মহলা থেকে মঞ্চে | পর্ব - ৪৩ | রঙ্গশীর্ষ প্রযোজিত "অন্য শকুন্তলা" - NEWS THEATRE FORUM

 


বিজয়কুমার দাস

কলকাতায় সিঁথি, বরানগর এর ৫৫৮ নেতাজী কলোনী হল কোলকাতা রঙ্গশীর্ষ দলের ঠিকানা । ২০১৭ সালে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছে । নিবন্ধীকরণ ২০১৯ সালে । প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কোলকাতা রঙ্গশীর্ষ নিয়মিত নাট্যচর্চায় নিয়োজিত আছে । এই দলের দুই কর্ণধার মনোজিৎ মিত্র এবং পৃথা ভট্টাচার্য ২০১৭ অবধি অন্য একটি দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । পরে সেই দল ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মত করে থিয়েটার চর্চার কারণে প্রতিষ্ঠা করেন কোলকাতা রঙ্গশীর্ষ নামে নাট্যদল । সেই সময়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন পূজা মুখার্জী, প্রীতি চৌধুরী, শুভজিৎ চৌধুরী, অর্পিতা সরকার, সৌরভ আচার্য, গ্রন্থনা রায়, শ্রীধাত্রী সরকার (নিনি), চিরঞ্জিৎ বারুই, ইশান কর্মকার প্রমুখ নাট্যপ্রেমীরা । তারপর শুরু হয়েছিল জোরকদম নাট্যচর্চা । বেশ কয়েকটা উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মাধ্যমে কোলকাতা রঙ্গশীর্ষ নাট্য অঙ্গনে নিজেদের পরিচিত করে তুলেছে । উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলি হল ঃ উৎসর্জন, দ্বেশলাই, অগ্নিকণ, আহূতি, ছত্রান্বেশী, অন্য শকুন্তলা, ঘ্রাণ, নৈনং দহতি পাবক, ভাসান, বোহেমিয়া, ত্রসানু, ত্রমিস্র - নুর । 

"অন্য শকুন্তলা" নাটকটি   দলের একটি সুপরিচিত প্রযোজনা হিসাবে বিভিন্ন মঞ্চে পরিবেশিত হয়ে নাট্যজন এবং দর্শকদের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছে । দলের পক্ষে পৃথা ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, কালিদাস ও সেলিম আল দীন এর রচনা এই নাটকের উৎস।নাটকটির রচনা ও সামগ্রিক নির্মাণের দায়িত্ব পালন করেছেন মনোজিৎ মিত্র । ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর দমদমের থিয়েএপেক্সে নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয়েছিল । ২০২২ এর নভেম্বর পর্যন্ত দু বছরে ৪১ বার মঞ্চস্থ হয়ে গেছে । আগামীতে আরো শো আছে এই নাটকের । 


নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই প্রাধান্য পেয়েছে শকুন্তলা । এই নাটকের শকুন্তলা নিজের ভালবাসার মানুষের থেকে অপমানিত হয়ে এক গভীর অসুখে আক্রান্ত ।  সেই রোগের সূত্র লুকিয়ে আছে অবশ্যই তার জন্ম রহস্যের মধ্যে। সত্যিটা জানতে পারার পর অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগতে থাকে শকুন্তলা । মানব সমাজের প্রতি তার ঘৃণা বাড়ে । তার ইচ্ছা, জন্মদাত্রী মা মেনকা যেন নিজে এসে দিব্য রথে চাপিয়ে স্বর্গে নিয়ে যায় । অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগতে থাকা শকুন্তলার মানসিক দোলাচলের অন্তিম পরিণতি নিয়ে এক আশ্চর্য অধ্যায়ের নাটক এই "অন্য শকুন্তলা" র বিষয়বস্তু । নাটকের নির্দেশক মনোজিৎ মিত্র জানিয়েছেন, মহাকবি কালিদাস এবং এই সময়ের বিশিষ্ট নাট্যকার সেলিম আল দীন এই দুই মহান স্রষ্টার সৃষ্ট রচনা থেকে পরিমার্জন করে এই সময়ের নিরিখে চিরাচরিত শকুন্তলার গল্প থেকে বেরিয়ে এক অন্য শকুন্তলাকে উপস্থাপন করাই এ নাটকের প্রধান উদ্দেশ্য । কারণ আজকের সমাজে প্রতিটা মানুষই অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে । মানুষের সঙ্গে মানুষের বিশ্বাস, ভালবাসার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে । এইসব ভাবনার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে এই নাটকে । 

নাটকটি মূলত পৃথা ভট্টাচার্যর একক অভিনয় । তবে পার্শ্বচরিত্রে প্রীতি চৌধুরী, চিরঞ্জিৎ বড়াই, সৌরভ আচার্য আছেন । তার মধ্যে ২ টি স্ত্রী চরিত্র । মূলত নাটকটি একটি "স্পেস ওরিয়েন্টেড অন্তরঙ্গ নাটক" - মঞ্চের পাশাপাশি নাটকের বিভিন্ন মুক্ত অঙ্গনেও নাটকটি পরিবেশন করে কোলকাতা রঙ্গশীর্ষ । থিয়েএপেক্স ছাড়াও তৃপ্তি মিত্র নাট্যগৃহ, অশোকনগরের অমল আলো, বিচিত্রা, বোলপুরের নিভৃত পূর্ণিমা, প্রসেনিয়াম আর্ট সেন্টার, বাদু ইত্যাদি স্থানেও পরিবেশিত হয়েছে । অনেক বাড়ির ছাদে, উঠোনে, বাগানেও অভিনীত হয়েছে এই প্রযোজনা । পৃথা ভট্টাচার্য অভিনয় করেছেন শকুন্তলা চরিত্রে । ঈশ্বর চরিত্রে প্রীতি চৌধুরী এবং শয়তান চরিত্রে চিরঞ্জিৎ বারুই অভিনয় করেছেন ।


পৃথা নিজে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগের স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ ছাত্রী । থিয়েটার তার জীবনে ভালবাসার অনিবার্য মাধ্যম । তাই এই সময়োপযোগী নাটক কোলকাতা রঙ্গশীর্ষ উপস্থাপন করতে চায় এই সময়ের দর্শকের কাছে । সেই ইচ্ছাকে সামনে রেখে "অন্য শকুন্তলা" র গল্প নিয়ে পৌঁছতে চায় আরো বেশি দর্শকের কাছে । সেই প্রত্যাশা নিয়েই এগোচ্ছে "অন্য শকুন্তলা" নাটক ।

Post a Comment

0 Comments