নাটকের Review || নাটক : আষাঢ়ের একদিন || দেখে এলেন অনুপম দত্ত - NEWS THEATRE FORUM


 নাটক : আষাঢ়ের একদিন

রচনা : মোহন রাকেশ

বাংলা রূপান্তর : শঙ্কর বসু ঠাকুর

নির্দেশনা : রামকৃষ্ণ মন্ডল

প্রযোজনা : যুগের যাত্রী, চন্দননগর


সমালোচক : অনুপম দত্ত

আষাঢ় প্রেমের বার্তা নিয়ে আসে, আষাঢ় হল মিলনের মাস । আষাঢ় শুষ্ক জমিকে সিক্ত করে । আষাঢ় বন্ধ্যা'কে উর্বর করে ।  সেই প্রেমের বোধন দিয়েই শুরু হয় আষাঢ়ের প্রথম দিন । সম্প্রতি যুগের যাত্রী, চন্দননগর মঞ্চস্থ করল তাদের নতুন নাট্য "আষাঢ়ের এক দিন'' । মোহন রাকেশ রচিত হিন্দি নাটক "আষাঢ় কা এক দিন" যার বাংলা রূপান্তর করেছেন নাটককার শ্রী শঙ্কর বসু ঠাকুর । মোহন রাকেশ এর বিখ্যাত হিন্দি নাটক "আষাঢ় কা এক দিন"কে প্রথম আধুনিক হিন্দি নাটক হিসেবে গন্য করা হয় । নাটকটি সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার পায় এবং বহু স্বনামধন্য নির্দেশকরা গত ষাট বছর ধরে এই নাটকের বহু শো করে আসছেন । সেইরকম একটা ক্লাসিক নাটক নির্বাচন, তার বাংলায় অনুবাদ ও নাট্যে রূপান্তর, অবশ্যই নাটককার ও নির্দেশকের নিজেদের দক্ষতার প্রতি আত্মবিশ্বাসকে প্রকাশ করে ।

নাটক শুরু হয় মল্লিকার সাথে কালিদাসের প্রেমের দৃশ্য দিয়ে । আষাঢ়ের প্রথম দিনে গভীর অরণ্যে মল্লিকা ও কালিদাস বৃষ্টিস্নাত । মল্লিকার সাথে কালিদাসের এই সম্পর্ককে মেনে নিতে পারে না মল্লিকার মা । কারন কালিদাস কবি, ভবঘুরে । পার্থিব সম্পদের নিরিখে কালিদাস অচল । অন্যদিকে বিলোম স্বচ্ছল । বৈষয়িক সুখের মাপকাঠির নিরিখে বিলোম মল্লিকাকে কালিদাসের থেকে অনেক সুখে রাখবে, মল্লিকার মায়ের তাই বিশ্বাস । কিন্তু যুবতী মল্লিকা তো বিষয়ের মাপকাঠিতে নিজের ভালোবাসাকে বিচার করে না । তাই সে প্রতিমুহূর্তেই  মায়ের ইচ্ছা, সমাজের ইচ্ছা সবকিছুকে অস্বীকার করে কালিদাসের দিকে ছুটে যায় । কিন্তু এরপরেই গল্পের পট পরিবর্তন ঘটে । কালিদাসের কবি প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে উজ্জয়নীর রাজা কালিদাসকে তার রাজসভায় আহ্বান করে । কালিদাস প্রথমে অনিচ্ছুক হলেও, শেষে রাজী হয় এবং নিজের গ্রাম ছেড়ে উজ্জ্বয়িনীর উদ্দেশ্যে রওনা দেয় । কালিদাসের মেঘদূত কাব্য এর একটি অংশ থেকে মোহন রাকেশের এই সৃষ্টিতে কালিদাস নায়ক হলেও মল্লিকাই কিন্তু এই নাটকের মূল চরিত্র । কালিদাসের গ্রাম ছাড়ার পর, মল্লিকার মাতৃবিয়োগ,  অসহায় মল্লিকার জীবনে মল্লিকার অনিচ্ছায় বিলোমের প্রবেশ আর আজীবন মল্লিকার সেই অনিচ্ছার যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো - এই নিয়েই নাটক এগিয়ে চলে । আর এইখানেই "আষারের এক দিন" শুধু প্রেমের আখ্যানে আটকে থাকে না, শুধুই নাটকে মল্লিকা নামক একটি কাল্পনিক চরিত্রের জীবনে আটকে থাকে না । পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায়, একজন মহিলা তার দৈনন্দিন জীবনে কিভাবে নিপীড়িত হয় । কিভাবে তার ইচ্ছা, তার সাধ, স্বপ্ন প্রতিমুহূর্তে দলিত হয় সেই ভাষ্যই ফুটে ওঠে আষারের একদিনে ।

