গর্বের দ্বাবিংশ নাট্যমেলার নির্বাচন পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দর্শক মহলে '?' - NEWS THEATRE FORUM


সম্পাদকীয়

প্রতিবছরের মত এ বছরও রাজ্যজুড়ে আয়োজিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ নাট্যমেলা । ইতিমধ্যেই কলকাতা পর্ব শেষ হয়ে আগামী ১০ মার্চ থেকে শুরু হতে চলেছে জেলা পর্বের নাট্যমেলা । প্রতিবছরের মতো এবছরও 'পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি'র পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে কবে কখন কোথায় কোন নাটকের দল আমন্ত্রিত ।

এই নাট্যমেলায় সুযোগ পাওয়ার জন্য নাট্য আকাডেমির পক্ষ থেকে গত ১৫ জানুয়ারি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে আবেদন জানানোর কথা বলা হয়েছিল । নিম্নে সেই বিজ্ঞাপনটি উল্লেখ করা হলো এবং উল্লেখযোগ্য ভাবে খেয়াল করবেন এই বিজ্ঞাপনের ৩ ও ৫ নম্বর পয়েন্টটি । 

৩ নম্বর পয়েন্টে উল্লেখ করা হয়েছে,

'প্রযোজনাটি ২০২০ -র এপ্রিল মাস থেকে বর্তমান সময়ের মধ্যে প্রস্তুতকৃত হতে হবে ।'

• ৫ নম্বর পয়েন্টে উল্লেখ করা হয়েছে,

'একবিংশ নাট্যমেলা অথবা মিনার্ভা নাট্যসংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র আয়োজিত সদ্য সমাপ্ত বিনোদিনী নাট্যমেলায় অংশগ্রহণকারী নাট্য দলগুলিকে দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় মনোনীত করা হবে না ।'

এবার আসা যাক মূল বিষয়বস্তুতে । ওপরে উল্লিখিত এই নিয়মাবলী সঠিকভাবে মান্য করা হয়েছে কি ?

প্রশ্নটা এখানেই...

যেমন ধরা যাক,

দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর তিনটায় মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে শান্তিপুর   সংস্কৃতিক প্রযোজিত 'রক্ত উপাখ্যান' নাটকটি । এই একই নাটক ২০১৯ সালে ৮ই মে সন্ধ্যা ৬:৩০ -এ মঞ্চস্থ হয়েছে বহরমপুর রবীন্দ্র সদনে । এক্ষেত্রে সম্ভবত বিজ্ঞাপনের ৩ নম্বর পয়েন্টটি কার্যকর করা হয়নি । 
একই সাথে আরো একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, আগামী ১২ মার্চ ২০২৩ সন্ধ্যা ৬:৩০ -এ কোচবিহার রবীন্দ্রভবনের মঞ্চস্থ হবে কোচবিহার কম্পাস প্রযোজিত 'দেওয়ান গাজীর কিসসা' । যতদূর জানা যাচ্ছে এই  নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৯৬ সালে । কিছু শো হওয়ার পরে তা বন্ধ হয়ে যায় । পুনরায় অনেক বছর পর ২০২০ সাল থেকে  দলটি নতুন করে  একই নাটক মঞ্চস্থ করতে চলেছে ।

এরপর আসা যাক পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ বিজ্ঞাপনের ৫ নম্বর পয়েন্টে । এখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা আছে, 

'একবিংশ নাট্যমেলা অথবা মিনার্ভা নাট্যসংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র আয়োজিত সদ্য সমাপ্ত বিনোদিনী নাট্যমেলায় অংশগ্রহণকারী নাট্য দলগুলিকে দাবিংশ নাট্যমেলায় মনোনীত করা হবে না ।'

অথচ এই ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উপরে উল্লেখিত নাট্যমেলায় সুযোগ পাওয়ার পরেও যথারীতি এবছরও বেশ কিছু দল সুযোগ পেয়েছেন । 

যেমন,

• গত বছর একবিংশ নাট্যমেলায় ১১ মার্চ ২০২২ সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে কসবা অর্ঘ্য প্রযোজিত 'নাগ নাগিনী কথা' । এবছর দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় ওই একই দলের নাটক 'সাইকোসিস' গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সন্ধ্যা ৬:৩০ টায় রবীন্দ্র তীর্থ মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে ।

• গতবছর একবিংশ নাট্যমেলায় ১১ মার্চ ২০২২ তারিখ সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় গিরিশ মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে দমদম শব্দমুগ্ধ নাট্যকেন্দ্র প্রযোজিত 'স্যাফো চিত্রাঙ্গদা' এবং এবছর দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় আগামী ১৩ মার্চ ২০২৩ তারিখে বহরমপুর রবীন্দ্র সদনে এই একই দলের নতুন নাটক 'নবাব' মঞ্চস্থ হতে চলেছে ।

• গত বছর একবিংশ নাট্যমেলায় ১৫ মার্চ ২০২২ গিরিশ মঞ্চে সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় থিয়েলাইট প্রযোজিত 'চুয়াচন্দন' নাটকটি মঞ্চস্থ হয় । এবছর দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় ওই একই দলের নাটক 'মায়াপরী' আগামী ১৩ মার্চ ২০২৩ বাঁকুড়া রবীন্দ্রভবনে মঞ্চস্থ হতে চলেছে ।

• গত বছর একবিংশ নাট্য মেলায় ১৭ মার্চ ২০২২ সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় অশোকনগর নাট্যমুখ প্রযোজিত 'মিস্টার রাইট' নাটকটি । এবছর দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় ওই একই দলের নাটক 'হাউ মাচ ইওর আয়রন' মঞ্চস্থ হতে চলেছে বহরমপুর রবীন্দ্র সদনে আগামী ১৬ মার্চ ২০২৩ ।

