ইছাপুর সন্ধিক্ষণ এর নিও-রিয়ালিস্ট নাটক 'সাইকেল' || সত্য জিৎ || NEWS THEATRE FORUM


 নাটক - সাইকেল

সত্য জিৎ

সুখচর : গতকাল ১৯ মার্চ ২০২২ তারিখে বেলঘড়িয়া হাতেখড়ি আয়োজনে সুখচর পাইন ঠাকুরবাড়ি নাট মন্দিরে মঞ্চস্থ হলো ইছাপুর সন্ধিক্ষণ প্রযোজনা 'সাইকেল' । ব্রেখটিয় আঙ্গিকে স্পেস কেন্দ্রিক এবং ফ্লেক্সিবেল - পোর্টেবল - ইনেক্সপেন্সিভ এই থিয়েটার দর্শক মনে প্রবল ভাবে সাড়া জাগিয়েছে । এই নাটকটি মূলত নিও-রিয়েলিস্ট ফ্রি স্পেস নাটক । 'ফ্রি স্পেস' অর্থাৎ এই নাটকের জন্য নির্দিষ্ট কোন মঞ্চ লাগে না, যে কোন মঞ্চে, যেকোনো স্পেসে, খোলা মাঠে কিংবা রাস্তায় অনায়াসে অভিনয় করা সম্ভব । যা এই নাটকটির গ্রহণযোগ্যতাকে সাধারণ, নিপীড়িত, শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষের মাঝখানে পৌঁছে দিয়েছে । নিও-রিয়্যালিস্ট কাহিনী দর্শকদের কাছে যেসব মুহূর্ত উপস্থাপন করে তা যেন মনে হয় আমাদের শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষের জীবন থেকে নেয়া, চোখের সামনে বাস্তব জীবন ও মানুষের চিত্রায়ন । এই থিয়েটারের চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষের মতোই এবং এ ধরনের থিয়েটারে দৃশ্যায়িত হয় বাস্তবে দেখা প্রাকৃতিক ও অভ্যন্তরীণ দৃশ্যাবলী ।


ইতালিয়ান লেখক লুইজি বার্তোলিনি'র উপন্যাস 'দ্য বাইসাইকেল থিফ' অবলম্বনে ইতালিও ভাষায় ১৯৪৮ সালে একটি সিনেমা নির্মিত হয়, যার নির্দেশক ছিলেন ভিত্তোরিও ডি সিকা । বিশ্বের সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে এই চলচ্চিত্রটি অন্যতম । যার ৭৫ বর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনে ইছাপুর সন্ধিক্ষণ নির্মাণ করেছে 'সাইকেল' নাটকটি । সাধারণত কোন সিনেমাকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে মঞ্চ থিয়েটারের নির্মাণ খুব একটা চোখে পড়ে না, তাই এ এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস বলাই যায় ।


দর্শক যখন এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করছে, নাটক দেখবার জন্য আসন গ্রহণে ব্যস্ত । কুশীলবরা মঞ্চ প্রস্তুত এর মধ্যেই মূল নাটকের প্রবেশ করে ফেলেছেন । এক অতি সাধারণ মানুষ বা মজদুর চলেছেন নিজের গন্তব্যে । তার সাইকেলের ক্রিং ক্রিং বেল জানান দেয় এক দায়িত্বশীল অভিভাবক চলেছেন জীবনের তাগিদে । জীবনের গন্তব্যে তার একমাত্র সম্বল 'সাইকেল'টি হারিয়ে যায় । সেই সাইকেল চুরি করে আরেক মজদুর তার নিজের জীবনের গন্তব্য প্রসারিত করেন । সেই চুরি করা সাইকেল নিয়ে পরবর্তীতে ওই মজদুর এক মেয়ের পড়াশোনা যাতে থেমে না যায় তার দায়িত্ব নেন, আবার ঐই সাইকেলটিই এক বেকার ছেলের চাকরি নিশ্চিত করে নতুন জীবন উপহার দেয় ।


