চলে গেলেন বাংলা নাট্যসাহিত্যের এক নিভৃত সেবক মনোরঞ্জন বিশ্বাস - NEWS THEATRE FORUM


মনোরঞ্জন বিশ্বাস । জন্মেছিলেন ওপারে দর্শনায় । ১৯২৪-এ । এপারের রানাঘাট লালগোপাল পাল হাইস্কুল, সেকালের রিপন অধুনা সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ও কৃষ্ণনগর কলেজ পার হয়ে স্নাতক । স্নাতক হয়েই সংসার সংগ্রামে নেমে পড়া । ছিলেন সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার কর্মী। কিন্তু সে যদি পেশা হয়, আজীবন কলাচর্চা ছিল ধ্যানজ্ঞান । কলেজের ছাত্র থাকাকালীন নাটক রচনার সূত্রপাত । প্রথম নাটক কর্মখালি । নাটক লিখেই প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন প্রখ্যাত নাট্য সমালোচক সাধন ভট্টাচার্য ও অজিতকুমার ঘোষের। নাট্যরচনা তো ছিলই,তার সঙ্গে চিত্রকলা ও সংগীত সাধনা ছিল সঙ্গী । পাশাপাশি বাম মতাদর্শের রাজনীতি, কৃষক আন্দোলন, সেই সূত্রে জেলখাটা।


ভিতরের বামপন্থী দর্শন আর শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতায় নামলেন কৃষকের সঙ্গে মাঠে, আন্দোলনে জমি ও ধানের লড়াইয়ে । সেই লড়াইকে তিনি মাঠ থেকে পৌঁছে দিলেন মঞ্চে। মঞ্চ থেকে মানুষের মধ্যে । একই সঙ্গে রাজনীতি, আন্দোলন ও সংস্কৃতিচর্চা। পটভূমি হলো রাজারহাট থানা ও বাগুইআটি অঞ্চল । চলতিবাসর-সংস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শুরু হলো সংস্কৃতি-যাত্রা । সময়টা পাঁচের দশকের গোড়ার কথা । হলেন পার্টির সদস্য । ধরলেন কলম । শুরু হলো একের পর নাটক রচনা । একে একে লিখলেন— আমার মাটি, আবাদ, ঝড়ের কাছাকাছি, পদাতিক, রণক্ষেত্রে আছি, সারা আকাশ লাল, কমিউনার্ড,নিষিদ্ধ ভাত নিষিদ্ধ অস্ত্র, সব যুদ্ধ থেমে গেলে, শাদা অন্ধকার, দাদন, আসন্ন যুদ্ধের সামনে, ভাসান, জননী, ভাঙা কাস্তের গান, বেঁচে থাকার দরজা,প্রতিদিন মে দিবস, একমাত্র অস্ত্র, খাস দখল, কাছেই সমুদ্র, লাল নীল মাছ-এর মতো প্রায় অর্ধশতাধিক মঞ্চ ও শ্রুতি নাটক । মনোরঞ্জন বিশ্বাস বাংলা নাট্যসাহিত্যের এক নিভৃত সেবক । বড়ো নিভৃতচারী শিল্পী। বড়ো অভিমানী হৃদয় । মতাদর্শের সামান্যতম ক্ষয় দেখলেই তিনি সরে আসতেন নিজের মনের কাছে । একাকীত্বে ।


মনোরঞ্জন বিশ্বাস নাটক রচনার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন । তবে মনে প্রাণে তিনি নাটকের কাছে যেন দায়বদ্ধ। করেছিলেন সম্পাদকের কাজও । নন্দন সাহিত্য পত্রিকার আত্মপ্রকাশ পর্বের সম্পাদক । কিন্তু আদর্শের সঙ্গে কোন আপোষ না করা মানুষটা আদর্শের দ্বন্দ্বে বারে বারে নতুন নতুন পত্রিকায় করেছেন আত্মপ্রকাশ । কার্টেন, চারণ, সপর্য্যা, পূর্বদেশ, সবশেষে আরণিক—একের পর এক পত্রিকা বেরিয়েছে তাঁর হাত দিয়ে ।  তবু শতাব্দী ছুঁই ছুঁই মানুষটার চিন্তা ও কলমে সময়ের ক্লান্তি কোন জং ধরাতে পারেনি । গত অক্টোবরে বেরিয়েছিল আরণিকের আপাত বর্তমান সংখ্যা । স্বপ্ন ছিল ধর্ম-দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে আরণিকের পরের সংখ্যা করা । স্বপ্নের লাটাইটা আমাদের হাতে দিয়ে চলে গেলেন ২১.০১.২২ এর দুপুরে । সদ্য জ্যেষ্ঠপুত্র হারানোর ব্যথাভার বুঝি নিতে পারলেন না আর ।


'নাট্যচিন্তা'র পক্ষ থেকে শ্রী রথীন চক্রবর্তী ও শ্রীমতী তন্দ্রা চক্রবর্তী জানান,

নাট্যকার, সংস্কৃতি-কর্মী মনোরঞ্জন বিশ্বাস আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, কিন্তু আমরা যেন দায়ী হয়ে থাকলাম তাঁর সমগ্র রচনা একত্রিত করে একটা সংকলন প্রকাশ করার । সেটাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানোর শেষ একটা সুযোগ ।।

Post a Comment

0 Comments