মহলা থেকে মঞ্চে || পর্ব - ৯ || ৫০ বছর পর মঞ্চে ফিরল 'ব্যারিকেড', নির্দেশনায় দেবেশ চট্টোপাধ্যায় || NEWS THEATRE FORUM

 

বিজয় কুমার দাস

১৯৭২ সালের ২৫ ডিসেম্বর উৎপল দত্তর পরিচালনায় কলকাতার ইউনিভার্সিটি মঞ্চে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল " ব্যারিকেড " নাটক । তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এই নাটক । সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে "ব্যারিকেড" নাটককে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেছিলেন তৎকালীন সময়ের বিশিষ্টজনেরা । তারপর অনেক জল গড়িয়ে গেছে গঙ্গা আর পদ্মা দিয়ে । রাজিনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে । কিন্তু পঞ্চাশ বছর পরে চাকদহ নাট্যজন সেই নাটককে মঞ্চে এনে যেমন শ্রদ্ধা নিবেদন করল উৎপল দত্তর মত নাট্যনির্মাতাকে, তেমনই মনে করিয়ে দিল পঞ্চাশ বছর পরেও "ব্যারিকেড" এই সময়েও উপযোগী । ১২ ফেব্রুয়ারি সেই স্মৃতিবিজড়িত ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট মঞ্চেই "ব্যারিকেড" ফিরল পঞ্চাশ বছর পর ।

নিজেদের নাটকের প্রস্তুতি পর্বের সংবাদ প্রকাশে আগ্রহী

নাটকের দল অবশ্যই যোগাযোগ করুন

লেখক বিজয় কুমার দাস এর সাথে 

যোগাযোগ : ৯৪৩৪৩৭৪৯৭৪

চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিল চাকদহ নাট্যজনের কর্ণধার সুমন পাল । ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলের বয়স ২০২২ সালে মাত্র পাঁচ । বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের স্নাতকোত্তর চাকদহের সুমন পেশায় স্কুল শিক্ষক । নেশা ভাল থিয়েটার করা । একসময় চাকদহের হ য ব র ল দলের প্রাণপুরুষ ও নাট্যকার চন্দন সেনের সঙ্গে যুক্ত থেকে থিয়েটারের পাঠ নিয়েছেন । পরে নিজেই দল গড়েছে ভাল থিয়েটার করার জন্য । পাঁচ বছরের মধ্যেই বিল্বমঙ্গল কাব্য, ভানুসুন্দরীর পালা, তিন মোহনা, দুই হুজুর, পরদেশী প্রভৃতি নাটক প্রযোজনায় থিয়েটার দুনিয়ায় নিজেদের আসন প্রতিষ্ঠা করেছে । করোনা কালে চাকদহে আঙিনা নামে নিজেদের একটা থিয়েটার স্পেসও প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে ।



কিন্তু কেন "ব্যারিকেড" ?...
এই প্রশ্নের উত্তরে সুমন জানাল, তার একটা গল্প আছে ।গল্পটা এইরকম : ২০২১ এর ২০ ডিসেম্বর "পরদেশী" নাটকের শো ছিল মধুসূদন মঞ্চে । সেদিন সকাল থেকেই মধুসূদন মঞ্চে ছিল সেই নাটকের সারাদিন রিহার্সাল ।হলের কর্মীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল যে, কলকাতা কর্পোরেশনের ভোটে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখে তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে । ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে আলোচনা কানে আসতেই সুমন পালের মনে হয়, পঞ্চাশ বছর আগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তো অনেকটা একই রকম । এই প্রেক্ষাপটে একটা নাটক করার ভাবনা মাথায় আসতেই তার মনে হয় "ব্যারিকেড" নাটকের কথা ।

