু ডোল(অনুদান) দাও যাতে এরা কোনদিনই লোভকে হেয় করে এক জায়গায় সমবেত হতে না পারে। একক, এককভাবে ভিন্ন ভিন্ন মত, চিন্তা নিয়ে চর্চা কর, বিতর্ক কর। এতে গণতন্ত্র রক্ষিত হবে, আবার ব্যক্তি স্বাধীনতাও বজায় থাকবে। কাঁকড়ারা খুশি। 'জাতীয় থিয়েটার' নামক 'খুড়োর কল' নিয়ে রাষ্ট্রের তাঁবেদার কিছু বুদ্ধিজীবি ভাবনাটাকে উস্কে দিয়ে ঝুড়ির কাঁকড়াদের মজা দেখবেন। আসল কথা ভোট এবং ক্ষমতা দখল। মহৎকথা - ডাইভারসিটি ও ইউনিটি ভারত ভূমের মূলকথা। ফলে নাট্য মানুষেরা স্বাধীনতার এত বছর পরও একটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারেন না বা তুলতে দেওয়া হয় না। যাঁরা এই কাজ করতে পারতেন তাঁরাও ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে দ্বিধা বিভক্ত, টুকরো টুকরো। স্লোগান সর্বস্য মিছিলে এক চাষী বুঝতে না পেরে আবেগের বশে বলে ফেলেন - কমিউনিস্ট পার্টি কয় (করে) প্রকার (পুকার) - তিন প্রকার, চার প্রকার। কমরেডের হাতে লাঞ্ছিত হয় চাষা। এই সত্যটাকে অস্বীকার করতে পারি না আমরা। নাট্য দলের প্রধানরাও ক্ষমতাশীল দলের পাশেই থাকবেন একটু সুখের আশায় এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃত রাজনীতি যখন রাষ্ট্র, অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখনই মানুষ স্বপ্ন দেখে। যখন অর্থনীতিই রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে তখনই মানুষ আর যন্ত্রের কোনো প্রভেদ হয়না। স্বপ্ন, বিশ্বাস, নীতি সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে কাঁকড়ারা মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে রক্তাক্ত হয়। বাস্তবটা এটাই।

          যতই দার্শনিক সাজার ভান করি না কেন, আমরা কাঁকড়ার স্বভাবের বাইরে বেরতে চাইনি, বা চাই না। দর্শন তো একদিনে গড়ে ওঠে না। ওটাকে বহন করতে হয়, পরিমার্জন করতে হয় এবং ব্যক্তি জীবনে ক্রমান্বয়ে প্রয়োগ করতে হয়, সতর্ক থাকতে হয়। না হলে লখিন্দরের লৌহবাসরের ছিদ্রপথে সর্পকুলের প্রবেশ ঘটবেই। সত্তর দশকে 'নানা হে' নাটকটি যখন প্রযোজনা হয় তখন তো কোনও রাজনৈতিক দলকে জিজ্ঞাসা করে তা সৃষ্টি করা হয়নি। বরং রাজনৈতিক বামদলগুলি তাদের প্রয়োজনে নাটকটি ব্যবহার করে বহু মানুষের মধ্যে নিয়ে গেছে। এই সত্যকে তো অস্বীকার করতে পারি না।

          আবার এটাও সত্যি 'দংশন' নাটকে লোকশিল্পী এবং শিল্পকে আর্থিক অনুদানের লোভ, দিল্লি যাওয়ার টোপ দিয়ে বিভাজন টানার সর্বনেশে প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বলার প্রক্রিয়া কিন্তু বাম আমলেই ঘটানো গেছে। এতে শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা-চিন্তাকে প্রকাশ করা গেছে রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকেই, অসুবিধা হয়নি।

