মঞ্জুশ্রী ভাদুড়ী
কোচবিহার শিশু-কিশোর সংস্থার উদ্যোগে নাট্য উৎসব পালিত হল কোচবিহার রবীন্দ্রভবনে, ৩০ ও ৩১ জানুয়ারি, ২০২৪। এই সংস্থা বরাবরই ছোটোদের জন্যে বিবিধ কাজ করে থাকে। নানারকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছোটোদের উৎসাহ প্রদান করে। উক্ত সংস্থার নাট্যোৎসবে অনেকগুলো নাটক হয়েছিল দু'দিন ধরে। পুতুল নাটিকা রাজদণ্ড, রাজা সাজা, অতিথি, কাজের লোক, পঞ্জরা, হ য ব র ল; দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় নাটকটি ছিল 'পঞ্জরা', যেটি নিয়ে দু'চারকথা লেখার ইচ্ছে হল।
অতি সাম্প্রতিককালে তালিবান শাসনে আফগানিস্তানে ঘটে যাওয়া কিছু সত্য ঘটনাকে অবলম্বন করে নিজস্ব ভাবনার সুনিপুণ প্রয়োগে একটি চমৎকার নাটক লিখেছেন শ্রী তমোজিৎ রায়। তিনি একাধারে এই নাটকটির নাট্যকার, নির্দেশক ও পরিচালক। আলোক পরিকল্পনাও তিনিই করেছেন।
জলপাইগুড়ি কলাকুশলী অভিনীত এই নাটকটিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রয়েছে একটি টানটান গল্প! অত্যন্ত গতিময় এই নাটকটিতে ছোটোদের সঙ্গে অভিনয় করেছেন বড়োরাও। ছোটো-বড়ো উভয়পক্ষই অভিনয়ে অত্যন্ত পারদর্শী। এই নাট্যগোষ্ঠীর অন্য আরও কিছু নাটক দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার, এঁরা প্রত্যেকেই কুশলী অভিনেতা। ছোট্ট দিদি আর তার ভাইটি ভাবীকালের অসামান্য দুই অভিনেতা। তাদের নাম উল্লেখ করতেই হয়, তারা যথাক্রমে অদ্রিজা ও শৌর্য, নাটকে তাদের নাম ছিল রাবেয়া আর নবী।
নাটকটির চমৎকার আবহ আমাদের মুগ্ধ করে রাখে। আবহ করেছেন সৌভিক ধর, গানও গেয়েছেন খুব ভালো। আর একটি গান ছিল, একটি মেয়ে নাচছে ও গাইছে এরকম একটি দৃশ্যে। খুব ভালো লেগেছিল সেটি। গায়িকা দিদির ভূমিকায় অভিনয় করা অদ্রিজা। নাটকের পোশাক পরিকল্পনা, আবহ এবং আলো মিলে আফগানিস্তানের একটা বিশ্বাসযোগ্য চিত্র ফুটে উঠেছিল মঞ্চে।
নীলবর্ণ শৃগালের গল্পটি অতি দক্ষতার সঙ্গে নাটকের একটি পর্যায়ে সংযোজন করা হয়েছে। যেটি এই নাটকের ঘটনাবলীর মধ্যে একটি বার্তাসহ বিনোদনের আবহ এনেছে। হঠাৎ গজিয়ে ওঠা রাজার দশা হয় ওই নীলবর্ণ শৃগালের মতোই! এটি যেন একটি ভূমিকা, কারণ তারপরেই এসেছে নাটকের চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স। সকলের প্রিয় দাদু গ্রেপ্তার হয়েছেন অত্যাচারী শাসকদের হাতে। সেখান থেকে ফেরার কোনও উপায় নেই। সকলের গভীর বিষাদের মধ্যে মধ্যরাতে বন্দী দাদু তাঁর আদরের নাতি-নাতনিদের দিয়ে গেলেন এক গুপ্তধনের সন্ধান। এই অলৌকিক ঘটনা সম্ভব হয়েছে এই কারণেই যে নাটকের ছোট্ট ছেলে নবী বলেছে তার দাদু ম্যাজিক জানে।
গভীর অন্ধকারের শেষে একটা আলো তো থাকেই, থাকে জীবনের গল্প। নয়তো এই বেঁচে থাকা মিথ্যে হয়ে যায়। কিম্বা একটি আলোর কথা ভেবে ভেবেই অতলান্ত বিষাদ থেকে আমরা নিজেদের টেনে তুলি। সকল দুঃখ ভুলে জেগে উঠি আগামীদিনের আলোর আশায়। তাই মাতৃহারা হয়েও সন্তান বেঁচে থাকে অথবা পুত্রহারা হয়ে মাতা! সেটা একটা ম্যাজিক যা পরিচালিত করেন সেই অসীম-অনাদি-অনন্ত জীবনদেবতা। যার কোনও ব্যাখ্যা হয় না। গভীর বিষাদে ডুবতে থাকা সরল শিশু দুটোও পেয়ে যায় ম্যাজিকের ছোঁয়া, তাদের বন্ধুদের তাতে সামিল করে।
তারা সকলে ভাবে গুপ্তধন হাতে পেলে তারা দুষ্টু শাসকদের অস্ত্রহাতে জব্দ করবে। কিন্তু গুপ্তধন হিসেবে তারা পায় রাশি রাশি বই, পেনসিল, ছবি আঁকার সরঞ্জাম। সেসব তাদের সত্যিকারের মুক্তির সন্ধান এনে দেয়। ছোট্ট দিদি, ভাই আর তার বন্ধুদের বলে, দাদুর কথা মনে করো। তিনি বলেছিলেন অস্ত্রের চেয়ে কলম অনেক শক্তিশালী। সুতরাং নির্বোধের মত রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম নয়, মননে ও চিন্তনে শক্তিশালী হয়ে উঠতে হবে আমাদের। হাতে তুলে নিতে হবে কলম ও তুলি। গাইতে হবে গান। এসবের দ্বারা আত্মদীপ জ্বালিয়ে তুলতে হবে। তাহলেই আমরা অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারব। তাদের এই চিন্তায় সামিল হল পথভ্রষ্ট হওয়া বড়োরাও। শেষ পর্যন্ত শিল্পের কাছে, শুভ মঙ্গলদায়ক যা কিছু, তার কাছেই যে ফিরতে হবে এই ফেরায় রয়েছে তারই ইঙ্গিত।
একটি অমূল্য বার্তাবাহী নাটক দেখার সাক্ষী ছিলাম আমরা এইদিনে, ৩১ জানুয়ারির সন্ধ্যায়। নাট্যদল ও পরিচালকের প্রতি অপরিসীম শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইল।
0 Comments