বিজয়কুমার দাস
পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটার চর্চায় উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিও যথেষ্ট এগিয়ে । উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু নাট্যদল নিয়মিত নাট্যচর্চার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য নাট্য প্রযোজনার নজির রেখে চলেছে । মালদা জেলার বহু পরিচিত নাট্যদল 'মালদা মালঞ্চ' তেমনই একটি সুপরিচিত নাট্যদল । পরিমল ত্রিবেদীর মত নাট্যপ্রাণ মানুষ এই দলের কর্ণধার । তিনি একাধারে নাট্যকার, নির্দেশক এবং অবশ্যই একজন মঞ্চাভিনেতা । অভিনয়ের জন্য সরকারী বেসরকারী বহু সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছেন । এই দলের বহু উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা আছে । পাশাপাশি লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন শাখাকে অবলম্বন করে মালদা মালঞ্চ কয়েকটি নাটক প্রযোজনা করেছে । আলকাপ গান এবং গম্ভীরা গানকে গুরুত্ব দিয়েও মালদা মালঞ্চ নাটক প্রযোজনা করেছে ।
মালদা জেলার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে গম্ভীরা গান । এই গানকে অবলম্বন করে মালদা মালঞ্চর প্রযোজনা "গম্ভীরা গম্ভীরা" রাজ্যের থিয়েটার মানচিত্রে একটি জনমনজয়ী প্রযোজনা অবশ্যই । দলের কর্ণধার তথা "গম্ভীরা গম্ভীরা" নাটকের নির্দেশক, নাট্যকার পরিমল ত্রিবেদী জানিয়েছেন, গম্ভীরা গানের সঙ্গে তাঁর প্রাণের যোগ । পরিবেশ সূত্রে এবং পারিবারিক সূত্রে তিনি ছোট থেকেই গম্ভীরা গান শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন । গম্ভীরা গান তাঁর রক্তে । এই গানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, মাটির সঙ্গে এবং সময়ের সঙ্গে এই গানের যোগ, এই গানের সুর এবং পরবর্তীকালে গম্ভীরা গানের বিপন্নতা সবই তাঁর চোখে দেখা।তাই এমন একটা বিষয় নিয়ে তিনি নাটক লিখেছেন এবং নাটক প্রযোজনা করেছেন ।
গম্ভীরা গানের শিল্পীরা সমাজের নানা অন্যায়, নানা অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেন । এই গানের প্রচলিত রীতি অনুসারে গম্ভীরা শিল্পীরা এইসব অন্যায়, সামাজিক স্খলন,অসঙ্গতির কথা স্পষ্টভাষায় শিবঠাকুরকে বলে । কিন্তু রাজনৈতিক আগ্রাসন সহ নানা কারণে গম্ভীরা গান কোথায় যেন শিকড়চ্যুত হয়ে যাচ্ছে।হারিয়ে যাচ্ছে গম্ভীরা গানের প্রতিবাদী সুর ।। এসব নিয়েই পরিমল ত্রিবেদী লিখেছেন "গম্ভীরা গম্ভীরা" নাটক । দলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে সে নাটক প্রযোজনা করে ২০১৩ সালের ২০ জুলাই মালদা দুর্গাকিঙ্কর সদনে নাটকের প্রথম শো অভিনীত হওয়ার পরেই প্রযোজনাটি দর্শকদের মন কেড়ে নেয় ।
