মহলা থেকে মঞ্চে, পর্ব - ৮ || গড়িয়া কৃষ্টি প্রযোজনা 'কালপুরুষ' - NEWS THEATRE FORUM




 বিজয়কুমার দাস

বাংলা থিয়েটারে এক অন্যরকম হাওয়া এনেছে গড়িয়া কৃষ্টি নাট্যদল । দলের কর্ণধার পরিচালক ড: সিতাংশু খাটুয়া অধ্যাপনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে । ফিনান্স, ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক এই মানুষটি মনে প্রাণে সাহিত্যপ্রেমী।অবশ্য বাচিকশিল্পী পার্থ ঘোষের তত্বাবধানে শ্রুতিনাটক চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নিবিড়ভাবে । ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নাট্যদল গঠন করে বছর চারেকের মধ্যে থিয়েটার মহলে নজর কেড়েছেন কালজয়ী সাহিত্য অবলম্বনে নাটক মঞ্চস্থ করে । শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের "তুঙ্গভদ্রার তীরে" অবলম্বনে নাটক মঞ্চস্থ করে চমকে দিয়েছিলেন।পরে আন্তিগোনে, তাসের দেশ এবং আরো নজর কাড়লেন সমরেশ মজুমদারের একদা আলোড়ন সৃষ্টিকারী "কালপুরুষ" অবলম্বনে নাটক নির্মাণ করে । কিন্তু কেন সাহিত্য আশ্রয়ী নাটক মঞ্চে আনার ঝুঁকি নেওয়া ?... ড: খাটুয়া জানিয়েছেন, সাধারণত কোন নাট্যকারের লেখা নাটক অথবা বিদেশী উপন্যাস বা বিদেশী নাটক আশ্রিত নাটক প্রাধান্য পায় থিয়েটারের মঞ্চে । কিন্তু এর বাইরে বাংলা সাহিত্যে যে কালজয়ী নানা উপন্যাস আছে আজকের প্রজন্ম হয়তো সেভাবে তার সাথে পরিচিত নয়।অথচ সেখানে নাটকের উপাদান প্রচুর । তাই "তুঙ্গভদ্রার তীরে"র মত ঐতিহাসিক উপন্যাসের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেখা "কালপুরুষ" বেছে নেওয়া ।

নিজেদের নাটকের প্রস্তুতি পর্বের সংবাদ প্রকাশে আগ্রহী

নাটকের দল অবশ্যই যোগাযোগ করুন

লেখক বিজয় কুমার দাস এর সাথে 

যোগাযোগ : ৯৪৩৪৩৭৪৯৭৪


২০১৯ এর১৩ জানুয়ারি প্রথম মঞ্চস্থ হওয়া "কালপুরুষ" নাটক করোনা আবহকে সামাল দিয়েও ২০২২ এর জানুয়ারির মধ্যে ২২ টা শো হয়ে গেছে । এ নাটকের নাট্যরূপও সিতাংশুবাবুর । এ কাজে নামার আগে কাহিনীকার সমরেশ মজুমদারের অনুমোদন নিয়েছিলেন । কিন্তু উত্তরাধিকার,কালবেলা,কালপুরুষ এই ট্রিলজির শেষ উপন্যাসের নাট্যরূপ দিতে গিয়ে তাঁকে যথেষ্ট হিমসিম খেতে হলেও শেষ পর্যন্ত নাট্যরূপ দিয়ে মহলা শুরু করতে পেরেছিলেন।কিন্তু নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর দর্শকরা অভিভূত । এমন কি প্রথম শো তে সমরেশবাবু নিজে হাজির হতে না পারলেও প্রতিনিধি পাঠিয়ে নাটকের সম্পর্কে মতামত সংগ্রহ করে রীতিমত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন । রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়, ঊষা গাঙ্গুলির মত নাট্যজন এ নাটক দেখে প্রশংসা করে গেছেন । প্রথম জীবনে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে বেড়ে ওঠা সিতাংশুবাবুর মনে হত, দেশভাগের পর সম্ভবত সবচেয়ে উল্লেখ্যোগ্য হল নকশাল আন্দোলন । সেই পটভূমিকায় লেখা "কালপুরুষ" নাটকের মঞ্চায়ণ সিতাংশু খাটুয়াকে সুপরিচিত করেছে থিয়েটার মহলে ।



