বিজয়কুমার দাস
বীরভূমের সীমানা ছাড়িয়ে পূর্ব বর্ধমানের পিণ্ডিরা একটি ছোট্ট গ্রাম।আর পাঁচটা গ্রাম যেমন হয় তেমনই । নাটকের চর্চা শুধু যে শহরকেন্দ্রিক তা নয়, অনেক গ্রামও আছে যেখানে নাটকের দলও আছে । যদিও সময়ের নিরিখে গ্রামের সংস্কৃতিও বদলে যাচ্ছে, তবু পিণ্ডিরা গ্রামের ইলোরার মত দল গ্রাম থেকেই থিয়েটারের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে । রুজি রোজগার বা পেশার প্রয়োজনে অনেকেই শহরে ঘর বাঁধলেও পিণ্ডিরা গ্রামে ইলোরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে থিয়েটার চর্চার । যদিও রাজ্যের থিয়েটার মানচিত্রে গ্রাম থেকে বেড়ে ওঠা এই দলটি আজ সুপরিচিত নাট্যদল ।
পিণ্ডিরা গ্রাম থেকে কিছুটা কাছাকাছি বীরভূমের বোলপুর আর বর্ধমানের কাটোয়া । মলয় ঘোষ নামের নাটক পাগল যুবকটি অবিরত থিয়েটারচর্চার মাধ্যমে নিজের দলটিকে চিনিয়ে দিতে পেরেছে নাট্যমহলে । দলের নির্দেশক মলয় এবং সম্পাদক প্রলয় ঘোষ ১৯৯৬ থেকে যাত্রা করতেন নবারুণ সঙ্ঘে । তখন থেকেই নাটকের দল গড়ার ইচ্ছে তাদের । অবশেষে কুমার রায়, বাদল সরকারের মত নাট্যজনদের সান্নিধ্যে ও প্রেরণায় ২০০২ সালে ইলোরা নামে নাট্যদল প্রতিষ্ঠা করেন । তবে নিবন্ধীকরণ হয়েছিল ২০১২ সালে । যদিও মাঝের এই দশ বছর কিন্তু থিয়েটার থেমে থাকেনি তাদের । ২০০২ সালের ৪ নভেম্বর মলয় ঘোষের রচনা ও নির্দেশনায় "প্রতিবেশী" নাটক দিয়ে পথচলা শুরু । পরবর্তীতে লাশ, হৃদয়পুর কত দূর, পাশফেল সহ বহু উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা করেছে । শুধু তাই নয় ডাক পেলেই পশ্চিমবঙ্গের যে কোন প্রান্তে গিয়ে নাটক করে এসেছে । মলয় ঘোষ নিজে ভাল নাট্যকার । পাশাপাশি গান গাইতে পারেন । তবলা বাজাতে পারেন । আর এই ইলোরা থেকেই মলয় ঘোষ থিয়েটারের জন্য একটা যুগান্ত সৃষ্টিকারী কাজ করে ফেলেছে । "ইলোরা বর্ষকথা" নামে প্রতিবছর দুই বাংলার থিয়েটারের খবরাখবর আর নাট্য ব্যক্তিত্বদের নাম ঠিকানা সহ তার উদ্যোগে প্রকাশিত নাটকের বর্ষপঞ্জী নাট্যমহলে আলোড়ন তুলেছে ।
এই দলের একটি ভিন্ন স্বাদের প্রযোজনা "কবিকথা" নাটক । কোন কবির কথা নয়, প্রায় বিলুপ্ত হতে বসা কবিগানের কথা ও কবিয়ালের কথা বলা হয়েছে এই নাটকে । লোকসংস্কৃতির একটি জনপ্রিয় শাখাকে অবলম্বন করে এই প্রযোজনা ইলোরা দলকে চিনিয়েছে রাজ্য জুড়ে । নাট্যকার নির্দেশক মলয় ঘোষ নিজেই । ২০১৬ সালে বীরভূমের দুবরাজপুরে নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হওয়ার পরই নাটকটি দর্শকের ভাল লাগার নাটক হয়ে ওঠে । দলের সবচেয়ে বেশিবার অভিনীত নাটক যদিও "হৃদয়পুর কত দূর" তবু ২০১৬ থেকে ২০২২ এর মাঝামাঝি পর্যন্ত নাটকটি রাজ্যের বিভিন্ন ছোট বড় মঞ্চে ৫৫ বার অভিনীত হয়েছে । দলের ২১ তম প্রযোজনা এই নাটক যেখানেই মঞ্চস্থ হয়েছে সেখানেই সমাদৃত হয়েছে । কবিগানের ক্রমহ্রাসমানতা এবং আধুনিক সংস্কৃতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব এই নাটকের উপজীব্য ।
গ্রামে থাকার সূত্রে কবিগান শোনা এবং কবিয়ালদের সঙ্গে কবিগান নিয়ে আলোচনার সূত্রে কবিগান নিয়ে একটা ধারণা জন্মেছিল মলয়ের । সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এই নাটক লেখায় । ২০১৬ সালে সুন্দরম আয়োজিত সারা বাংলা নাট্য রচনা প্রতিযোগিতায় নাটকটি সেরা নাটকের পাণ্ডুলিপি হিসাবে সম্মান পায় । তার পরেই নিজের দলে নাটকটি প্রযোজনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন নাট্যকার নির্দেশক মলয় ঘোষ । মোট ১২ জন অভিনেতা অভিনেত্রীর এই নাটকে স্ত্রী চরিত্র ২ জন । তবে স্ত্রী চরিত্র এই নাটকে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় সবাই দলের ছেলেমেয়ে ফ্রীল্যান্সার নয় কেউ । কবিকথা নাটকের আগে গ্রামীণ এক কবিয়ালকে নিয়ে এসে কবিগান শেখা এবং কবিগানের এক বাজনদারের কাছে প্রলয় ঘোষ বাজনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিল । কলকাতার শিশির মঞ্চ, শান্তিনিকেতনের লিপিকা মঞ্চ, রঘুনাথগঞ্জ রবীন্দ্র ভবন সহ সিউড়ি রবীন্দ্র সদন, হলদিয়া, ই.জেড.সি.সি. সহ বিভিন্ন গ্রাম শহরের মঞ্চে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে । ২০২২ এর মার্চ মাসে নাটকটি অল-ইণ্ডিয়া রেডিও আকাশবাণী কলকাতা রেকর্ড করে সম্প্রচার করেছে । ইলোরা চেষ্টা করে কম প্রযোজনা ব্যয়ে নাটক নির্মাণ করতে।যাতে যে কোন গ্রাম শহরে শুধুমাত্র যাতায়াত ভাড়া পেলেই তারা থিয়েটার করে আসে।দলের নিজস্ব মহলাকক্ষ এবং মঞ্চ তৈরি করে নিয়েছে গ্রামেই । সেই গ্রামে ইলোরা নাটকের উৎসবের আয়োজনও করে ।



.jpeg)

0 Comments