মূলত ২০২০-২০২১ সালের কোভিড অতিমারি সময়ে শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষের করুন কাহিনীর গল্প উঠে এসেছে এই নাটকে । অতিমারি, লকডাউন সময়ে দিশাহারা হয়ে এক অভিভাবক চলেছেন নিজের কর্মের সন্ধানে, এক শ্রমিক কাজ হারিয়ে পায়ে হেঁটে ভিন রাজ্য থেকে ফিরে আসছেন বাড়ির পথে, এক মেয়ে দূরত্বের জন্য পৌছতে পারছেন না তার জীবনের সবথেকে বড় পরীক্ষায় বসতে, আর এক বেকার যুবক চাকরি পাচ্ছেন না মাত্র একটি সাইকেলের অভাবে ।

ইছামতী নাট্যোৎসবে

১০ টাকার আর্থিক সহায়তা করতে চান ?

• সরকারি আর্থিক সহযোগিতা নেওয়া হয় না

• রাজনৈতিক আর্থিক সহায়তা নেওয়া হয় না

দান করতে   : CLICK HERE

নিও-রিয়ালিজম শিল্পধারার এই মজদুর-নৌটিঙ্কিতে নতুন কিছু সৃষ্টির আহ্বান প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছে আমাদের মত সাধারণ দর্শককে । পরিকল্পিত মঞ্চের সাজানো মেকি পরিবেশ ছেড়ে এই নাটক নেমে এসেছে পথের ধুলোয়, মন্দিরের চাতালে কিংবা মাঠের সবুজ ঘাসে ।  'সাইকেল' একটি অসামান্য নাটক । যার মূল বার্তা আপনার কাছে থাকা অতিরিক্ত সাইকেলটি অন্যকে দান করুন... অর্থাৎ আপনার যা নেই তা সঞ্চয় করুন, যা সঞ্চয় করেছেন তা জমিয়ে রাখুন, জমানোর পরে যা অবশিষ্ট আছে তা অন্য মানুষকে দান করুন ।


আপনার কাছে অতিরিক্ত পরে থাকা একটি সামান্য জিনিস হয়ত একটি মানুষেকে নতুন করে জীবনের পথ দেখাতে পারে ‌। ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে পারে সমাজের অন্তরে । আপনার দান মানুষকে ভালোবাসায় আবদ্ধ করে নির্মূল করে দিতে পারে রাজনৈতিক হিংসা, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা প্রথম হবার ইঁদুর দৌড় । তাই আপনার কাছে থাকা যেকোনো অতিরিক্ত জিনিস দান করুন অবশ্যই । আপনার আগামী প্রজন্ম ফিরে পাক নতুন যৌবন ।

ইন্দ্রনীল সান্যাল এর কাহিনী অবলম্বনে সম্রাট মুখোপাধ্যায় এর নাট্যরূপে প্রান্তিক চৌধুরীর নির্দেশনায় এই নাটকের মঞ্চায়ন বাংলা থিয়েটারে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে । অসামান্য অভিনয়ে মঞ্চ দাপিয়েছেন বেলা চরিত্রে অঙ্কিতা ঘোষ, বেলার মা চরিত্রে নিদ্রা ঘোষ, ভগবান ঠাকুর চরিত্রে অজয় ঘরাই, সাইকেল চালক চরিত্রে পার্থ বোস, গিটার বাজিয়ে ও সহ-অভিনয়ে উত্তরণ ব্যানার্জি, ড্রাম বাজিয়ে ও সহ-অভিনয়ে গোপাল দেবনাথ, এবং সর্বোপরি বেলার প্রেমিক সুব্রত সরকার । এছাড়া নাটকের পরিকল্পনায় এই সময়ের বিখ্যাত অভিনেত্রী ন্যান্সি সহ যারা নেপথ্যে কাজ করেছেন তাদের ভূমিকাও অসামান্য ।

মাত্র ২২ মিনিটের এই নাটক আগামী দিনে আরো বহু দর্শকের কাছে পৌঁছে যাক এই শুভেচ্ছা বার্তা প্রেরণ করেছে থিয়েটার ফোরাম ।




Post a Comment

0 Comments