বিজয়কুমার দাস
কলকাতা স্বতন্ত্র নামের নাট্যদলটি "পাখির বাসা" নামে একটি ভিন্ন ভাবনার নাটক প্রযোজনা করে নাট্যমহলে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে । বরানগরের এই দলটির পথ চলা শুরু ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি।তাই ৮ জানুয়ারিকেই দলের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসাবে ধরা হলেও সরকারীভাবে অন্তর্ভুক্তিকরণ হয়েছিল ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল । ভাল নাটক করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই কলকাতা স্বতন্ত্র নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে । দলের সম্পাদক এবং বেশ কয়েকটি নাটকের নির্দেশক সায়ন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, নাট্যকার শ্যামল চন্দ্রের লেখা "নৈবেদ্য" নাটকটি দলের প্রথম প্রযোজনা । সেই নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল মথুরাপুর জয়নগর আটেশ্বরীতলা সংস্কৃতি মঞ্চে নাট্য প্রতিযোগিতায় । দলের অন্যান্য প্রযোজনাগুলি হল, গাধার পায়ে সোনার বালা, গেটম্যান, কোথায় ?... ইত্যাদি নাটক । "গেটম্যান" নাটকটি দলকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছিল । "গেটম্যান" নাটকটি বিভিন্ন মঞ্চে ৫০ রজনীর বেশি অভিনীত হয়েছে । এছাড়া মৈনাক সেনগুপ্ত রচিত সুপ্রভাত, রাধারমণ ঘোষের মুচকিমঙ্গলকাব্য, শ্যামলতনু দাশগুপ্তর জানবদল নিয়েও ভাবনাচিন্তা চলছে ।
গেটম্যান নাটকের নাট্যকার শ্যামল চন্দ্রর মাধ্যমেই "পাখির বাসা" নাটকটি পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন দলের পক্ষে সায়ন চক্রবর্তী । পূর্ণাঙ্গ এই নাটকটি শুনে এবং পড়ে নির্দেশক শ্যামল চক্রবর্তী এবং দলের সবার পছন্দ হয়ে যায় ।
নাটকের বিষয়বস্তুতে প্রাধান্য পেয়েছে পাখিদের প্রতি একজন মানুষের ভালবাসা । আবার সমকালীন সময়, প্রমোটারের থাবা ইত্যাদি বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে ।
গল্পের প্রধান চরিত্র অনিমেষ দত্ত একজন স্কুলমাস্টার । তাঁর বাবা রেলে চাকরির সূত্রে ঘুরে বেড়াতেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে । কিন্তু পাখিদের প্রতি তাঁর একটা মমত্ববোধ ছিল । প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে এ পৃথিবীতে পাখিদের নিরুপদ্রবে বাস করার জায়গা কমে যাচ্ছে । তাই একটি পাখিরালয় গড়ে তুলবার বাসনায় কলকাতায় ইস্টার্ন বাইপাসের ধারে ২৩ বিঘা জায়গা কিনে রেখেছিলেন।কিন্তু জীবৎকালে তাঁর এই ইচ্ছা পূরণ হয়নি । বাবার মৃত্যুর আগে তাঁর স্কুলমাস্টার ছেলে ঠিক করেছিল, বাবার অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করবে।স্কুলমাস্টারের চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর অনিমেষ পাখিরালয় গড়ে তোলার কাজে নামে । কিন্তু বিগত তিরিশ বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে অনেক।এই কাজে নেমে অনিমেষের জীবনে নেমে আসে বিপন্নতা । জায়গাটির দিকে নজর পড়ে প্রমোটারদের।তারা চায়, সেখানে মালটিস্টোরিড বিল্ডিং বানিয়ে ব্যবসা করতে । রাজনৈতিক মদত, মস্তানরাজের বিরুদ্ধে লড়তে হয় অনিমেষকে । অনিমেষ হারতে চায় না । কিন্তু তার বাড়িতে হামলা হয়।সেই হামলার শিকার হয়ে অনিমেষের স্ত্রীর মৃত্যু হয় । তবু অনিমেষ "পাখির বাসা" নামে পাখিরালয় গড়ে দিতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত।
প্রকৃতিপ্রেম,পাখির প্রতি মমতা, জীববৈচিত্র্য,সমকালীন রাজনীতি, সিণ্ডিকেটরাজ ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পাওয়ার ফলে শ্যামল চক্রবর্তী নির্দেশিত "পাখির বাসা" নাটক দর্শকের কাছে বিশেষ মাত্রা পেয়েছে । নাট্যকার শ্যামল চন্দ্র সহ বহু বিশিষ্ট দর্শক, বিভিন্ন নাট্যদলের কর্মী এবং থিয়েটারের সাধারণ দর্শকদের কাছে গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে নাটকটি।দলের সদস্য সদস্যারাই অভিনয় করেছেন এই নাটকে । একজন শুধু ফ্রী ল্যান্সার ।
নাটকে মোট ১১ টি প্রধান চরিত্রের মধ্যে ৪ টি নারীচরিত্র । এছাড়া অন্যান্য ৭ টি অপ্রধান বা কোরাস চরিত্রের মধ্যে ৬ টি পুরুষ চরিত্র ও ১ টি নারী চরিত্র । পরিচালক শ্যামল চক্রবর্তী নিজে অভিনয় করেছেন নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনিমেষের ভূমিকায় ।
নাটকের নেপথ্যশিল্পী হিসাবে আলোর দায়িত্ব সামাল দিয়েছেন বাদল দাস এবং আলো প্রক্ষেপণে দীপক দেব । আবহ পরিকল্পনায় সায়ন চক্রবর্তী, ধ্বনি প্রক্ষেপণে শ্রীতমা বসু, মঞ্চসজ্জায় মদন হালদার ও ভিডিওগ্রাফিতে সৌমিক মান্না দায়িত্ব পালন করেছেন । প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্টের কারণে পাখিদের বসবাসের জায়গা নষ্ট হয়ে যাওয়ার বক্তব্য প্রাধান্য পাওয়া এই নাটক মঞ্চে এনে কলকাতা স্বতন্ত্র থিয়েটারের দর্শকদের যে প্রশংসা পেয়েছে,তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে দলটি আগামীতে আরো অনেক মঞ্চায়ণ চায় এই নাটকের ।
0 Comments