রঞ্জন রায়
বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এক বিশাল সংখ্যার নাট্য দল এই মাইনোরিটি কালচারকে দারুন ভাবে ঋদ্ধ করে চলেছে । হয়তো সব নাট্যের মান রসত্তীর্ন নয় কিন্তু নাটকের জোয়ার এসেছে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে । ৫০-৬০ এর দশকে গ্ৰুপ থিয়েটারে নাট্য চর্চার যে ধারা প্রবাহিত হয়েছিল, সত্তর -এর দশকে রাজনৈতিক বিষয়কে হাতিয়ার করে আরো অসংখ্য নাট্য দলের জন্ম হয় । বামফ্রন্ট আমলে আস্তে আস্তে রাজনৈতিক পরিবেশে কিছু দিনের জন্যে স্থিতধি হলে, নতুন নতুন নাট্য আকর নিয়ে নাটকের মাধ্যমে একটি নিটোল গল্প বলার ইচ্ছা নিয়ে আগের সৃষ্ট নাট্য দল এবং আরো কিছু নতুন দলের ভাঙা গড়ার মধ্যে দিয়ে দলের সংখ্যার উর্দ্ধগতি বজায় ছিলো । কিন্তু মাঝে দর্শক সংখ্যা কমে আসছিলো । নানা টিভি Channel এর নিত্যনতুন আকর্ষণীয় ইভেন্ট এর জন্যে কিছুটা দায়ী ছিলো । পরবর্তী সময় দর্শক আবার নাট্য মঞ্চে ফিরে আসতে শুরু করলে, করোনা মহামারী আবার নাট্য মঞ্চেকে দর্শক বিমুখ করে তোলে । এরই মাঝে জন্ম হয় অসংখ্য নাট্য দলের । নিন্দুকের রটনা, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের অনুদান প্রকল্প, নাট্য মেলা ইত্যাদি এই বিস্ফোরণের জন্যে কিছুটা দায়ী । তবে সবাই যে এটাকেই একমাত্র উদ্দেশ্য করে দলের সৃষ্টি করেছেন এ কথা বলা যায় নায়। আর ঠিক এই পরিপেক্ষিতে বর্তমান নাট্য সমালোচকের এই নিবন্ধ ।
এই দিন যে দুটি ছোট নাটক মঞ্চায়িত হলো তার প্রথমটি মুন্সী প্রেমচাঁদ এর কাহিনী অবলম্বনে "সংসার" আর দ্বিতীয়টি বিমল করের গল্প অবলম্বনে "সুখ", নাট্যরূপ এবং নির্দেশনায় সুদীপ সিংহ ।
সংসার নাটকটিকে নাটক না বলে নাটিকা বলা যেতে পারে । ৩০ মিনিটের একটি চিমছাম নাট্য প্রযোজনা । নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন ছিলো এ দিন । নাটকের আখ্যানটি উহ্য রাখছি । মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বামী, স্ত্রীর সুখ দুঃখের গল্প, তার সাথে এক রেস্টুরেন্টের মজাদার ওয়েটার এর নানা হাস্য রসের উপস্থাপনা । বর্তমানে ভগবাদ সর্বস্য জীবনের সফল উপভোক্তকে, উদাহরণ হিসাবে হাজির করে নিজেকে হীনমন্য এবং অসুখী প্রতিপন্ন করার ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতা চলছে এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে । ঝকঝকে বাড়ী, আধুনিক পোষাক, আধুনিক রেস্ট্রুরেরেন্টে ডিনার, ইলেক্ট্রনিক গেজেটের জঞ্জাল ক্রয় তাদের বাসনার অন্যতম । এই পরিধিতেই নাট্যকার আমাদেরকে নিয়ে বিচরণ করেছেন । নাট্য রস সৃষ্টিতে শচীন কর্ত্তার গান ব্যবহার ভালো কিন্তু বারংবার একটু বিরক্তির সঞ্চার ঘটায় । ভালো জিনিষ অল্পই ভালো । নাটকের প্রয়োজনেই কলহের থেকে ভালোবাসা কম । মাঝে মাঝে যদি মেঘের ভিতর দিয়ে মিষ্টি রোদ এসে পরে তবে গল্প আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে । তিন জন অভিনেতা অভিনেত্রীই খুব শক্তিশালী । তবে কেবিন বয় গৌতম চক্রবর্তী আর একটু সংযত হলে ভালো হতো । উনি হাসাতে চাইছেন । অঙ্গভঙ্গি করছেন আমাদের অধিকাংশ সময়ে হাসি পাচ্ছে নাৎ। ক-বাবু অভিজিৎ ঘোষের সংলাপ উচ্চারণে প্রথম দিকে Oil dropped হয়েছে, অনেক শব্দ বোঝা যায়নি । রমা চরিত্রে নবনীতা মুখার্জী দাস বেশ শক্তিশালী অভিনেত্রী । রাগে, আবেগে, ভালোবাসায় এবং কণ্ঠ মাধুর্যে নিজেকে প্রমান করেছেন । আবহ, আলো, রূপসজ্জা, পোষাক যথাযথ । নির্দেশকের থিয়েটার স্পেসের ব্যবহার প্রশংসার দাবী রাখে । প্রথম প্রদর্শনের ত্রুটি কাটিয়ে এ প্রযোজনা দর্শকের মনরঞ্জনে সফল হয়ে উঠবে বলে এই প্রতিবেদকের আশা ।
এদিনের দ্বিতীয় নাটক ছিল 'সুখ' । নাট্যকারের ভাষায় বয়স যখন যৌবন ছেড়ে বার্ধক্যের চৌকাঠ পেরোয়, শরীর যখন আর সারা দেয়না, মেতে উঠতে চায়না শরীরী খেলায়, তখনও বসন্তের বাতাসের মত, ভালোবাসা থেকে যায় । কালের অমোঘ নিয়মে সঙ্গীর চলে যাওয়ার মুহূর্তের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি চলে সারাক্ষন । আর ততই জোরে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে সঙ্গীর হাত । এ ক্ষেত্রেও গল্পটা উহ্য থাক । আগামীর দর্শক মঞ্চে এসে গল্পের উষ্ণ অনুভূতির উত্তাপ অনুভব করুন । অপর দিকে আছে এক তরুণ দম্পতি, যাদের নব উন্মাদিত প্রেম, চিরকালীন দেহজ প্রেম - তার সাবলীল প্রকাশে এক স্নিগদ্ধ মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করে । রবীন্দ্রনাথ এর গানের অন্তরা মনে আসে...
