বিজয়কুমার দাস
কলকাতার হরিদেবপুরের নাট্যদল নাট্যিক কলকাতা । দলের কর্ণধার নির্দেশক প্রতাপ কুমার মণ্ডল । থিয়েটার অন্ত প্রাণ । নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভাল থিয়েটার করার উদ্দেশ্য নিয়ে দল গঠিত হয়েছিল । পরে ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দলের নিবন্ধীকরণ হয়েছিল । তারপর থেকেই নানা স্বাদের নাটক করে দলটি কলকাতার থিয়েটার মহলে পরিচিত হয়ে ওঠে । বেশ কিছু নাটক বিভিন্ন মঞ্চে অভিনীতও হয়েছে।অভিনয় করেছে দলের ছেলেমেয়েরাই । ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে মনোজ মিত্র রচিত "ভজ গৌরাঙ্গ কথা" নাটক অভিনয়ের মাধ্যমে দলের থিয়েটারের কাজ শুরু হয়েছিল । দলের কর্ণধার প্রতাপ মণ্ডল জানিয়েছেন মফস্বলের প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের দিয়ে থিয়েটার করানোই নাট্যিক কলকাতার উদ্দেশ্য ছিল । সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই বেশ কিছু নাটক মঞ্চে এনেছে তারা ।
দলের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলো হল : অরণ্যবহ্ণি, শাস্তি কার, মরমিয়া মন, লাভ এন্ড লক।এর মধ্যে "লাভ এন্ড লক " নাটকটি বেশিবার অভিনীত ।
কিন্তু একটা উল্লেখযোগ্য কাজ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল প্রতাপ কুমার মণ্ডল । মনের মত নাটকের সন্ধান চলছিল । করোনার সময়ে থিয়েটার বন্ধ ছিল । তেমন ব্যস্ততা ছিল না থিয়েটার নিয়ে । নিজের বই এর সংগ্রহ থেকে বিভিন্ন বই পড়তে পড়তে পেয়ে গেল বিজন ভট্টাচার্যর "দেবীগর্জন" নাটক।নাটকটা পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল এ নাটক তো এখনও প্রাসঙ্গিক । এখনও কৃষকরা অবহেলিত, বঞ্চিত, উপেক্ষিত । ফসলের দাম পায় না । মহাজনদের কাছে শোষিত হয় । তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল দেবীগর্জন নাটকই তাদের আগামী প্রযোজনা ।
দলে প্রস্তাব রাখতে সবাই রাজী । এ নাটক একসময় ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল । নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যর সঙ্গে এ নাটকের প্রাণের যোগ । কিন্তু আজকের প্রজন্ম, এই সময়ের থিয়েটারের তরুণ প্রজন্মের দর্শকের সঙ্গে কি "দেবীগর্জন" নাটকের তেমন পরিচয় আছে ?... এইসব ভেবেই শুরু হল মহলা । দলের নিজস্ব মহলাকক্ষ নেই । মহলাকক্ষ ভাড়া নিতে হয় । চরিত্র নির্বাচনের কাজ শেষ করে প্রায় ৬ মাস ধরে মহলা চলেছে । প্রতাপ কুমার মণ্ডল নিজে এই নাট্য নির্মাণের উপদেষ্টা হিসাবে থেকে নতুন প্রজন্মের সৃজিতা বান্টি ভদ্রের ওপর ন্যস্ত করেছে নাটক পরিচালনার দায়িত্ব । সৃজিতা রবীন্দ্রভারতীর নাটক বিভাগের স্নাতকোত্তর । কঠোর পরিশ্রম করেছে নির্দেশক সৃজিতা - জানিয়েছেন দলের কর্ণধার প্রতাপ মণ্ডল ।
মঞ্চে আবার "দেবীগর্জন" ফিরছে এই সংবাদ প্রচার হতেই থিয়েটার মহলে সাড়া পড়ে যায় । কিন্তু ভাবনা বাড়ে দলের । এতবড় একটা ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হল কি ?...কিন্তু পিছিয়ে আসার উপায়ও ছিল না । তাই প্রস্তুতি শুরু হল আরো জোরকদমে ।
২০২২ সালের ৬ মে মিনার্ভা মঞ্চে "দেবীগর্জন" মঞ্চস্থ হল । মোট ২০ জন অভিনেতা অভিনেত্রী মঞ্চ মাতিয়ে দিল । প্রভঞ্জন, ত্রিভুবন, রত্না, মংলা সহ অন্যান্য সব চরিত্রের শিল্পীরাই নিজেদের উজার করে দিল।নির্দেশক সৃজিতা তার প্রথম নির্দেশিত নাটকেই বাজিমাৎ করল । নিজে অভিনয় করল রত্না চরিত্রে ।
মোট ২০ জন কলাকুশলীর মধ্যে ৮ টি স্ত্রী চরিত্র ও ১২ টি পুরুষ চরিত্র । নির্দেশক সৃজিতা জানিয়েছে, এমন একটি নাটক নির্দেশনার দায়িত্ব পেয়ে চিন্তায় ছিলাম । কিন্তু প্রথম মঞ্চায়নে দর্শকদের অভিনন্দনে পুরো দল অনুপ্রাণিত ।
সৈকত মান্নার আলো, স্বপন ব্যানার্জীর আবহ, নীল কৌশিকের মঞ্চ, সুমনা মণ্ডলের পোশাক পরিকল্পনা, অর্ণব ব্যানার্জীর কোরিওগ্রাফি, ইব্রাহিম শেখের রূপসজ্জা এ নাটকের সম্পদ । শিবাশিস দত্ত ছিলেন সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ।
নাট্যিক কলকাতা অপেক্ষাকৃত নতুন দল হয়েও "দেবীগর্জন" করার ঝুঁকি নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ায় পুরো দলের কৃতিত্বকেই স্বীকার করে নিতে হয়। "দেবীগর্জন" দেখার জন্য থিয়েটারপ্রেমী দর্শকের আগ্রহ তাই স্বাভাবিক ।




0 Comments