          আবার নব্বই-র দশক থেকেই বাম শাসনের আমলেই এক ধরনের স্থবিরতা গ্রাস করতে থাকে সংস্কৃতি জগতকে। আধিপত্য ধ্বনিত হয়নি। স্বার্থের কারণে অনেক কিছু মেনে নিয়েছি, দলের সাময়িক স্বার্থের কথা মাথায় রেখে, এখানে কোনও আদর্শ বা দর্শন কাজ করেনি।
          মফস্বলের নাট্য উন্নয়নের নামে প্রাথমিক কিছু কাজ যেমন ওয়ার্কশপ, জেলা নাট্যোৎসব সংগঠিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরবর্তীকালে সুযোগ পাওয়া/ অর্থবণ্টন/ কে কটা ক্লাস পাবে, এরও একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয় এই সময় থেকেই। এক শ্রেণীর দালালচক্র, তোষামোদকামীচক্রও গড়ে ওঠে কিছু পাইয়ে দেওয়ার নামে।  'নাটক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো করে, কাজের কাজ কিছু হয় না' - এ রকম ফতেয়া দিয়ে থাকেন কিছু নাট্য ব্যক্তিত্ব। অথচ নাট্য উন্নয়নের নামে নাট্য ওয়ার্কশপের ক্লাস নেওয়ার ভাগাভাগিতে গোঁসা হয় এদেরই।

          সমাজে এইরকম নানা অসন্তোষ যখন দানা বেঁধে এক সময় এবং তেমন সময়ে বাম শাসনের পট পরিবর্তন ঘটে যায় - ঠিক তখনই ঝুড়ি থেকে সমস্ত কাঁকড়া বেরিয়ে পড়ে দিশাহারা অবস্থায়।

         এই পরিস্থিতিতে 'সমাজ সংস্কারক' কতিপয় নব্য যুবক ও যুবতীর আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা প্রথমেই শাসনের চাবুক হাতে নগর এবং মফস্বলের কাঁকড়াদের বড় অংশকে একটি ঝুড়িতে আটকাতে সমর্থ হলেন, তাগড়া বড় কাঁকড়াদের শাসন করলেন। বেশ কিছু কাঁকড়া না মেনে এদিক ওদিক সরে থাকলো ঘাপটি মেরে। সাংস্কৃতিক শাসকরা এবার যে কাজটি করলেন সেটা হল - ঝুড়ির মুখটায় আলগোছে একটা জাল বিছিয়ে দিলেন যাতে কেউ স্বেচ্ছায় পালাতে না পারে। সংস্কারপন্থীরা নব্য শাসনে মন্ত্রী, এমএলএ হলেন। পারিতোষসহ বিভিন্ন কমিটির সদস্য হলেন। জনগন আহ্লাদিত। এতদিনে এদের স্বরূপ চেনা গেল। তিলে তিলে সৃষ্ট সমাজ বিপ্লবের স্বপ্ন, সম্পর্কের, বিশ্বাস স্থাপনের পাত্রটিও মুহূর্তে খানখান হয়ে 'আমরা-ওরা' য় বিভাজিত হল। এক অবিশ্বাসের বাতাবরণে আচ্ছন্ন হল থিয়েটার আঙিনা। বঙ্গভঙ্গের মতো শোক আছড়ে পড়ল পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির আকাশে বাতাসে। সবই আছে - আবার নেই ও আমরাই কখন যেন আমাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলেছি। একটু দূরেই শাসককুল আমাদের দুর্দশায় হাসছে। আমরা বোধ হয় পূতনার স্তন পান করছি। বাম শাসনে কে বড় বিপ্লবী এই বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য হিটলার রাজকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং একনায়কতন্ত্রকে আঘাত করতে ব্রেশটের নাটককে আশ্রয় করে সমাজ বদলের স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। কিন্তু যখন সমাজ জীবনে সত্যিই ব্রেশটের নাটকের প্রয়োজন পড়ল তখন আমরা কাঁকড়ার দল জালে ঢাকা ঝুড়িতে আবদ্ধ, কিছু করার নেই। প্রশ্ন করলেই শাসনের চাবুক নেমে আসবে। এখন কেবল আনুগত্য চাই। চিঁ চিঁ করে 'হল দিচ্ছে না, ওটা করছে না' বললে কি হবে। জাল ফুঁড়ে বেরোবার পথ বন্ধ করা আছে। হঠাৎ একটা বিষয় মনে পড়ে গেল, মজার ঘটনাটা শুনেছিলাম ( শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে জানা ) - জাতীয় স্তরে ভারতবর্ষের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের নাটক নিয়ে দিল্লিতে একটি উৎসব হবে। সঙ্গীত নাটক একাডেমির আয়োজনে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে তিনটি দল আমন্ত্রিত বহুরূপী ( নবান্ন ), পদাতিক এবং পি,এল,টি। পি, এল, টির কাছে কল্লোল, আজকের শাজাহান, মানুষের অধিকারে তিনটির মধ্যে একটি নাটক উপস্থাপন করার প্রস্তাব আসে। উৎপল দত্ত জানান, PLT কল্লোল মঞ্চস্থ করবেন। ফাঁপড়ে পড়েন SNA'  র চেয়ারম্যান গিরীশ কারনাড, কারণ নাটকে সরাসরি নেহেরু সরকারের তীব্র সমালোচনা আছে, এছাড়াও খাইবার জাহাজ শ্রমিকেরা বিজয় উল্লাসে ছোট জাতীয় পতাকার দশগুণ বড় লাল পতাকা উঠে আসে, এটা কংগ্রেস সরকার কিছুতেই মেনে নেবে না। নাটকটা যদি Approved না হয়, উৎপল দত্ত জাতীয় স্তরে প্রতিবাদ করে Hero হবেন। এই সুযোগ না দিয়ে কারনাড সাহেব পদত্যাগ পত্র তৈরী রাখলেন, যাতে শিল্পর স্বাধীনতা প্রশ্নে তিনি ব্যতিক্রমী ব্যক্তি প্রতিভাত হন। ভারত সরকার নাটকটিকে উদ্বোধনী নাটক হিসাবে মনোনীত করলেন সকলের আশঙ্কাকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে। চালাকির জায়গাটা হল - সেদিন কিছু আমলা এবং SNA র কমিটির কিছু লোকের উপস্থিতিতে প্রায় ফাঁকা হলে 'কল্লোল' অভিনীত হল। সরকার প্রমাণ করলেন তাঁরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং ব্যক্তি ও শিল্পের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন না। সালটা সম্ভবত ১৯৮৮ - ৮৯। এই সরকারই দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল।

