মহলা থেকে মঞ্চে || পর্ব - ২৩ || তিলজলা ঋতু প্রযোজিত " ঘুণপোকা" - NEWS THEATRE FORUM

বিজয়কুমার দাস

কসবা ঋতু থেকে তিলজলা ঋতু।১৯৬৯-  ২০১০ সাল।১৯৬৯ সালে একদল নাটকপাগল মানুষ গড়ে তুলেছিলেন কসবা ঋতু নাট্যদল।বেশ কিছু ভাল প্রযোজনার মাধ্যমে দলটি নাট্যমহলে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।নীড়,খাঁচা,অগ্নিগর্ভ হেকিমপুর ও পরাণ মণ্ডলের ঘরগেরস্তি,বিবসনা বৃহন্নলা প্রভৃতি নাটক কসবা ঋতুর উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা।বিষ্ণুপদ দে ছিলেন নাট্য পরিচালক।দেবেশ রায়চৌধুরী অভিনয় করতেন এই দলে।পরে অবশ্য বহুরূপী দলে যোগ দেন।এই দলের বেশ কিছু মানুষ চাকরিসূত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।অনেকের বয়স বাড়ে।তাই পরবর্তীতে কিছু নতুন মুখ নিয়ে ২০১০ সালে গড়ে ওঠে তিলজলা ঋতু।তিলজলা ঋতু গঠনের প্রথম সভায় প্রায় ৩৬ জন উৎসাহী নাট্যপ্রেমী যোগ দিয়েছিলেন।তিলজলা ঋতুর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সুমিত চৌধুরী,শাহজাদা পারভেজ,অমল চক্রবর্তী,দেবাংশু ভট্টাচার্য প্রমুখ।২০১০ সালেই দলের নিবন্ধীকরণ হয়ে যায়।আবার জোরকদমে শুরু হয় নাট্যচর্চা।আশিস সর্দারের নাটক ও নির্দেশনায় "শেষ সত্য নয়" নাটক দিয়ে পথচলা শুরু হয় তিলজলা ঋতুর।পরবর্তীতে হরিবর্তন,স্বপ্ন দেখে মন,বাঘ রাক্ষসের বৃত্তান্ত,বাজারে কী মধু আছে প্রভৃতি নাটকের মাধ্যমে দলটির পরিচিতি বাড়ে।যত পরিচিতি বাড়ে, তত উৎসাহও বাড়ে দলের কর্মকর্তাদের।নাট্যজন অশোক মুখোপাধ্যায়ের লেখা "তরবারি সুমঙ্গল " নাটকটিও তাদের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা।বিভিন্ন নাটক পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আশিস সর্দার,অমল চক্রবর্তী,জয়ন্তদীপ চক্রবর্তী, স্বপ্নদীপ সেনগুপ্ত।দলের " হরিবর্তন " ( নাটক : অমল চক্রবর্তী) নাটকটি নাট্যজন বিভাস চক্রবর্তী দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।শুধু তাই নয়, বিভাসবাবু তাঁর "আমার দেখা দশটি নাটক " বইএ "হরিবর্তন"নাটকটি নিয়েও মত প্রকাশ করেছেন।


দলের সাম্প্রতিক প্রযোজনা "ঘুণপোকা"প্রথম মঞ্চায়নেই আলোড়ন তুলেছে।নাটকটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন স্বপ্নদীপ সেনগুপ্ত।স্বপ্নদীপ এর আগে এই দলের "বাজারে কী মধু আছে " নাটকটির নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন।"ঘুণপোকা"নাটকের নাট্যকার দেবব্রত দাশগুপ্ত।নির্দেশক স্বপ্নদীপ মাধ্যমেই নাট্যকারের কাছ থেকে নাটকটি পাওয়া গিয়েছিল বলে দলের সূত্রে জানা গেছে।লকডাউনের পরে প্রায় তিন মাস জোরকদম রিহারসালের পর ২০২২ এর ১২ মে নাটকটি মধুসূদন মঞ্চে প্রথমবার মঞ্চস্থ হয়েই দর্শকবন্দিত হয়েছে।নাটকে মোট ৬ টি চরিত্র।তার মধ্যে ৫ টি পুরুষ চরিত্র ও ১ টি নারী চরিত্র।নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেবযানী সিনহা।অন্যান্য চরিত্রে সুমিত চৌধুরী ( চেয়ারম্যান),শাহজাদা পারভেজ ( জজ), প্রবাল চক্রবর্তী( ডাক্তার), মিঠুন দাস ( পুলিশ),দেবাংশু ভট্টাচার্য ( গোপাল)। দেবযানী অভিনয় করেছে চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ সুষমা চরিত্রে।

বিষয়বস্তুতে প্রাধান্য পেয়েছে সমাজ যাদের দ্বারা পরিচালিত হয় সেই সমাজনিয়ন্ত্রকদের নৈতিক অবনমন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়।ক্ষমতার অপব্যবহারের পাশাপাশি নারীর অমর্যাদার বিরুদ্ধে তীব্র জেহাদ ঘোষিত হয়েছে এ নাটকে।নিজের স্বার্থরক্ষার জন্য অন্যকে অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অমানবিক শাস্তি দিতেও পিছপা হয় না এই সমাজনিয়ন্ত্রকরা।সে কথাই এ নাটকে তুলে ধরা হয়েছে।ঘুণপোকা যেমন একটু একটু করে সব শেষ করে দেয় তেমনি অমানবিকতা রূপ ঘুণপোকা কীভাবে সমাজকে ধ্বংস করছে সেটাই দেখানো হয়েছে "ঘুণপোকা" নাটকে।পাপবোধ,আত্মগ্লানি,বিবেক দংশনে আত্মশুদ্ধির বার্তাও আছে নাটকে।প্রজেকশনের মাধ্যমে নারীদহনের একটি দৃশ্য এ নাটককে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।"চর্যাপদের কবি"র পরিচালক স্বপ্নদীপের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হিসাবে চিহ্ণিত এই নাটক।

নাটকে নেপথ্য শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৈকত মান্না( আলো),অজয় প্রধান,প্রশান্ত দত্ত ( মঞ্চ) এবং স্বপ্নদীপ সেনগুপ্ত ও সৌমেন রায় ( আবহ নির্মাণ ও প্রক্ষেপণ)। 

"ঘুণপোকা"এই মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যুগে একটি বার্তা দিতে চেয়েছে সমাজের কাছে।তিলজলা ঋতু মনে করে সমাজ গঠনে  থিয়েটার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।তাই এমন একটি নাটকের আরো বেশি মঞ্চায়নে আগ্রহী তিলজলা ঋতু।




Post a Comment

0 Comments