বিজয়কুমার দাস
২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভূমিসুত থিয়েটার । স্বপ্নদীপ সেনগুপ্তের যোগ্য নেতৃত্বে দলটি বাংলা থিয়েটারের মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে থিয়েটার নিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার গুণে । বেশ কিছু ভাল নাটক ভূমিসুত থিয়েটারের প্রযোজনায় মঞ্চে এলেও "চর্যাপদের কবি" নামক নাটকটির প্রযোজনা দলটিকে থিয়েটার দুনিয়ায় বিশেষ ভাবে চিনিয়েছে । "চর্যাপদের কবি" এমন এক প্রযোজনা যা অবশ্যই ব্যতিক্রমী । কারণ যে বাংলা ভাষার জন্য আমাদের গর্ব সেই বাংলাভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের কাহ্ণপাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে এই নাটক । এমন প্রযোজনাকে তাই ব্যতিক্রমী ভাবনার প্রযোজনা বলা যেতেই পারে ।
ভূমিসুত থিয়েটারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ভাল বা ব্যতিক্রমী থিয়েটার মঞ্চে আনার ভাবনা নিয়ে । শুরুটা হয়েছিল বাদল সরকারের "ত্রিংশ শতাব্দী " নাটক দিয়ে । দলের এই প্রথম প্রযোজনাটি অভিনীত হয়েছিল সল্টলেকের রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবনে । পরবর্তীতে সুন্দর, হোলি হ্যা, তিতি, রথের রশি, বাকি ইতিহাস ইত্যাদি নাটক প্রযোজনা করে ভূমিসুত থিয়েটার নাট্যমহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠে । মূলত শ্যামবাজারের এই নাট্যদলের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বরানগর ।
নিজেদের নাটকের প্রস্তুতি পর্বের সংবাদ প্রকাশে আগ্রহী
নাটকের দল অবশ্যই যোগাযোগ করুন
লেখক বিজয় কুমার দাস এর সাথে
যোগাযোগ : ৯৪৩৪৩৭৪৯৭৪
ড্রয়িংরুম থিয়েটারে তেমন আগ্রহী নয় ভূমিসুত থিয়েটার । সন্ধান চলছিল একটা ভিন্ন ভাবনার নাটকের । যে বাংলাভাষায় নাটক করা হয় সেই বাংলাভাষার ইতিহাসকেন্দ্রিক একটা নাটক প্রযোজনার তাগিদ মাথা চাড়া দিচ্ছিল পরিচালক স্বপ্নদীপের মাথায় । শুরু হয় অনুসন্ধান । এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও ভাবনার পর ঠিক করা হয়, ভাষার একেবারে গোড়ার ইতিহাস নিয়ে একটা নাটক করা হবে । অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদকে আশ্রয় করেই নাটক মঞ্চে আনতে মনস্থ করে ভূমিসুত থিয়েটার । নাট্যকার জুলফিকার জিন্না নাটক লেখার দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসেন । সেলিনা হোসেনের "নীল ময়ূরের যৌবন" উপন্যাসটি এক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে ওঠে । নাট্যকার জুলফিকার জিন্নার কলমে ২০১৮ সালে সৃষ্টি হয় "চর্যাপদের কবি" নাটকের পাণ্ডুলিপি । কাহ্ণপা এই নাটকের নায়ক । বাংলা ভাষার জন্য এক অন্ত্যজ মানুষের লড়াই এর কাহিনি । এছাড়া ডোম্ব ডোম্বিনীদের জীবন যাপনের নিখুঁত ছবির পাশাপাশি ভাষার জন্য কাহ্ণর লড়াই এর ছবি ফুটে উঠেছে নাট্যকার জুলফিকার জিন্নার কলমে ।
