নিজস্ব প্রতিবেদক : গত ২০০৪ সাল থেকে প্রতি এক-বছর অন্তর এক ব্যতিক্রমী আন্তর্জাতিক নাট্য মেলার আয়োজন করে আসছে 'জন সংস্কৃতি সেন্টার ফর থিয়েটার অফ দি অপ্রেসড' । আন্তর্জাতিক নাট্য মেলা বলতে সাধারণত আমরা বুঝি সেখানে বিদেশের শিল্পীরা তাদের প্রযোজনা নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হবেন, কিন্তু 'মুক্তধারা' নাট্য মেলা সম্পূর্ণ উল্টো নজির সৃষ্টি করে তার ধারাবাহিক বহমানতা বজায় রেখেছে । যদিও 'মুক্তধারা'য় বিগত দিনে বিদেশি থিয়েটার দল তাদের প্রযোজনা নিয়ে এসেছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, এখানে ওয়ার্কশপ পার্টিসিপেন্টরা ছোট ছোট দৃশ্য তৈরি করে গ্রামের মানুষদের কাছে গল্প নিয়ে যান । যেখানে ভারতবর্ষের বাইরের অন্যান্য দেশের সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যা গুলোর ব্যাপারে এখানকার গ্রামের মানুষদের সাথে ফোরাম থিয়েটার এর মাধ্যমে কথপোকথন হয় ।
এই নাট্য মেলায় প্রতি বছর প্রায় ২৬-২৭ টি দেশ থেকে প্রায় ৮০-৯০ জন দর্শক উপস্থিত হলেও কোভিড অতিমারির পর এবছর ভিসা সংক্রান্ত সমস্যায় ১১ টি দেশের মোট ২৭ জন দর্শক উপস্থিত হয়েছেন । এই মেলাকে কেন্দ্র করে মধ্যমগ্রামের বাদু, কলকাতা এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে এই বিদেশি দর্শকরা জন সংস্কৃতি'র কর্মকাণ্ড উপভোগ করেন । ১৫ দিনের এই আয়োজনে থাকে ফোরাম থিয়েটার কর্মশালা, ফোরাম নাটক, বিভিন্ন লোকশিল্প যেমন ছৌ নাচ, নাটুয়া নাচ, রায়বেশে, পুতুল নাটক, গাজন, বাউল, তরজা, বাংলার ঢাক, ওড়িশার গুটিপোয়া নৃত্য, সহ স্থানীয় কিশোর কিশোরীদের নাচ-গান-আবৃত্তি-যোগব্যায়াম ইত্যাদি ।
গত ৩ ডিসেম্বর মধ্যমগ্রামের বাদুতে অবস্থিত অগোস্ত বোয়াল অডিটোরিয়ামে শুভ সূচনা হয় 'মুক্তধারা ৯' এর । উদ্বোধন করেন UNESCO WORLD CHAIR (Community Media) ড. ভিনোদ পাভারালা, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন British Council India (East, North-East India) -র ডিরেক্টর ড. দেবাঞ্জন চক্রবর্তী, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হায়দ্রাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ভাসুকি বেলাভাডি । এদিন অতিথিদেরকে জন সংস্কৃতির পক্ষ থেকে বরণ করে নেওয়ার পর বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী অনিন্দিতা দে'র উদ্বোধনী সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল পর্বের শুভ সূচনা হয় । এরপর বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবসকে মাথায় রেখে প্রতিবন্ধী দিবস উদযাপন করা হয় নাটকের মধ্যে দিয়ে । মঞ্চস্থ হয় নাটক WASTELAND - A JOURNEY, ইংল্যান্ড এর কবি টি.এস ইলিয়ট এর কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মহাভারত, রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীনকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করা হয়েছে এই নাটকে । নাটকটির যৌথ প্রযোজনায় ব্রিটিশ কাউন্সিল ইন্ডিয়া ও জন সংস্কৃতি । বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা আছে এমন শিল্পীদের নিয়ে নাটক পরিচালনা করেছেন ড. সঞ্জয় গাঙ্গুলী এবং সহ-পরিচালক হিসেবে ছিলেন জেনি শিলে (গ্রেআই, ইংল্যান্ড), টিম উইলার (ইংল্যান্ড) ও অয়ন জোয়ারদার ।