          এ যেন সেই বৃহৎ কল্যাণের স্বপ্নে ব্যক্তির ইচ্ছাকে মেফিস্টোর কাছে আত্মাকে বন্দক রাখা, আমার সৎ ইচ্ছার রক্ত এক ফোঁটাও মাটিতে ফেলতে দেবে না। এটাই শর্ত মেফিস্টোর।  মানুষ সৃষ্ট রাজনৈতিক আদর্শবাদী  দলও যখন সরকারে রূপান্তরিত হয় সেটা আর পবিত্র থাকে না মমতাময়ী হয় না। তখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতা অর্জন, ভোটই শেষকথা। নৈতিকতা, আদর্শ ইত্যাদি ভাবনা তাকে তোলা থাকে। এর থেকে নাটক, নাট্যদল তাঁদের ক্রিয়া বিশুদ্ধ থাকে কি করে? শিল্পীদের তখন একমাত্র কাজ নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করার আগে   ঢোল বাজিয়ে, চি চি করে গান গেয়ে লোক জড়ো করা। বৃহৎ জনতার কাছে পৌঁছানোর জন্য শিল্পের দরকার অবলম্বন। ঠিক এই কারণেই - ক্ষমতার দম্ভে কাঁকড়া সাদৃশ্য রাজনৈতিক নেতারা পরোক্ষে শিল্পীদের প্রভু হয়ে ওঠেন। আমরাও বাধ্য হই মেনে নিতে। এটা চলছে বহুকাল ধরেই। শিল্পের ভাগ্যে তাই ডোল বা ভিক্ষা। দেশভাগ উদ্বাস্তু সৃষ্টি করেছে। সেই সৃষ্টির শিল্প আজও বহন করছি।