• গত বছর একবিংশ নাট্য মেলায় ১৬ মার্চ ২০২২ সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় মধুসূদন মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় মালদহ ফিনিক্স প্রযোজিত 'ম্যাকবেথ' । এ বছর দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় ওই একই দলের 'হারুণ' নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছে বহরমপুর রবীন্দ্র সদনে আগামী ১৭ মার্চ ২০২৩ ।

• গত বছর একবিংশ নাট্যমেলায় ১৭ মার্চ ২০২২ বিকেল পাঁচটায় তৃপ্তি মিত্র নাট্যগৃহে গোবরডাঙ্গার নকসা প্রযোজিত 'ইয়েস' মঞ্চস্থ হয় । এবছর দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সন্ধ্যে ছটায় মিনার্ভা থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয় ওই একই দলের নাটক 'চিত্রাঙ্গদা' ।

• গত বছর একবিংশ নাট্যমেলায় ১৪ মার্চ ২০২২ তারিখ দুপুর তিনটায় কলকাতা রবীন্দ্রসদনে মঞ্চস্থ হয় বরানগর ভূমিসুতো থিয়েটার প্রযোজিত 'চর্যাপদের কবি' । এবছর দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় ওই একই দলের নাটক 'জয় বাংলা' মঞ্চস্থ হবে আগামী ১৪ মার্চ ২০২৩ অশোকনগর শহীদ সদনে ।

গত বছর একবিংশ নাট্যমেলার সংক্ষিপ্ত  তালিকা

উপরে উল্লেখিত সমস্ত ঘটনা আসলে হিমশৈলের চূড়া মাত্র । উদাহরণস্বরূপ উপরে উল্লেখিত নাম গুলি ব্যবহার করা হলেও একটি বড় তালিকা যুক্ত করে দেওয়া সম্ভব । এমন ঘটনা প্রতি বছর অসংখ্য পরিমাণে ঘটে চলেছে । প্রতিবছরের নাটকের তালিকা যদি লক্ষ্য রাখেন তাহলে সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে ।

বছর দ্বাবিংশ নাট্যমেলার সংক্ষিপ্ত  তালিকা

আলোকপাত করা যেতে পারে আরো একটি অদ্ভুত বিষয়ের দিকে, 

নাট্য আকাদেমি দ্বারা সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয় গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে এবং পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে আবেদন পত্র জমা করতে বলা হয়েছে । 

বিজ্ঞাপনে উল্লেখিত ১ নম্বর পয়েন্টটি যদি দেখেন,

সেখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা আছে এই যে...

১) দলের প্যাডে প্রশাসন আধিকারিক তথা সদস্য সচিবের কাছে আবেদন করতে হবে । সঙ্গে দিতে হবে নাটকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, সময়সীমা, প্রযোজনাটির শংসার স্বপক্ষে পেপার কাটিং , ছবি, শংসাপত্র ইত্যাদি ।

যদি তাইই হয়,

তবে খেয়াল করে দেখুন, আগামী ১৩ মার্চ ২০২৩ থিয়েলাইট প্রযোজিত 'মায়াপরী' নাটকটি বাঁকুড়া রবীন্দ্রভবনে উদ্বোধনী নাটক হিসেবে দ্বাবিংশ নাট্যমেলায় মঞ্চস্থ হতে চলেছে । কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই নাটকটির প্রথম শো গত ৪ মার্চ ২০২৩ তারিখে মিনার্ভা থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছে । এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যে নাটকটি গত ৪ মার্চ প্রথম শো করছে সেই নাটকের পেপার কাটিং, ছবি ও শংসাপত্র কিভাবে ২৫ জানুয়ারি ২০২৩ -এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমিতে জমা পড়ল ?

তাহলে কি ধরে নিতে হবে পশ্চিমবঙ্গের একেকটি নাট্য দলের জন্য একেকটি নিয়ম তৈরি করা হয়েছে ?

আমাদের গর্বের এই নাট্য একাডেমীর মাথার ওপরে বর্তমানে বসে আছেন আমাদের সকলের প্রিয় নাট্য ব্যক্তিত্ব শ্রীদেবশঙ্কর হালদার মহাশয় । আমরা শুধুমাত্র তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ।

আমরা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানাই, পশ্চিমবঙ্গ সরকার অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিবছর নাট্যমেলার আয়োজন করে থাকে যা আমাদের কাছে অত্যন্ত গর্বের এবং আনন্দের । এই নাট্যমেলা'কে কোন রকম কালিমালিপ্ত করার উদ্দেশ্য আমাদের নেই । নাট্যমেলা আমাদের সকলের । আমরা চাই পশ্চিমবঙ্গের নাট্য পরিবেশে স্বচ্ছতা বজায় থাকুক ।

শ্রীদেবশঙ্কর হালদার সহ অন্যান্য গুণীজনদের দিকে যাতে কোনোভাবেই আঙুল না ওঠে, তাই আরেকটু নজর রাখার একান্ত অনুরোধ জানাই ।

বিজ্ঞাপনের ৬ নম্বর পয়েন্টে উল্লেখ করা আছে,

দল নির্বাচনের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদমি উপদেষ্টা পর্ষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত । আমরা এই উপদেষ্টা পর্ষদকে এবং তাদের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানাই । তারা যা সঠিক মনে করেছেন সেটিই চূড়ান্ত । যদি এক একটি দলের জন্য এক এক নিয়ম-নীতি পালন করা হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনে তা উল্লেখ রাখা হোক ।

Post a Comment

0 Comments