এর পর ৪ থেকে ৭ ডিসেম্বর প্রতিদিন সকাল থেকে চলে বিদেশি অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে ফোরাম থিয়েটার কর্মশালা । নেতৃত্ব দেন জন সংস্কৃতি ড. সঞ্জয় গাঙ্গুলী, সুজয় গাঙ্গুলী ও সত্য রঞ্জন পাল । প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় । মঞ্চস্থ হয় আসাম সূত্রধর প্রযোজিত নাটক NIRVANA - The Mukti এবং জন সংস্কৃতি প্রযোজিত 'সোনার মেয়ে', ও 'আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে' ।
এরপর ৮ ডিসেম্বর কলকাতার ICCR মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় 'WASTELAND - A JOURNEY' এবং ওড়িশার গুটিপোয়া নৃত্য । এদিন এই মঞ্চ থেকে অগোস্ত বোয়াল স্মারক সম্মান ২০২২ জ্ঞাপন করা হয় নাট্য ব্যক্তিত্ব শ্রী শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়কে ও অমূল্য গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মান ২০২২ জ্ঞাপন করা হয় নাট্য গবেষক শ্রী অংশুমান ভৌমিককে । এদিন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ড. দেবাঞ্জন চক্রবর্তী ও ICCR এর জোনাল ডিরেক্টর শ্রীমতি মিনাক্ষী মিশ্র ।
গত ১০ ডিসেম্বর শুরু হয় এই নাট্যমেলার গ্রামীণ পর্যায়ের পর্ব । প্রথম দিন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার কুলপি ব্লকের বসর গ্রামে আয়োজিত হয় 'মুক্তধারা ৯' । বিভিন্ন সংস্কৃতিক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান, যোগব্যায়াম, পুরুলিয়ার ছৌ নাচ সহ জন সংস্কৃতি প্রযোজিত নাটক 'বিন্দিয়া', মধ্যপ্রদেশের মুশকান প্রযোজিত নাটক 'অনুভব' ও বিদেশিদের তৈরী ফোরাম নাটক মঞ্চস্থ হয় ।
১১ ডিসেম্বর সুন্দরবন এলাকার দীগম্বরপুর গ্রামে এই অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত পাওনা ছিল, গ্রামের মানুষের কাছে WASTELAND : A JOURNEY নাটকটির তৃতীয় শো এবং মছলন্দপুর ইমন মাইম সেন্টার প্রযোজিত ও ধীরাজ হাওলাদার নির্দেশিত তিনটি বিশেষ মূকাভিনয় প্রযোজনা ।
১২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় পর্বে সুন্দরবন অঞ্চলের শ্রীনারায়নপুর গ্রামে এই অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত পাওনা মহিলাদের কাছি-টানা খেলা ও বর্ধমানের 'রায়বেশে' । মঞ্চস্থ হয় জন সংস্কৃতি প্রযোজিত চাষিদের সমস্যা নিয়ে ফোরাম নাটক 'উন্নয়নী কথা' ও বিদেশিদের তৈরী ফোরাম নাটক ।
১৩ ডিসেম্বর তৃতীয় পর্বে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার কুলপি ব্লকের করঞ্জলীতে অনুষ্ঠিত হয় এই মেলা, এই মঞ্চে অতিরিক্ত পাওনা পুরুলিয়ার নাটুয়া নৃত্য সহ কালিনগর ঐকতান প্রযোজিত নাটক 'সে ও বিকর্ণ' এবং বিদেশিদের তৈরী ফোরাম নাটক । এদিন দুপুরে প্রায় ৩০০০ নাট্য শিল্পী সহ ১১ টি দেশের প্রতিনিধিরা 'প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য হাঁটুন' এই বার্তা নিয়ে প্রায় ৫ কিঃমিঃ মিছিল করে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গনে পৌঁছান ।
এবং শেষ দিন অর্থাৎ গত ১৪ ডিসেম্বর দুপুরে রামগঙ্গা অঞ্চলে মঞ্চস্থ হয় লেজিসলেটিভ থিয়েটার 'গাঁ হাঁটছে শহরে' এবং সন্ধ্যায় দক্ষিণ গোবিন্দপুর তিন এর ঘেরী অঞ্চলে মঞ্চস্থ হয় পাটনা সহযোগী প্রযোজনা 'তানা-বানা' ও বিদেশিদের তৈরী ফোরাম নাটক ।
বিদেশি এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার কয়েক হাজার গ্রামবাসীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ এই নাট্য মেলাটি আবার ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আয়োজিত হবে । জন সংস্কৃতির পক্ষ থেকে জানা যায়, এই উৎসবের জন্য কোন রকম সরকারি বা বেসরকারি ফান্ডিং নেই । শুধুমাত্র বিদেশি দর্শকদের থেকে প্রাপ্ত ফি থেকেই এত বড় নাট্য মেলা আয়োজিত হয় ।


















0 Comments