প্রায় ৬ মাস রিহারসালের পর এ নাটক মঞ্চে এসেছিল । ২৭ জন অভিনেতা অভিনেত্রীর মধ্যে দলের ২১ জন।বাকিরা ফ্রীল্যান্সার হলেও প্রত্যেকে কঠোর পরিশ্রম করেছেন এ নাটকের জন্য।এই অভিমত স্বয়ং নির্দেশকের । নির্দেশকের পরিবারের চারজন এই নাটকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন । স্ত্রী (সুপর্ণা), পুত্র(অভিজ্ঞান), কন্যা(গান্ধর্বী) এবং স্বয়ং নির্দেশক অভিনয় ও নানা দায়িত্ব পালন করেছেন।মেয়ে গান্ধর্বী খাটুয়া একজন দক্ষ অভিনেত্রী এবং ঊর্মিমালা নামে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে গান্ধর্বী দর্শক ও নাট্যজনদের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছেন।গান্ধর্বী নান্দীকার দলে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি দেবেশ চট্টোপাধ্যায়,অর্পিতা ঘোষ প্রমুখ নাট্যজনদের সঙ্গেও কাজ করেছেন । নির্দেশক সিতাংশুবাবু অভিনয় করেছেন অনিমেষ চরিত্রে । কালপুরুষ নাটক বিভিন্ন মঞ্চে অভিনীত হওয়ার পাশাপাশি মিনার্ভার জাতীয় নাট্যোৎসবেও আমন্ত্রিত হয়ে অভিনীত হয়েছে ।



   এ নাটক মঞ্চস্থ করতে পেরে নির্দেশক হিসাবে সিতাংশুবাবুর মনে হয়েছে, তুঙ্গভদ্রার তীরে মঞ্চস্থ করে যে সন্তুষ্টি লাভ করেছিলেন কালপুরুষ নিয়ে সেই সন্তুষ্টি অবশ্যই কিছুটা বেশি । আর সেই সন্তুষ্টি থেকেই বুদ্ধদেব গুহর "মাধুকরী" নিয়েও নাটক মঞ্চে এনেছেন । এইসব উপন্যাস অবলম্বনে নাটক মঞ্চে আনা যদিও ঝুঁকির তবু তিনি আগামীতেও কালজয়ী সাহিত্য অবলম্বনে নাটক নির্মাণে ব্রতী থাকতে চান বলে জানিয়েছেন ।

কালপুরুষ নাটকে আলো আবহ মঞ্চসজ্জার বিশেষ ভূমিকা আছে । এক্ষেত্রে এ নাটকের নেপথ্যশিল্পীরা হলেন অভিজ্ঞান খাটুয়া, সৌরভ মুখার্জী (আবহ),সৌমেন চক্রবর্তী (আলো),প্রসেনজিৎ বর্ধন (কোরিওগ্রাফি), মহম্মদ আলি (রূপসজ্জা) এবং সিতাংশু বাবুর তত্ত্বাবধানে সেট ডিজাইনে প্রথা রায় নন্দী,মদন হালদার প্রমুখ।ছেলে অভিজ্ঞান এ নাটকে অর্কর বন্ধু (বিলু) র চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন ।


দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে থাকাকালীন এসবের চর্চার তেমন সুযোগ পাননি । কিন্তু পড়াশুনোর সূত্রে কলকাতায় আসার পর এবং আকাশবাণীতে বাচিক অভিনয়ের চর্চা থেকেই থিয়েটার নিয়ে মেতে ওঠেন অধ্যাপক ড: সিতাংশু খাটুয়া।গড়িয়ায় কৃষ্টিকুঠি নামে নিজেদের মহলাকক্ষ তৈরি করার পর একটি অন্তরঙ্গ নাট্যক্ষেত্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে তাঁর। "কালপুরুষ" নাটক মঞ্চে আনার জন্য এবং নাট্যরূপের জন্য বহু শ্রম দিয়েছেন।বিদগ্ধ মহলে "কালপুরুষ" প্রশংসিত হওয়ার পর আরো নিবিড়ভাবে থিয়েটার নির্মাণ করার ইচ্ছা লালন করছেন তিনি। "কালপুরুষ" তাই তাঁর এবং গড়িয়া কৃষ্টির একটি সাফল্যসূচক মাইলফলক - এই মত থিয়েটারমহলের অনেকেরই।

Post a Comment

0 Comments