মহলা থেকে মঞ্চে || পর্ব - ২৬ || থিয়েটার অভিযান প্রযোজনা "সুবর্ণর মরাবাঁচা" - NEWS THEATRE FORUM


বিজয়কুমার দাস

 বীরভূমের সিউড়ির সুবিনয় দাস থিয়েটার অভিযান দলের প্রতিষ্ঠাতা, কর্ণধার এবং নির্দেশক । থিয়েটারের রাজ্যে তাঁর অন্য পরিচয়টি হল একজন নাট্যকার হিসাবে । নিজের দলে যেমন তাঁর নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে তেমনি রাজ্যের বহু নাট্যদল তাঁর লেখা নাটক মঞ্চস্থ করেছে । গ্রুপ থিয়েটার, গণনাট্য, অসময়ের নাট্যভাবনা প্রভৃতি নাট্য পত্রিকায় তাঁর বহু নাটক প্রকাশিত হয়েছে । ইতিমধ্যেই নির্বাচিত দশটি একাঙ্ক, এবার একুশ, নির্বাচিত কুড়ি, নির্বাচিত এক ডজন নামে চারটি প্রকাশিত নাট্য সংকলনে সুবিনয়বাবুর ৬০ টির বেশি নাটক প্রকাশিত হয়েছে ।

তাঁর নাট্যদলটিও জেলার পুরনো নাট্যদল । ৫০ বছরের চৌকাঠ ডিঙিয়েছে তাঁর নাট্যদল । ১৯৬৮ সালে "অভিযান" নামে যাত্রা শুরু করা সুবিনয়বাবুর নাট্যদল এখন "থিয়েটার অভিযান " নামে সুপরিচিত ।


সুবিনয়বাবুর দলে বিভিন্ন সময় তাঁর লেখা বিভিন্ন নাটক অভিনীত হয়েছে । "সুবর্ণর মরাবাঁচা" নামে নাটকটি থিয়েটার অভিযান এর একটি উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা । ১৯৬৮ সালে সিউড়ি পুলিশ লাইনের কাছে মঞ্চ বেঁধে ডা:অরুণ কুমার দে রচিত "অর্ঘ্য" নাটক দিয়ে দলের নাট্য অভিযান শুরু হলেও "সুবর্ণর মরাবাঁচা" নাটকটি প্রথম অভিনীত হয়েছিল ১৯৯০ সালের ১৫ মে সিউড়ির  বীরভূম জেলা পরিষদ হলে । তারপর বহুবার বহু মঞ্চে নাটকটি অভিনীত হয়েছে । এমন কি পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির নাট্যমেলাতেও নাটকটি অভিনীত হয়েছে।

সুবিনয়বাবু জানালেন, নাটকটি গড়ে উঠেছে অশোক কুমার সেনগুপ্তর গল্প অবলম্বনে । নাটকটিতে জাতপাত, কুষ্ঠরোগ ইত্যাদির বিরুদ্ধে এবং পাশাপাশি সম্প্রীতির পক্ষে বার্তা প্রচারিত হয়েছে । নাটকে মোট চরিত্র ৪ টি । স্ত্রী চরিত্র ১ টি।চরিত্রগুলি হল : কালু, সুবর্ণ, গজেন এবং হরা । সকলেই নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি । সুবর্ণর স্বামী দুলাল কাজ করত গজেনের দোকানে । কিন্তু দুলালের কুষ্ঠ হওয়ায় সে আত্মহত্যা করে । স্বামীর মৃত্যুর পরে একা হয়ে যাওয়া সুবর্ণ আত্মহত্যা করতে গেলে কালু দেখতে পায় এবং তাকে আত্মহত্যায় নিরস্ত করে নিজের কুটিরে আশ্রয় দেয় । কিন্তু অবিবাহিত কালু একটি মেয়েকে আশ্রয় দিয়ে বিপদেও পড়ে । অন্যদিকে বিবাহিত গজেনের লোভ ছিল সুবর্ণর প্রতি । গজেন কালুর অনুপস্থিতিতে কালুর বাড়ি এসে সুবর্ণকে তার রক্ষিতা হিসাবে থাকার প্রস্তাব দেয় । সুবর্ণ তাকে বঁটি নিয়ে তাড়া করে । কালুর প্রাণের বন্ধু হল হরা । কালু ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসা একজন একা থাকা মানুষ । তবে জাতিতে মুসলিম বন্ধু হরার সঙ্গে তার প্রাণের যোগ । হরার বৌ এর অসুস্থতার সময় কালু রক্ত দেওয়ায় হরার বিবি বেঁচেছিল । কিন্তু কালু বিয়ে করেনি । কালুর প্রতি সুবর্ণর একটা আকর্ষণ গড়ে ওঠে । বিয়ের প্রস্তাব দিতেই সুবর্ণ জানায়, তারও কুষ্ঠ হয়েছে।এ কথা জানার পর কালু সুবর্ণকে তাড়িয়ে দেয় । প্রথমে বন্ধু হরার কাছে সুবর্ণর ব্যাপারটা গোপন রাখলেও সুবর্ণ চলে যাওয়ার পর কালু হরাকে সব কথা খুলে বলে । হরা সব শুনে কালুকে তিরস্কার করে বলে, সে অন্যায় করেছে।কুষ্ঠ রোগ চিকিৎসা করালে ভাল হয়ে যায় । তাই দুই বন্ধুতে বেরিয়ে পড়ে সুবর্ণকে খুঁজতে ।

সুবর্ণ চরিত্রে প্রথমে অভিনয় করেছিলেন শিপ্রা মিত্র।পরে শিউলি ভাণ্ডারী, বনবীথি মণ্ডল এবং সুবিনয়বাবুর পুত্রবধূ মহুয়া দাস । কালু চরিত্রে স্বপন ব্যানার্জী ও ব্রহ্মানন্দ সাউ অভিনয় করেছেন । নাট্যকার শিব শর্মা, অধ্যাপক নাট্য বিশেষজ্ঞ বিষ্ণু বসু,নাট্য আলোচক নৃপেন্দ্র সাহা, গল্পকার অশোক কুমার সেনগুপ্ত সহ বহু বিশিষ্টজন নাটকটি দেখেছেন ।

সুবিনয়বাবু জানালেন, ১৯৯০ থেকে  এ নাটকের অভিনয় চলছে । খোলা মঞ্চে, বাঁধা মঞ্চে, মুক্ত মঞ্চে, মেলায় যে কোন পরিসরে নাটকটি অভিনয় করা যায়।বিভিন্ন সময় নাটকের নেপথ্যশিল্পী, অভিনেত্রী বদলালেও তিনি হরা চরিত্রেই অভিনয় করে চলেছেন । এই চরিত্রটির প্রতি তাঁর একটা মমতা গড়ে উঠেছে । তাই "সুবর্ণর মরাবাঁচা" নাটক চলছে চলবে ।

Post a Comment

0 Comments