বিজয়কুমার দাস
উত্তরবঙ্গের নাট্যচর্চা যে যথেষ্ট উন্নত সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না । উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে বহু নাট্যদল উল্লেখযোগ্য কাজ করে চলেছে । অনেক নাট্যদলে মহিলারা অভিনয়ে, পরিচালনায়, সাংগঠনিক দক্ষতায় যথেষ্ট এগিয়ে । জলপাইগুড়ি মুক্তাঙ্গন নাট্যসংস্থা এইরকম একটি নাট্যদল । এই দলের বেশ কিছু প্রযোজনা দর্শকবন্দিত । মুক্তাঙ্গন নাট্যসংস্থার একটি উল্লেখযোগ্য এবং অবশ্যই ব্যতিক্রমী প্রযোজনা "দ্রোহ" নাটক ।উল্লেখযোগ্য এই জন্য যে, নাটকের পরিচালক রীণা ভারতী উত্তরবঙ্গে থিয়েটারচর্চায় সদানিয়োজিত এবং "দ্রোহ" নাটক দর্শকবন্দিত । আর ব্যতিক্রমী এইজন্য যে তাদের " দ্রোহ " নাটকটি কোচ রাজবংশী ভাষায় লেখা । উত্তরবঙ্গে বহু মানুষের মধ্যে কোচ রাজবংশী ভাষার প্রচলন আছে । তাই কোচ রাজবংশী ভাষায় লেখা একটি নাটক মঞ্চে আনা যে নি:সন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ তা বলতেই হয় ।
প্রথমে পাড়ার কিছু মানুষকে নিয়ে নাটক ও সাংস্কৃতিক চর্চার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দলটি তৈরি হয়েছিল । পরে প্রমথদেব মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রীরা এই দলে যোগ দেয় । তারপর ২০১৫ সালে পৌর ছাত্র যুব উৎসবে যোগ দিয়ে নানা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ছেলেমেয়েরা । পরবর্তীতে গ্রুপ থিয়েটার হিসাবেই পথচলা শুরু । ২০১৬ সালে দলের সরকারী নিবন্ধীকরণ হয় । দলের নাট্য পরিচালক রীণা ভারতী এবং দলের সম্পাদক মৌসুমী কুণ্ডু ।
রীণা ভারতীর পরিচালনায় নিখিলরঞ্জন দাসের লেখা "উদ্বাহ" নাটক দিয়ে দলের নাট্যচর্চা শুরু বলে জানিয়েছেন দলের সম্পাদক মৌসুমী কুণ্ডু । ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর নাটকটি জলপাইগুড়ি রবীন্দ্র ভবনে মঞ্চস্থ হয় । দলের অন্যান্য প্রযোজনাগুলি হল : জল দাও (মৈনাক সেনগুপ্ত), শুদ্ধ মাটির সন্ধানে (দেবশঙ্কর হালদার) , সংবেগ (স্বপন দাস), ব্যাধি (গৌতম রায়) । জল দাও নাটকটি এগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার মঞ্চস্থ হয়েছে ।
কিন্তু দলের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা অবশ্যই "দ্রোহ " নাটকটি । নাটকটির রচয়িতা অর্ণব মুখোপাধ্যায় । অর্ণববাবু পেশায় শিক্ষক এবং কোচবিহারে তাঁর নিজস্ব নাট্যদল আছে ।