শেষ হলো কংসাবতী নাট্য পরব দ্বিতীয় বর্ষ || পুরুলিয়া মাতলো নিজস্ব সংস্কৃতিকে - NEWS THEATRE FORUM




ঊর্ণাবতী সেন

পুরুলিয়া : জন সংস্কৃতি সেন্টার ফর থিয়েটার অফ দি অপ্রেসড ও গ্রামবাসীবৃন্দ আয়োজনে 'কংসাবতী নাট্য পরব' এবার দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করল ।  গত ১৬ ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ এ ফেব্রুয়ারি পুরুলিয়া জেলার দুটি ব্লকে তিনটি পর্যায়ে হইহই করে উদযাপিত হলো আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার প্রাণের এই পরব । গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পুঞ্চা ব্লকের নির্ভয়পুর শবর গ্রাম, গত ২ ফেব্রুয়ারি ওই ব্লকেরই লাগাডাঙ্গা বাউরি পাড়া এবং গত ২৭ ফেব্রুয়ারি হুড়া ব্লকের গুড়দা গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় এই পরব ।


ইট-কাঠ-পাথরে কিংবা পাটাতনের গায়ে পেরেক ঠুকে নয়, তিনটি গ্রামের নির্দিষ্ট একটি করে স্থান বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রকৃতির কোল থেকে । কোথাও দুটি গাছের ছায়ায় মাটির গায়ে গোবর লেপে, আবার কোথাও নদীর পাড়ে নদীর ছলাৎ ছলাৎ শব্দকে সঙ্গী করে । স্থানীয় রীতি মেনে জল জঙ্গল পাহাড়'কে পুজো করে অর্থাৎ  কোথাও কংসাবতী নদী আবার কোথাও পুকুরকে বরণ করে জল তুলে এনে গ্রাম থান (গ্রামের ঈশ্বরীয় মিলন স্থান) ও গাছের গোড়ায় জল দিয়ে পরবের শুভ সূচনা করা হয় । নদী বা পুকুর বরণের শোভাযাত্রায় সকল গ্রামবাসীরা শঙ্খ বাজিয়ে মাথায় ঘট নিয়ে পায়ে পা মেলায় । 


গত প্রায় ৩৭ বছর ধরে জনসংস্কৃতি সেন্টার ফর থিয়েটার অফ দি অপ্রেসড প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নাট্যচর্চা কে হাতিয়ার করে তরুণ প্রজন্মকে মানবিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দিয়ে চলেছে । ব্রাজিলিয়ান নাট্যব্যক্তিত্ব অগোস্ত বোয়াল এর আদর্শে ভারতবর্ষে প্রথম বার জন সংস্কৃতি ফোরাম থিয়েটার চর্চার প্রচলন শুরু করে । গ্রামের তরুণ প্রজন্মকে সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহিত করে আগামী প্রজন্মের জন্য সংস্কৃতি চর্চার মজবুত ভীত তৈরী করে দেওয়াই জনসংস্কৃতির প্রধান কাজ । আর তাই পুরুলিয়াতে তারা গত আট বছর ধরে এই চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে, পুরুলিয়া জেলার কয়েকশো গ্রামে তারা নিয়মিতভবে তরুণ প্রজন্ম সঙ্গে নাট্যচর্চা সহ সমাজসেবা মূলক কাজ করে যাচ্ছে । গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামের যে সকল শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের লোকশিল্পের চর্চা করে থাকেন, সেই সকল শিল্পের সমাহার নিয়ে সারাদিন ধরে কখনো দর্শকাসনে কিংবা কখনো মঞ্চে এসে একে অপরের সাথে মিলে যাওয়াই কংসাবতী নাট্য পরবের মূল উদ্দেশ্য । যেখানে একই মঞ্চে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত উপস্থাপিত হয়েছে স্থানীয় সকল বাচ্চাদের নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি সহ নাটক, ছৌ নাচ, নাটুয়া নাচ, টুসু, ভাদু, ঝুমুর গান, পাতা নাচ, করম নাচ, কাপ নাচ, যাঁত গান, যেমন খুশি সাজো ইত্যাদি আরো অনেক কিছু । এই প্রত্যেকটি আঙ্গিক সকল পুরুলিয়া বাসীর জীবনে, যাপনে কোন না কোন ভাবে জড়িয়ে আছে । এখানে অনুষ্ঠানের নির্মাণেকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে অধিকতর । সম্পূর্ণ আয়োজনের নেতৃত্ব দিয়েছে স্থানীয় কিশোর-কিশোরীরা এবং গ্রামের বয়স্করা তাদেরকে যথাসম্ভব সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে । প্রায় এক মাস ধরে অসংখ্য গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে টাকা, চাল, সবজি সংগ্রহ করা হয় । মঞ্চসজ্জা থেকে শুরু করে সকল শিল্পীদের জন্য খাবার রান্না করা, খাবার পরিবেশন করা, অনুষ্ঠান পরিচালনা ইত্যাদি সমস্ত দায়িত্বই সামলেছে গ্রামের ছেলে মেয়েরাই । একজন স্থানীয় শিল্পী তার নিজের ঐতিহ্যকে বজায় রেখে যে শিল্পচর্চাই করুক না কেন, এই পরবে অগ্রাধিকার তারই । কারণ এই পরব ঐতিহ্যকে বহন করবার উৎসব । 



