অভিনেতা সুদীপ ধাড়া'র সাথে একান্ত আলোচনায় নিকিতা সাহা - NEWS THEATRE FORUM

 


চার বছর বয়সে থিয়েটারের মঞ্চে শুরু হয়েছিল অভিনয় জীবনের যাত্রা । 'বিডন স্ট্রিট শুভম' নাট্যদলের হয়ে শুধু মাত্র অভিনয় নয় একটি থিয়েটার প্রযোজনার নেপথ্যে যা যা কাজ থাকে, তার সবটাই নিপুণভাবে শেখা এবং দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করার চর্চাও করে থাকেন অভিনেতা সুদীপ ধাড়া । থিয়েটারের হাত ধরেই সিনেমা জগতে প্রবেশ । শুরুর দিকে খুব একটা পরিচিতি না পেলেও, সাম্প্রতিক আলোচিত ওয়েব সিরিজ 'মন্দার' এর এক বিশেষ চরিত্রে তাকে অভিনয় করতে দেখে বাংলার দর্শকরা তাঁর উচ্ছসিত প্রশংসা করেন । বয়স অল্প এখনো, দীর্ঘ পথ চলা বাকি, তারই ফাঁকে একান্ত আলাপচারিতায় থিয়েটার ফোরামের সদস্যা নিকিতা সাহার সঙ্গে অভিনেতা...

• আপনার থিয়েটারে যুক্ত হওয়া কবে থেকে এবং কিভাবে ? 

আমার দলের নাম বিডনস্ট্রীট শুভম । উত্তর কলকাতার ছোটদের নাট্যদল, সেখানে  সম্পাদক আশিষ কুমার খাঁ প্রথম আমায় চার বছর বয়সে হাত ধরে থিয়েটারে নিয়ে যান এবং সেখান থেকেই সূত্রপাত আমার অভিনয় জগতের ।

• চার বছর বয়সে মঞ্চে 'ক্ষীরের পুতুল' নাটক দিয়ে কাজ শুরু আপনার, তারপর বিভিন্ন মঞ্চ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মিডিয়াতে আসা । এর পেছনে থিয়েটার এর অবদানকে কী ভাবে দেখছেন আপনি ?

এই বিষয়টা ভীষণ গভীর । আমি যদি থিয়েটার না করতাম তবে আমার কোনদিনই ক্যামেরার সামনে আসা হতো না । এছাড়া থিয়েটার এর একটা নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে নিজেকে নিয়ে যাওয়ার এই বিষয়গুলো একটা অভিনেতাকে অনেক ধাপ এগিয়ে রাখে । আমি যদি এই বিষয়গুলো সমন্ধে অবগত না হতাম, তাহলে হয়তো কোথাও গিয়ে আমার ক্যামেরার সামনে অভিনয় করতে অসুবিধা হতো । থিয়েটার আমাকে ক্যামেরার সামনে সেই জায়গাটা খুলে দিয়েছে । সুতরাং আজ আমি যা কিছু অভিনয় করি তার পেছনে থিয়েটার এর অবদান বিরাট ।

• থিয়েটার করতে আসার পর থেকে পড়াশোনায় কতটা ব্যাঘাত ঘটেছে ? অভিভাবকদের কী মতামত ছিলো ?

পড়াশোনায় ব্যাঘাত একেবারেই ঘটেনি, কারণ আমি ফাঁকিবাজ একটি ছাত্র(হাসি), পড়াশোনা না করলে হয়তো বেঁচে যেতাম । আর অভিভবকদের মতামত বলতে তারা খুব সাপোর্টিভ, সবসময় বলেছে আগে পড়াশোনা তারপর যা ইচ্ছে করো । তাই আমি খুব মন দিয়েই থিয়েটারটা করতে পেরেছি, করছি ।

• অনেকে বলেন নাটকে যাপন করতে হয় । আপনি কী বলতে চান ?

থিয়েটার একটা বিরাট পরিবারের মত, আমার দল আমার কাছে পরিবার । সুতরাং যাপন তো অবশ্যই করতে হয় । শুধু মঞ্চে অভিনয় করলাম আর সেট, আলো, মিউজিক সেগুলোর কাজ বুঝলাম না, তাহলে তো কোথাও গিয়ে আমার অভিনেতা হওয়া পূর্ণতা পায় না । সুতরাং পূর্ণ অভিনেতা হয়ে উঠতে গেলে এই যাপন'টা প্রত্যেক অভিনেতার প্রয়োজন । আমি মনে করি এই যাপন যদি কারোর অসম্পূর্ণ থাকে তাহলে সে অভিনেতা হিসেবে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে ।


বিডন স্ট্রীট শুভম নাট্য পরিবার (কালো টি-শার্ট পরে দলের কর্নধার আশিষ কুমার খাঁ)

• বর্তমানে ভীষণ জনপ্রিয় হওয়া এক ওয়েব সিরিজ 'মন্দার' -এর পেঁদো চরিত্র আপনি, সুযোগ পেলে এটা বাদে আর কোন চরিত্রটি আপনি করতে পছন্দ করতেন ?