শুরু হয় প্রস্তুতি । দলের নিজস্ব কক্ষ থাকলেও দলটির মহলা হয় একটি পুরনো ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া নিয়ে । প্রায় পাঁচ ছ মাস টানা রিহারসালের পর তৈরি হয় নাটক । স্বপ্নদীপ সেনগুপ্তের নির্দেশনায় মোহিত মৈত্র মঞ্চে ২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নাটকটি প্রথম অভিনয়ের পরেই দর্শকদের মুগ্ধ প্রতিক্রিয়া অভিভূত করে দলের সবাইকে । ভাষার একেবারে গোড়ার ইতিহাস নিয়ে কাহ্ণপা এর নেতৃত্বে অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের ভাষার জন্য লড়াই এর ইতিহাস বাংলা থিয়েটারে ব্যতিক্রমী ভাবনার নাটক হিসাবে চিহ্ণিত হয় নাটকের দুনিয়ায় ।
নাটকে মোট ২৬ টি চরিত্রের মধ্যে ৮ টি নারীচরিত্র । প্রধান পুরুষ চরিত্রে প্রথমে অভিনয় করেছেন গম্ভীরা ভট্টাচার্য । পরে পূর্ণেন্দু ধর । এ নাটকের একটি চরিত্রের শিল্পী অভিনেত্রী দেবযানী ঘোষ গোটা দুয়েক অভিনয়ের পর আচমকা প্রয়াত হন । সেই মৃত্যুতে থিয়েটার মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে । ভূমিসুত থিয়েটারও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে দেবযানীর আকস্মিক প্রয়াণে । পরবর্তীতে সেই চরিত্রে অভিনয় করেন অভিনেত্রী সমাদৃতা পাল । রথীনার্য চরিত্রে প্রথমে অভিনয় করতেন সমীর বিশ্বাস । বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবে অতিথি শিল্পী হিসাবে অভিনয় করেছিলেন অনীক এর নির্দেশক অরূপ রায় । পরে এই চরিত্রে অভিনয়ে আসেন কলকাতা ইফটা'র নাট্য নির্দেশক দেবাশিস দত্ত । এ নাটকের নির্দেশক স্বপ্নদীপ নিজে অবশ্য অভিনয় করেন না এই নাটকে । নেপথ্যে দায়িত্ব সামাল দেন সৈকত মান্না ( আলো), অভিজিৎ আচার্য (আবহ), কৌশিক সজ্জন (শব্দ প্রক্ষেপণ) দেবব্রত মাইতি ( মঞ্চসজ্জা) । কোরিওগ্রাফিতে প্রসেনজিৎ বর্ধন, কবীর সেন বরাটের সঙ্গে দলের ছেলেমেয়েরা । রূপসজ্জার দায়িত্বেও দলের শিল্পীরাই । বিশিষ্ট নাট্যজন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়, আশিস দাস , নাট্য আলোচক অংশুমান ভৌমিক, নাট্যকার জুলফিকার জিন্না প্রমুখ নাটকটি দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন । পরিচালক স্বপ্নদীপ প্রথম দিকে মধ্যমগ্রাম দর্পণ নাট্যসংস্থা এবং নান্দীকারের ওয়ার্কশপে যুক্ত থেকে থিয়েটারচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছেন । দেবশঙ্কর হালদারের পরিচালনায় "ক্ষমা চাওয়াটাই সোজা" নাটক করার অভিজ্ঞতা তাঁর নাট্যজীবনের ঝুলিতে । পরে নিজে ভূমিসুত থিয়েটার নামে দল গড়েছেন । "চর্যাপদের কবি "রাজ্যের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাভারে নাট্য উৎসবে অভিনীত হয়েও পেয়েছে প্রশংসা ও সম্মান । এছাড়া গঙ্গা যমুনা নাট্য উৎসবে, গোবরডাঙা নকসায়, শান্তিপুর সাংস্কৃতিকের উৎসবেও আমন্ত্রণ পেয়ে মঞ্চস্থ হয়েছে এই নাটক । বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রশংসিত "চর্যাপদের কবি" ভূমিসুত থিয়েটারকে একটা শক্ত মাটিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে । এ নাটকের দীপ্ত উচ্চারণ "আহ্মের মুখের ভাষাই হবে আহ্মের দ্যাশের ভাষা"... কাহ্ণপা এর ভাষার জন্য লড়াই এর এই ইতিহাসকে নিয়ে ভূমিসুত থিয়েটারের "চর্যাপদের কবি" তাই বাংলা থিয়েটারে শুধু ব্যতিক্রমী নয়, ববং একটি দায়বদ্ধ প্রযোজনা ।
0 Comments