  এরপর ভাবনা রূপায়ণের কাজ শুরু । বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাট্যজনকে নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করে থাকে চাকদহ নাট্যজন । তাই সুমন পাল ঠিক করে, একটা কম সময়ের ওয়ার্কশপের মাধ্যমেই "ব্যারিকেড" নির্মাণের কাজে নামা হবে । উৎপল দত্ত ফাউন্ডেশনের তরফে অনুমোদনও পাওয়া গেল । শুরু হয়ে গেল নাটক নির্মাণের কাজ । দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে এলেন বিশিষ্ট নাট্য পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায় । দেবেশবাবুর অক্লান্ত পরিশ্রমে একটা ভিন্ন পদ্ধতিতে শুরু হল নাটক নির্মাণের কাজ । প্রথম দিন থেকেই আলো, আবহ, সেট সহ রিহার্সালের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল । পুরো কর্মশালা পদ্ধতিতে নাটক নির্মাণ । চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা অভিনেত্রী নির্বাচনের পর চরিত্রগুলিকে সংলাপ বোঝানো, এক চরিত্রের সঙ্গে অন্য চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝানো, সংলাপ নিক্ষেপের কলাকৌশল শেখানো ইত্যাদির মাধ্যমে নাটক নির্মাণের পদ্ধতি এগোল । জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে ১২ টা দিনভর রিহার্সালে শিল্পী কলাকুশলীদের অক্লান্ত চেষ্টায় নাটক তৈরি হয়ে গেল । কিন্তু নাটকের বিশাল প্রযোজনা ব্যয় সামাল দিতে চাকদহ নাট্যজনের মত একটা মাঝারি মাপের দলের কাছে সাধ্যাতীত মনে হল । তাই এ নাটক মঞ্চে আনার প্রয়োজনে তহবিল গঠনের জন্য খোলা আহ্বান জানানো হয়েছিল । সুমন পাল ভেবেছিল অনেকটাই সুরাহা হবে তাতে । কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি । যদিও কিছু মানুষ সাড়া দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন ।  কিন্তু সেই সংগ্রহ ১০ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ অথচ নাটক মঞ্চে আনার তীব্র জেদ পেয়ে বসল সুমন পালকে । সুমনের মত থিয়েটার পাগলরা হারতে জানে না । তাই নিজস্ব তহবিল থেকে টাকা তুলে "ব্যারিকেড" মঞ্চে এল । সুমন জানিয়েছে, পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায় সহ দলের শিল্পী ও কলাকুশলীরা নাটকটার জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পাশাপাশি সবরকম সহযোগিতা করেছেন । সঞ্জীব সরকার, কমল চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রতেজ সেনগুপ্ত, রাহুলদেব ঘোষ, শৌভিক মজুমদার, মণীশ ভট্টাচার্য, দীপক নায়েক, অদিতি লাহিড়ি, শৈলী দত্ত প্রমুখ শিল্পীরা নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন । প্রায় ৩০ জন অভিনেতা অভিনেত্রী কঠোর পরিশ্রম করেছেন নাটকটার জন্য । আলো মঞ্চ আবহ সবকিছুর মূল রূপকার অবশ্যই দেবেশ চট্টোপাধ্যায় । পাশাপাশি আলোক প্রক্ষেপণে মনোজ প্রসাদ, নামাঙ্কনে হিরণ মিত্র, আবহ নিয়ন্ত্রণে অনিন্দ্য নন্দী, প্রজেকশনে বিক্রমজিৎ বিশ্বাস, পাপেটে সুদীপ গুপ্ত,পোশাক পরিকল্পনায় সঙ্গীতা পাল দায়িত্ব সামলেছেন । সাত লক্ষাধিক টাকা প্রযোজনা ব্যয় সামাল দিতে যদিও চাকদহ নাট্যজন এবং সুমন পাল হিমসিম খাচ্ছে তবু প্রথম শো মঞ্চস্থ হওয়ার পর "ব্যারিকেড" এর তুমুল প্রশংসা দিলের সবার মন ভরিয়ে দিয়েছে ।



পঞ্চাশ বছর আগে "ব্যারিকেড" প্রথম অভিনীত হয়েছিল । সেই নাটক আবার মঞ্চে ফিরল চাকদহ নাট্যজনের প্রযোজনায়।প্রথম দিনের শো দেখতে এসেছিলেন অনেক বিশিষ্টজন । একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরেছেন তাঁরা । 

Post a Comment

0 Comments