এই শতাব্দীতে আমাদের জীবনে নতুন অতিথি মোবাইল ফোন, টিভি, ডান্স হাঙ্গামা ইত্যাদি । যাদের ঝকমকিতে হারিয়ে যাচ্ছে কুপির আলো । পূর্বপুরুষদের বয়ে আনা বিভিন্ন লোকশিল্প যা এখন অনেকেরই চর্চায় নেই আর । তাকে ফিরে দেখার পরব এটি । জন সংস্কৃতি'র অভিভাবত্বে 'কংসাবতী নাট্য পরব' তাই স্থানীয় ছেলেমেয়েদের প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার পরব । নাহ্, কারও সঙ্গে তুলনা নয় । বাইরের দুনিয়ায় কারা কোথায় এগিয়ে গেল তার তুল্যমূল্য বিচার নয় । নিজেকে কারো থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে সেই লড়াই নয় । কেবল নিজের ঐতিহ্য, নিজের সংস্কৃতির উদযাপন ।




তাইতো দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করেই কংসাবতী সঙ্গে পেয়েছে ছোট ছোট গ্রামের অসংখ্য মানুষকে । তাঁদের অর্থসাহায্যে, তাঁদেরই তৈরি মেলায়, তাঁদের ঘরের ছেলেমেয়েরা পারফর্ম করছে । হয়তো মানুষগুলির স্বপ্নপূরণের দিশারী এই পরব কিংবা নতুন স্বপ্ন দেখবার উদ্যম ! তাইতো শুধুমাত্র ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাই নয়, দেখা গেল ৮০ উর্দ্ধ ব্যক্তিকেও । যিনি মাইক হাতে ছোটবেলার ভুলে না যাওয়া ছড়াটি বলেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে । চাঁদা তোলা থেকে মঞ্চে দাপিয়ে পারফর্ম করা প্রতিটি ক্ষেত্রে এলাকার মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো । শুধুমাত্র নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ সকলের উপস্থিতি নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন এ পরব আমাদের পরব । এ উৎসব ছাড়িয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে আমরাও আছি। আমরাই আছি। 





দ্বিতীয় বর্ষের এই অনুষ্ঠান কেবল সাফল্যমন্ডিত হয়েছে তাই নয়, সেই সঙ্গে আগামী কয়েক দশকের বীজ বপন করেছে মানুষের মননে সে কথা বলাই যায় ।

Post a Comment

0 Comments