           বিজন ভট্টাচার্য্যের কথায় 'যখন সময় আসে মরে যাই। এই মরাটাও ভালো করে মরা হয় না। কালের ওপর এক্তিয়ার নেই বলেই অঙ্গুলি  সংকেতে চলে যেতে বাধ্য হই।'
          আমার কথায় - সরকারের আনুকূল্য থাকলে পাছার তলে তিনটে বরফ খন্ড, উপরিভাগে কিছু মালা ফুল। আর একটু সখ্যতা বেশি থাকলে, শ্মশানে মরচে ধরা রাইফেলের গোটা দশ গুলির আওয়াজ..ব্যাস।

          আমার ব্যক্তিগত দুটো অভিজ্ঞতার কথা বলেই লেখাটা শেষ করব।

          'উইংকেল টুইংকেল' নাটকে অভিনেতা হিসেবে শেষ পর্যন্ত হাজির থেকেছি। বাম জমানায়, বাম-শাসনের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক নাটক। প্রথম অভিনয় থেকে শেষ অভিনয় পর্যন্ত দর্শক আনুকূল্য পেয়েছে। নাটককার এবং নির্দেশক আমার বিশেষ বন্ধু। তাঁদের বিশেষ অনুরোধে এবং তাঁদের বিশ্বাসে নাটকটি পাঁচটি রিহার্সাল দিয়ে  মঞ্চে অভিনয় করি। তখনও পুরো নাটকটা জানি না, যদিও এটা আমার অজ্ঞতা। নাটকের বেশ কিছু জায়গার সঙ্গে আমি একমত ছিলাম না। কিছু কট্টর বাম-মনস্ক মানুষ আমার প্রতি বিরূপ হলেন। কিন্তু এখন করার কিছু নেই। ভুল, ভুলই। মিডিয়া, দর্শক, নাটকটি নিয়ে লোফালুফি করেছেন। তখন একটা বিষয় বুঝতে পারছিলাম যে বাম-শাসনের বিরুদ্ধে মানুষ একজোটে মত প্রকাশ করছে। পরিবর্তনের পর বর্তমান শাসকের বিরুদ্ধেও এই নাটকটায় সমভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখেছি দর্শককূলকে। ফলস্বরূপ নাটককার নাটকটি আর করার অনুমতি দেননি। ফলে নাটক বন্ধ। শুনেছি, সংস্কৃতি-সংস্কারকদের মধ্যেও বিভাজন দেখা দিয়েছে।

          দ্বিতীয় ঘটনা, কারাবন্দীদের নিয়ে করা 'তাসের দেশ' নাটকটির সাফল্যের পরবর্তী নাটক 'রক্তকরবী'-র মহলা শুরু। নাটকটি যখন মঞ্চস্থ হওয়ার অনুমতির অপেক্ষায়, ঠিক সেই সময়ে একটি ফোনের মাধ্যমে নাটকটি মঞ্চস্থ করা বন্ধ হয়। সময়টা ( নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুর আন্দোলন ) বাম জমানা। পরিবর্তনের পরেও নাটকটি মঞ্চস্থ করার অনুমতি পাওয়া যায়নি ( লিখিত ভাবে জানানো হয় )। রবি ঠাকুর কৃত নাটকটির পুরোনো নাম  (যক্ষপুরী) দিয়ে আবার আবেদন করি।এবার লিখিতভাবে অনুমতি আসে, এই জমানাতেও। নাটকটি বর্তমানে অভিনীত হয়ে চলেছে। সত্যি সেলুকাস .....।

          আমাকে কেউ নাট্যচর্চা করতে বলেনি, ছেড়ে যেতেও বলে না। আমি নাট্যচর্চা না করলেও পৃথিবীর কিছু যায়-আসে না। এ দায় একান্ত নিজের। তাই হতাশ না হয়ে নিজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই এবং সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়া প্রতিনিয়ত করে যেতে হবেই। রাত্রি যতই গম্ভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন না কেন - অপেক্ষা করতে হবে, সামনের জন্য- ভোর হবেই।

- অনুলেখন রঞ্জিতা রায়


আপনাদের যে কোন রকম মতামত আমার কাছে পৌঁছে দিতে, থিয়েটার ফোরাম এর মূল ফেসবুক পোস্টে কমেন্ট করুন ।                                                             -- প্রদীপ ভট্টাচার্য্য

Post a Comment

0 Comments