মূল নাটকটির বাংলা রূপান্তরে নাটককার শঙ্কর বসু ঠাকুর মূল নাটকের যে সুর, সেই সুরটিকে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন ।  নাটকের শেষে কালিদাস যখন মল্লিকার কাছে ফিরে আসে, মল্লিকার কোলে তখন মল্লিকা-বিলোমের কন্যা সন্তান । ব্যর্থ মনোরথ কালিদাস যখন ফিরে যায়, তখন কোন এক আষাঢ়ের দিন অঝোরে বর্ষণ । মল্লিকার প্রাঙ্গনে পড়ে আছে কালিদাসের উত্তরীয় আর সেই বর্ষণে বিলোম তার উত্তরীয় দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে তার স্ত্রী ও কন্যাকে । সামাজিক নিয়মে এটাই সত্য । কিন্তু মল্লিকার হৃদয়ের উথালিপাথালি, তার বাধ ভাঙা অশ্রু যা আষাঢ়ের বারিধারায় মিশে গিয়ে অদৃশ্য, অস্পষ্ট, তার অব্যক্ত যন্ত্রণা ! - এই সত্য কি অস্বীকার করা যায় !


আষাঢ় কি শুধুই প্রেম উদযাপনের মাস, নাকি আষাঢ় নিভৃতে প্রেম বহনের মাস ! মল্লিকার জীবনে যেভাবে আষাঢ় এর একদিন প্রেমের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি সেই আষাঢ় এর বাদল আবৃত কালো আকাশ মল্লিকার কষ্ট বহন করে চলে । অসহায়তার উপর বিলোমের ক্ষমতা, ক্ষমতার বৃত্তে কালিদাসের  জীর্ণতাকে ছাপিয়ে মল্লিকার প্রেমের আখ্যানই হল "আষাঢ়ের এক দিন"। পরিচালক রামকৃষ্ণ মন্ডল খুব নিখুত ভাবে ধৈর্য ধরে নাট্যের প্রতিটা মুহুর্তকে এঁকেছেন ।  এই সমাজের পাণ্ডুর অবস্থা যে ভাবে টেক্সট এর মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে তা নাট্যে ফুটিয়ে তোলার জন্য নাটকের সেটের রঙ ভীষন ভাবে প্রশংসনীয় । ঠিক তেমনি ভাবে প্রশংসনীয় মঞ্চসজ্জায় ব্যবহৃত উপকরণ ।  মঞ্চসজ্জার জন্য রবীন্দ্রনাথ দাস কে কুর্নিশ । মঞ্চসজ্জা, পোশাক নির্বাচন সমস্ত কিছুই সময়কে খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছে ।  বেশীরভাগ কুশীলবদের পরিমিত অভিনয়, আলোক ভাবনা, নাটকটিকে বিশেষ মাত্রায় নিয়ে গেছে । লাইট স্কিমিং ও প্রক্ষেপনে আলোক শিল্পী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এর কাজ প্রশংসার দাবী রাখে । আবহ প্রক্ষেপণ ভালো । তবে প্রায় পুরো নাটকটি জুড়েই আবহ ব্যবহার কিছুটা অতিরিক্ত মনে হয়েছে । সামগ্রিক ভাবে 'যুগের যাত্রী' চন্দননগরের "আষাঢ়ের একদিন" মন ছুয়ে যায় এবং তার জন্য অবশ্যই নাটকটির বাংলায় রূপান্তরকারী শ্রী শঙ্কর বসু ঠাকুরের টেক্সট, পরিচালক রামকৃষ্ণ মন্ডলের পরিচালনা এবং সমগ্র টীমের একাগ্র অনুশীলনের নৈপূন্যের প্রশংসা করতেই হয় ।



Post a Comment

0 Comments