উত্তরবঙ্গের উপজাতিদের উপভাষা এই কোচ রাজবংশী ভাষা । দলে সিদ্ধান্ত হয়, রাজবংশী ভাষায় লেখা এই নাটকটিই নির্মাণ করা হবে । কিন্তু দলের ছেলেমেয়েরা রাজবংশী নয় । তাই নাট্যকার অর্ণববাবু ও নির্দেশক রীণা ভারতীর তত্ত্বাবধানে দলের অভিনেতা অভিনেত্রীদের এই ভাষায় রপ্ত করা হয় । তারপর শুরু হয় নাটকের প্রস্তুতির কাজ । প্রস্তুতি অন্তে প্রায় ১৫০০০ টাকা প্রযোজনা ব্যয়ের এই নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় জলপাইগুড়ি রবীন্দ্র ভবনে । তারপর বেশ কয়েকবার বিভিন্ন মঞ্চে অভিনীত হয়েছে । রাজবংশী উপভাষায় অভ্যস্ত মানুষজনও নাটকটি দেখে প্রশংসা করেছেন । নির্দেশক রীণা ভারতী নাটকটির নির্মাণে পরিশ্রম করেছেন সাধ্যাতীত । মোট ১৪ জন কুশীলব অভিনয় করেছেন এই নাটকে । যাদের মধ্যে ৬ জন অভিনেত্রী । প্রত্যেকেই স্বচ্ছন্দে বলেছেন রাজবংশী ভাষার সংলাপ ।
নিজেদের নাটকের প্রস্তুতি পর্বের সংবাদ প্রকাশে আগ্রহী
নাটকের দল অবশ্যই যোগাযোগ করুন
লেখক বিজয় কুমার দাস এর সাথে
যোগাযোগ : ৯৪৩৪৩৭৪৯৭৪
নাটকের বিষয়বস্তুটিও আকর্ষণীয় । কোচ রাজবংশী লোকাচার অনুযায়ী বৃষ্টির দেবতা হলেন হুদুম দেও । খরার সময় গ্রামের মহিলারা ফসলের ক্ষেতে নিজেদের শরীর উৎসর্গ করে নিশুতি রাতে এই পুজো করে । সেখানে পুরুষের প্রবেশাধিকার থাকে না । কোন পুরুষ প্রবেশ করলে তাকে মেরে দেবার ক্ষমতাও থাকে মহিলাদের । কিন্তু ঘটনাক্রমে একজন পুরুষ তার প্রেমিকাকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে চলে আসে । তারপর তাকে নিয়ে মহিলাদের সিদ্ধান্ত নিয়েই এই "দ্রোহ" নাটক ।
নাটকটির বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মঞ্চায়ন হয়েছে নাট্যজন মঞ্চ উৎসবে জলপাইগুড়ি রবীন্দ্র ভবন মঞ্চে, শিলিগুড়ি ইঙ্গিত নাট্য উৎসবে দীনবন্ধু মঞ্চে, ২০২০ সালে পৌর ছাত্র যুব উৎসবে জলপাইগুড়ি প্রয়াস মঞ্চে, কামাখ্যাগুড়ি আওয়াজ নাট্য উৎসবে (২০২২) হাইস্কুল মঞ্চে, তুফানগঞ্জ ভাওয়াইয়া সঙ্গীত ও নাটক উন্নয়ন সংস্থা আয়োজিত রাজবংশী নাটক প্রতিযোগিতায় তুফানগঞ্জ হাই স্কুলের মঞ্চে।তুফানগঞ্জে রাজবংশী নাটক প্রতিযোগিতায় "দ্রোহ" নাটক শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা সহ শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ( অর্ণব মুখোপাধ্যায়), শ্রেষ্ঠ নির্দেশক (রীণা ভারতী), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী (সংহিতা চন্দ্র), শ্রেষ্ঠ সহ অভিনেত্রী ( অদিতি ভৌমিক), দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ অভিনেতা( বাণীব্রত মণ্ডল), শ্রেষ্ঠ রূপসজ্জা (সুলগ্না চক্রবর্তী), শ্রেষ্ঠ আবহর (সুমন্ত রায়) পুরস্কার পায় । উল্লেখ্য এ নাটকের আলোর দায়িত্ব পালন করেছেন সুজিত সাহা এবং আবহ পরিকল্পনা ও মঞ্চ ভাবনার দায়িত্ব পালন করেছেন নির্দেশক রীণা ভারতী নিজে । এভাবেই বিজয়কেতন উড়িয়ে এগিয়ে চলেছে জলপাইগুড়ি মুক্তাঙ্গন নাট্যগোষ্ঠীর কোচ রাজবংশী ভাষায় লেখা "দ্রোহ" নাটক ।



0 Comments