তারপর পরবর্তী ১০ বছরে এ নাটক ৫০ বার মঞ্চস্থ হয়েছে রাজ্যে এবং রাজ্যের বাইরে । দিল্লী এবং মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে ভারত রঙ্গ মহোৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে এ নাটক মঞ্চস্থ করেছে মালদা মালঞ্চ । বহু বিদেশী দর্শকও এ নাটক দেখে মুগ্ধ হয়েছেন । কলকাতার রবীন্দ্র সদন, পঞ্চম বৈদিক এর নাট্য উৎসবে, পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির আমন্ত্রণে অভিনীত হয়েছে "গম্ভীরা গম্ভীরা" নাটক । এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন জেলার শহর, গঞ্জর মঞ্চেও অভিনীত হয়ে দর্শকমনে মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছে মালদা মালঞ্চ প্রযোজিত "গম্ভীরা গম্ভীরা" ।
নাটকের প্রধান চরিত্র ভুবন পেশায় গম্ভীরা গানের শিল্পী । মনের আনন্দে দলের লোকেদের নিয়ে গম্ভীরা গান গেয়ে বেড়ায় ভুবন ।গানের মাধ্যমে বাস্তবের ছবি তুলে ধরে গম্ভীরা শিল্পী ভুবন । কিন্তু রাজনীতির লোকেরা চায়, ভুবন গানের মাধ্যমে রাজনীতির মহিমা প্রচার করুক । ভুবন রাজী না হলেও দলের কয়েকজন রাজনীতির লোকেদের দেখানো লোভের ফাঁদে পড়ে । ভুবনের দলে সঙ্কট ঘনীভূত হয় । গম্ভীরা গানের শিকড়চ্যুতি ভুবনের হৃদয় চুরমার করে দিলেও রাজনীতির ফাঁদে পা রাখতে চায় না ভুবন । শেষ পর্যন্ত তার পরিবারের নবীন প্রজন্মই ভুবনের গম্ভীরা গানের হাল ধরে ।
ভুবন চরিত্রে আগে অভিনয় করতেন পার্থ আচার্য । পরে এই চরিত্রে অভিনয়ে আসেন বিপ্লব ভট্টাচার্য । ২৪ জন শিল্পী অভিনয় করেন এই নাটকে । তার মধ্যে ৩ জন অভিনেত্রী।সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল এ নাটকে পরিমল সহ তাঁর পরিবারেরই ৯ জন বিভিন্ন চরিত্রে মঞ্চে অবতীর্ণ হয় । পরিমল ত্রিবেদী, তাঁর স্ত্রী বনানী ত্রিবেদী সহ তাঁর দুই পুত্র (জয়রাজ - দেবরাজ) দুই পুত্রবধু,দুই নাতি, ভাইপো এই নাটকে অভিনয় করে বিভিন্ন চরিত্রে । একই পরিবারের ৯ জন অভিনেতা অভিনেত্রীর একটি প্রযোজনায় অভিনয়ের দৃষ্টান্ত সম্ভবত আর দ্বিতীয় কোথাও নেই।সবচেয়ে কম বয়সী অভিনেতা পরিমল ত্রিবেদীর ৬ বছর বয়সের নাতি সোমরাজ । পরিমল নিজে রাজনৈতিক নেতা রঞ্জনের চরিত্রে অভিনয় করে।অবশ্যই এ নাটকের প্রাণ গম্ভীরা গান । গম্ভীরা গানগুলি লিখেছেন নাট্যকার নিজেই এবং গম্ভীরা শিল্পী প্রশান্ত শেঠ।নাটকে গম্ভীরা গানের বাজনদাররা শুধু দলের বাইরের । বিভিন্ন সময়ে নাটকে আলোকসম্পাতের দায়িত্ব পালন করেছেন ফারাক্কার প্রশান্ত ঘোষ, কলকাতার জয়ন্ত মুখার্জী এবং বালুরঘাটের বিশ্বজিৎ রবিদাস ।
নিজেদের নাটকের প্রস্তুতি পর্বের সংবাদ প্রকাশে আগ্রহী
নাটকের দল অবশ্যই যোগাযোগ করুন
লেখক বিজয় কুমার দাস এর সাথে
যোগাযোগ : ৯৪৩৪৩৭৪৯৭৪
কলকাতা থেকে অনেক দূরে থেকেও পরিমল ত্রিবেদী রাজ্যের থিয়েটারের মানচিত্রে নিজের আসনটি সুদৃঢ় করেছেন ভাল নাটক প্রযোজনার গুণেই । "গম্ভীরা গম্ভীরা" তাই মালদা মালঞ্চর একটি গর্ব করার মত প্রযোজনা ।
0 Comments