মহলা থেকে মঞ্চে || পর্ব - ৪১ || নিউ ব্যারাকপুর দৃশ্যান্তন প্রযোজিত "ভোমর"

 


বিজয়কুমার দাস

বাংলা থিয়েটারের মঞ্চে যে নতুন প্রজন্ম থিয়েটার নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, শৌভিক ঘোষ তাদের অন্যতম । নিজের নাট্যদল তৈরি করে সেখানে নিজের লেখা নাটকের নির্দেশনা এবং অভিনয়ের ভার কাঁধে নিয়ে অন্যান্য দলেও অভিনয় করে চলেছে শৌভিক ।

এই শৌভিক ঘোষের নিজের নাট্যদল উত্তর ২৪ পরগণার নিউ ব্যারাকপুর দৃশ্যান্তন ।

শৌভিক জানিয়েছে, নতুন কিছু একটা করার তাগিদ থেকেই চার বন্ধু (শৌভিক ঘোষ, পূজা দাস, প্রবাল ভট্টাচার্য, শুভাশিস দাস) মিলে গড়েছিল এই নাটকের দল।সদ্য স্নাতক হওয়া চার বন্ধুর মাথায় তখন নানারকম গল্পের প্লট, অভিনয় করার তুমুল ইচ্ছা আর থিয়েটার নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের পোকা । এসব থেকেই তারা গড়ে তুলেছিল নাটকের দল ।

সদ্য গড়ে ওঠা এই নাট্যদলে নিবন্ধীকরণের কাগজপত্র জমা পড়েছে । আসলে কোভিড বিপর্যয়ে এ নিয়ে থমকে দাঁড়াতেই হয়েছিল ।


বর্তমানে শৌভিকই এই দলের নির্দেশক, যদিও আগামীতে অন্যান্য সদস্য সদস্যাদেরও এ দায়িত্ব দেওয়া হবে - এমনই তার ইচ্ছা।শৌভিকের নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথের " পাদুকা বিভ্রাট" নাটকটি দলের প্রথম প্রযোজনা। অন্যদিকে দলের প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রযোজনা হল, জিহাদ।এছাড়া ভোমর, জনিতৃ সহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা আছে।ভোমর,জনিতৃ নাটকদুটি আন্তর্জাতিক নাট্যমেলায় আমন্ত্রিত এবং প্রশংসিত হয়েছে।ভোমর নাটকটি সর্বাধিক অভিনীত নাটক।

২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর অশোকনগর অন্তহীন কলাক্ষেত্র মঞ্চে নাটকটি প্রথম অভিনয়েই দর্শকের মন জয় করে নিয়েছিল।দলেরই ৯ জন সদস্য সদস্যা এই নাটকে অভিনয় করেছে।নাটকের বিষয়বস্তুতে প্রাধান্য পেয়েছে সভ্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ডোম সম্প্রদায়ের জীবন সংগ্রামের কাহিনী। এই ব্রাত্য সমাজের লড়াই একদিকে ক্ষুধার বিরুদ্ধে অন্যদিকে সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে।কিন্তু নাটকের শেষে মানুষে মানুষে প্রেমের মন্ত্রই উচ্চারিত হয়েছে। দুই ডোম হারু আর বদনের গল্প ভোমর। প্রায় ২০ বছর একসঙ্গে থাকার সুবাদে গড়ে উঠেছিল নিবিড় সখ্যতা।প্রতিদিন মৃতদেহ সৎকার আর চিতার আগুন জ্বালানো নেভানো তাদের কাজ।সেখান থেকে অর্জিত অর্থেই গরম ভাতের গন্ধ পায় তারা।আবেগ, অনুভূতি সবই পুড়ে গেছে যেন চিতার আগুনেই।তবু আর পাঁচজনের মত তাদের মনেও প্রেম, ভালবাসা, মৈথুনের ইচ্ছা জাগে।  মৈথুনের তাগিদেই শেষ পর্যন্ত একদিন হারু আর বদনের শরীর মিশে যায়। হারুর মৃত্যু হয় সাপের ছোবলে। আর বদনকে বেঁচে থাকতে হয় চিতার আগুন জ্বালানোর অর্জিত অর্থে গরম ভাত ফুটিয়ে খেয়ে। ভালবাসার মানুষের চিতার আগুনেও ভাত ফুটিয়ে নিতে হয় বদনকে। কারণ খিদে তো বাস্তব, আর জীবন যে থেমে থাকে না।

রমেশচন্দ্র সেনের "ডোমের চিতা" গল্প অবলম্বনে এই নাটক লিখেছে শৌভিক ঘোষ। নির্দেশনাও তারই।অভিনেত্রী লোপামুদ্রা গুহনিয়োগীর কাছ থেকে শৌভিক এই গল্প নিয়ে কাজ করার পরামর্শ পেয়েছিল বলে জানা গেল।

৬ টি চরিত্রের ৩ টি নারী চরিত্র এবং ৩ টি পুরুষ চরিত্র। আলো আবহ ইত্যাদির দায়িত্ব সামলেছে দলের ছেলেমেয়েরাই।

দমদম শব্দমুগ্ধের আমন্ত্রণে এন্ড্রুজিনি ফেস্টিভেল সহ অশোকনগর নাট্যমুখ এর আমন্ত্রণে অমল আলোয় এবং রূপচক্র, নাট্য সমন্বয়, রাজডাঙ্গা দ্যোতকের  থিয়েটার ফেস্টিভ্যালে অভিনীত হয়ে প্রশংসিত হয়েছে এ নাটক। আনুমানিক ৩০ হাজার টাকা ব্যয় এ নাটকের প্রযোজনায়।এটি দলের চতুর্থ প্রযোজনা।নিজেদের কোন মঞ্চ বা মহলাকক্ষ নেই নিউ ব্যারাকপুরের দৃশ্যান্তন দলের। তবু "ভোমর" সহ অন্যান্য নাটকের সফল প্রযোজনা তারুণ্যে ভরপুর এই দলের কাছে এক একটা লড়াই এর মত। আর সেই লড়াইএ সাহস জুগিয়েছে " ভোমর" নাটকের জন্য পাওয়া অজস্র দর্শকের প্রশংসা। রমেশচন্দ্র সেনের গল্প নিয়ে থিয়েটারে কাজ করার সাহস দেখাতে পেরে খুশি নিউ ব্যারাকপুর দৃশ্যান্তন।নাটকের আলো, আবহ,মঞ্চ ও আলোক প্রক্ষেপণের দায়িত্ব সামলেছেন সুব্রত সরকার,অনিরুদ্ধ লোধ, সন্দীপ ঘোষ এবং অর্পণ রাহা।

Post a Comment

0 Comments