"নিয়ো নিয়ো চিরজীবন পাথেয়, ভরি নিও তরী কল্যানে । সুখে দুঃখে শোকে, আঁধারে আলোকে যেও অমৃতের সন্ধানে...…..তোমাদের প্রেম দিও দেশে দেশে, বিশ্বের মাঝে বিস্তারি"
- দর্শকের মধ্যেও বিস্তারিত হয় সেই প্রেমমুগ্ধ দৃশ্যবলি । আছে খুনসুটি, ছেলেমানুষি, অভিমান । দুই অভিনেতা অভিনেত্রী চুটিয়ে অভিনয় করে মাতিয়ে রাখে দর্শককে । মনে হয় কোনো ছিদ্রপথ দিয়ে আমাদের দৃষ্টি পৌঁছে গেছে নব দম্পতির নিরিবিলি আবাসে । রিয়ালিস্টিক অভিনয়ের পাঠ দিয়েছিলেন যেন নতুন নাট্য কর্মীদের । পিছনে সদা জাগ্রত নির্দেশকের ভূমিকাও অজান্তে ধরা পড়ছিল । এখানেই তাঁর সাফল্য । আর এক অসাধারণ চরিত্র নির্মাণ করেছেন কেয়ার-টেকার মদনলাল । কী নীরব অথচ রঙময় তার উপস্থিতি । তবে একটু উপেক্ষিত । শেষে লুকোচুরি ছবির কিশোর কণ্ঠের গান "এইতো হেতায় কুঞ্জছায়ায়" গানে গলা মেলানো উপরই পাওনা । যে ভাবে বেশ রহস্য জনক ভাবে হ্যারিকেন নিয়ে দেহাতী মদনলালের মঞ্চে প্রবেশ এবং রহস্যময় উপস্থিতি, সেখানে চরিত্রটা কে নিয়ে আরো ভাবার অবকাশ আছেৎ। আর দুই অবিশিষ্ট চরিত্র পৌড় ও পৌড়া বরদা ও সুবর্ণ যাঁদের কথা লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম, এক কথায় অসামান্য । তাঁদের সংযত বাচিক এবং শরীরী অভিনয় কে এই নাটকের রূপসজ্জা শিল্পী সুরজিৎ পাল অপূর্ব দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন । আর অভিনয় তো এতটাই রিয়ালিলিস্টিক দর্শক আকণ্ঠ পান করেছে । নির্দেশকের ডিটেলিংসর কাজ খুব নিখুঁত । আবহ (সুদীপ সিংহ) আলো (সৌমেন চক্রবর্তী) -এ নাটকের সম্পদ । চিরাচরিত নাটকের শিফটিং কে পরিচালক অন্য মাত্রা দিয়েছেন । তবে এ ক্ষেত্রেও ভালোর বেশি প্রয়োগ নাটকটির গতির ব্যাঘাত ঘটিয়েছে । শিফটিং আরো কমাতে পারেন কিনা নির্দেশক ভাবুন । অভিনয় প্রসঙ্গে বলি সমবেত অভিনয় এবং নেপথ্য শিল্পীর আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে একটি মঞ্চ সফল নাট্য । এ ক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন, তাই এই রকম একটি নিখুঁত প্রযোজনা আমাদের উপহার দিলেন । বরদা, সুবর্ণ, শুভেন, মীনা, মদনলাল চরিত্রে সুমন্ত রায়, দোলনচাঁপা সিংহ, শুভম সাহা, নিবেদিতা ভট্টাচার্য ও অভিজিৎ ঘোষ নিজেদের ছাপিয়ে গেছেন । এ বলে আমায় দেখ, সে বলে আমায় । একটি নাট্য দলে এতগুলি নাট্যশিল্পে শিক্ষিত অভিনেতা অভিনেত্রী পাওয়া দুস্কর । আলাদা করে দুই মহিলা শিল্পীর কথা বলবো । নিবেদিতা, এতটাই মিষ্টি তার উপস্থিতি, রাগ, অনুরাগ, কান্নার অনুভূতি গায়ে কাঁটা দেয়, এক সম্পূর্ণ রসত্তীর্ন চরিত্রের সৃষ্টি । যে কোনো সৃষ্টির স্বার্থকতা এখানেই । দোলনচাঁপা তাঁর ক্ষীণ দৃষ্টি শক্তির প্রকাশ, উল বোনা, আন্তরিক স্পর্শ (নিবেদিতাকে ) চোখের পাতা ভিজিয়ে দেয় । পরিণত নাট্য নির্দেশকের পরিণত নাট্য প্রকাশ কখনোই মনে হয় না দলটির বয়স সবে এক । আগামী দিনে বহু মঞ্চে তাঁদের এই সবুজ পাতায় সূর্যের চিকিমিকি আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক, বসন্তের নির্মল বাতাস আমাদের অন্তর কে আনন্দময় করে তুলুক, এই কামনা করি ।



.jpeg)

0 Comments