মন্দার ওয়েব সিরিজ এ শুধু পেঁদো নয়, যে কোনো চরিত্র দিলে আমি সেই চরিত্রটাই করতাম । আমার কাছে ১ঘণ্টা বা ২ মিনিট এর চরিত্র ম্যাটার করে না, আমি যেনো মন দিয়ে কাজ করতে পারি । তাই অন্য যে কোনো চরিত্র পেলেই আমি হাসি মুখে গ্রহণ করতাম এবং চেষ্টা করতাম প্রচন্ড সততার সাথে মন দিয়ে কাজটা করার ।

• অনির্বাণ ভট্টাচার্যর পরিচালনায় কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন  ?

অনির্বাণ দার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা চমৎকার । তিনি যে অসামান্য একজন মানুষ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । পেদো  চরিত্র ক্যামেরার সামনে তুলে ধরার জন্য সেই সাপোর্ট কতটা ছিল তা বলে বোঝাতে পারবোনা । এছাড়া আমার পুরো টিম একটা পরিবারের মত কাজ করেছিলাম । আমি ভিষন এনজয় করেছি অনির্বাণ দার সাথে কাজ করে ।


'মন্দার' ওয়েব সিরিজের শুটিং এর সময় শট বোঝাচ্ছেন পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য

• কোন চলচ্চিত্র দিয়ে দর্শক আপনাকে সবচেয়ে বেশি চিনেছে বলে আপনার মনে হয় ?

দর্শক আমাকে চিনেছে 'মন্দার' থেকে । যদিও মন্দার এর আগে 'মন্টু পাইলট সিজন ১' -এ কাজ করেছিলাম তবে পরিচিতি হয়েছে মন্দার থেকেই । এছাড়াও 'মন্টু পাইলট সিজন ২', 'সুন্দরবনে বিদ্যাসাগর' এখান থেকেও  দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছি ।

• বেছে বেছে চরিত্র করেন, নাকি সুযোগ পেলে যেকোনো চরিত্রেই আপনি স্বচ্ছন্দ ?

আমি একেবারেই এর পক্ষপাতিত্ব নই, সমস্ত চরিত্রই আমার কাছে সমান । আমি যে চরিত্র পাই সেটাই মন এবং সততা দিয়ে করার চেষ্টা করি সেটা থিয়েটার হোক বা ক্যামেরার সামনে ।

• পেঁদো চরিত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে দর্শক আপনাকে দেখেছে, মানুষের মনে এই চরিত্রটি কতটা দাগ কেঁটেছে বলে আপনার মনে হয় ?

এটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল । কারণ দর্শক কিভাবে চরিত্রটিকে গ্রহণ করছে সেটা একেবারেই দর্শকের মনের বিষয় ।

• নিজেকে সুদীপ থেকে পেঁদো হিসেবে কী ভাবে গড়ে তুললেন ?

নিজেকে পেঁদো হিসেবে গড়ে তোলা খুব সহজ ও ছিল না, আবার খুব কঠিন'ও ছিল না । সহজ ছিলনা তার কারণ এটা একেবারেই ভিন্ন ধরনের চরিত্র । ম্যাকবেথ -এ আমরা জানি তিনটে উইচ আছে, যেগুলো একেবারেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মানুষের থেকে আলাদা, তো সেই বিষয়টা আমাকে তুলে ধরতে হবে ক্যামেরার সামনে, একটা মানুষ হয়ে আবার  সে সম্পূর্ণ মানুষও নয়, সুতরাং চরিত্রের এই যে খেলাটা, মানে আমি যখন চরিত্রটা পাই, মনে হয়েছিল কিভাবে করবো ? এবং প্রচন্ড চিন্তিত ছিলাম এই ভেবে যে দর্শকের সামনে কিভাবে তুলে ধরবো । কারণ এ ধরনের চরিত্র আমি আগে কখনো করিনি । এবার সহজ হয়ে উঠলো কিভাবে সেটা বলি, অনির্বাণ দা যেভাবে পুরো ছবিটা ভেবেছে সেই ভাবাটা স্ক্রিপ্ট রিডিং এর সময় আমাদের সামনে তুলে ধরেছিল । এবং তারপর আমি সবার সাথে আলোচনা করে বুঝতে পারি আমাকে কী কী করতে হবে, কী কী শিখতে হবে । আর আমার কো-অ্যাক্টর সহ সকলকে যদি পাশে না পেতাম এবং অনির্বাণ দা যদি তার দেখা ছবিগুলো আমার চোখের সামনে না তুলে ধরতো তাহলে আমার পক্ষে এই চরিত্র গড়ে তোলা খুব কঠিন হয়ে পড়ত । কিন্তু তার সাথে আলোচনা করে সে কী চাইছে, কী ভাবছে, অনেক আলোচনা চর্চার মধ্যে দিয়ে এই চরিত্রটি গড়ে তুলেছি ।

সহ-অভিনেতা সজল মন্ডলের সাথে 'পেঁদো'

• নিয়মিত নাট্যচর্চা করেন, N.S.D -তে নাটক নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছে হয়েছে কখনো ?

গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার পরেই ইচ্ছে হয় N.S.D তে যোগদান করার, আমি পরীক্ষা দিয়েছিলাম কিন্তু সুযোগ পাইনি । তবে ভবিষ্যতে আবার প্রস্তুতি নেব ওখানে পড়াশোনা করার জন্য ।

• এই মুহূর্তে কটি নাটকে অভিনয় করছেন ? নাট্যদলে অভিনয় ছাড়া আর কী কী করেন ?

বর্তমানে আমি আমার দলের ৫ টি প্রযোজনায় কাজ করছি । 'শব চরিত্র কাল্পনিক', 'রূপ তেরা মস্তানা', 'হ য ব র ল', 'সামিয়ানা', 'ভাড়াটে চাই' । এই চলতি প্রযোজনার ৫ টিতেই আমি অভিনয় করছি । 

নাট্য দলে অভিনয় ছাড়া আমি গ্রাফিক্স ডিজাইন এর কাজ করি ।

• নাটকে এবং সিনেমায় আপনার সবথেকে প্রিয় একজন করে পরিচালক এর নাম ?

থিয়েটারের নির্দেশক হিসেবে দুজনের নাম বলতে চাই। দুজনেই আমার খুব প্রিয় এবং দুজনেই খুব কাছের । প্রথমেই আমার শিক্ষাগুরু শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায় এবং অনমিত্র খাঁ আমার বন্ধু । মিডিয়া বা সিনেমাতে অবশ্যই দেবালয় ভট্টাচার্য, যার হাত ধরে আমার প্রথম কাজ ক্যামেরার সামনে ।

• বিডনস্ট্রীট শুভম নাট্যদল হিসেবে কেমন ? এই দলের বিশেষ কয়েকটি দিক সম্পর্কে জানতে চাই ?

যেহেতু' বিডনস্ট্রীট শুভম' ছোটদের নাট্যদল, তাই ছোটবেলা থেকে যে শিক্ষা প্রয়োজন হয় থিয়েটার এর সেই শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে এই দলে দেওয়া হয় । এখানে বর্তমানে বহু ছোট ছোট চার পাঁচ বছর বয়সের শিশুরা আছে, আমরা বড়রা যথাসাধ্য চেষ্টার মাধ্যমে ওদেরকে শেখাচ্ছি ।

আর দ্বিতীয়ত, নাট্যদলের বিশেষ কী কী দিক থাকে আমি নিজেও জানিনা ।

• বিভিন্ন নাট্য দলের পরিচালকরা তাদের সদস্যদের সিনেমা বা সিরিয়ালে কাজ করতে দিতে পছন্দ করেন না, আপনার ক্ষেত্রে কখনো এরকম কোন সমস্যা হয়েছে ?

আমাদের দলে এরকম কোনো বিধিনিষেধ নেই । আমি কখনো এই সমস্যার সম্মুখীন হইনি । তবে এটা অবশ্যই বলা হয়  আগে শেখো-বোঝো-জানো তারপর সেই কাজ করো ।


• নাট্যচর্চার পাশাপাশি সিনেমা জগতে নতুন করে এই জনপ্রিয়তা কেমন লাগছে ?

নাট্যদলের পাশাপাশি এই মিডিয়াতে কাজ করার সুবাদে যে পরিচিতি পেয়েছি সেটা খুবই ভালো লাগছে, আমি উপভোগ করছি এটা । 

• বলিউডে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন ?

অবশ্যই স্বপ্ন দেখি ।

• অভিনয় প্রতিভা আরো উন্নত করার ক্ষেত্রে নিজের কাছে কী কী চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন ?

চ্যালেঞ্জ এখনও নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি । কারণ আমি প্রতিনিয়ত চর্চা করছি, নতুন নাটকে কাজ করছি, অভিনয়ের পাশাপাশি মঞ্চের নেপথ্যে কাজ করছি , তবে নতুন চরিত্র পেলে একটা চ্যালেঞ্জ নিতেই হয়, সেটা থিয়েটার হোক বা মিডিয়াতে । সেই চরিত্র টা নিয়ে ভাবি, চর্চা করি, কিভাবে ফুটিয়ে তুলবো বা দর্শকের মনে  কতটা প্রভাব ফেলবে সেটার দিকে নজর দিই ।



• সেলিব্রেটি হবার স্বপ্ন দেখেন ?

আমার কাজ মন দিয়ে, সততা নিয়ে অভিনয় করা । আমার কাজ যেনো দর্শকের ভালো লাগে, তাদের মন ছুয়ে যায়, তারা যেনো আমার পাশে থাকেন, আমাকে ভালোবাসেন । এছাড়া আলাদা ভাবে সেলিব্রেটি হওয়ার স্বপ্ন কী বা কাকে বলে, সেটা আমি ঠিক জানি না ।

Post a Comment

0 Comments