মহলা থেকে মঞ্চে, পর্ব - ৫ বহরমপুর ঋত্বিক এর প্রযোজনা 'গোরা' - NEWS THEATRE FORUM


বিজয়কুমার দাস :  রাজ্যের থিয়েটার মানচিত্রে বহরমপুরের ঋত্বিক নি:সন্দেহে একটি গর্বের স্থান অধিকার করে আছে । এমন সুসংহত ও সংগঠিত নাট্যদল থিয়েটারের জগতের অহঙ্কার বলা যায় । দলের নানা চিত্তজয়ী প্রযোজনা এই নাট্যদলকে একটি গৌরবের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেছে।নাট্য নির্মাণ, বর্ষ উদযাপনের পাশাপাশি নাট্য বিষয়ক আলোচনা, বার্ষিক নাট্য কর্মশালা সহ ২০ বছর ধরে বহরমপুরে দেশ বিদেশের নাট্যমেলা ঋত্বিক দলের মুকুটে গৌরবের পালক সংযোজন করেছে । বাংলাদেশের শিল্পকলা আকাদেমিতে, নেপালে আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবেও যোগ দিয়েছে ঋত্বিক । এই দলের নানা প্রযোজনার মধ্যে অবশ্যইএকটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে  দলের ৪৩ তম বর্ষে রবীন্দ্রনাথের অমর সৃষ্টি "গোরা" উপন্যাস অবলম্বনে  নাট্যনির্মাণ । সম্প্রতি এই দলের ৪৫ তম প্রযোজনা "গোরা" নাটক দেখে এমন প্রযোজনায় চমকে উঠতে হয়েছে । মঞ্চসজ্জা নাট্যরূপ,আবহ, আলো,অভিনয়ের রসায়নে এ এক অনন্য প্রযোজনা । যা কখনোই পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে রবীন্দ্র ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে নাট্যনির্মাণ নয় - বরং রবীন্দ্র মানসকে যথাযথ সম্মান দিয়ে ঋত্বিক এ নাটক নির্মাণ করেছে বিপ্লব দে'র নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় ।  

১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঋত্বিক এর আগে ১৯৯২ সালে গৌতম রায়চৌধুরীর নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় এ নাটক মঞ্চে এনেছিল । গৌতমবাবু তাঁর জীবনকালে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর পত্র, চতুরঙ্গ, ক্ষুধিত পাষাণ, গোরা নাটকের নাট্যরূপ দিয়ে ঋত্বিক এর প্রযোজনায় মঞ্চস্থও করেছিলেন । গোরা নাটকের সেই প্রযোজনাও দর্শকবন্দিত হয়েছিল । তবে সেই প্রযোজনার অভিনয়ের সময়কাল ছিল দু ঘন্টার অধিক । 

নিজেদের নাটকের প্রস্তুতি পর্বের সংবাদ প্রকাশে আগ্রহী

নাটকের দল অবশ্যই যোগাযোগ করুন

লেখক বিজয় কুমার দাস এর সাথে 

যোগাযোগ : ৯৪৩৪৩৭৪৯৭৪

তারপর বহরমপুরের গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল।সময় বদলেছে।রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে । রাজনৈতিক নানা ঘটনা দুর্ঘটনায় আলোড়িত হয়েছে মানুষের জীবন । কিন্তু ঋত্বিক ভাল নাটক প্রযোজনার লক্ষ্যে অবিচল থেকেছে।ঋত্বিক এর বিপ্লব দে'র মনে হয়েছিল, গোরা নাটককে তো আবার মঞ্চে আনা যায় ।  যখন দেশপ্রেম, জাতিপ্রেম, জাতীয়তাবাদ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানা প্রশ্ন তখন রবীন্দ্রনাথই তো আলোকবর্তিকা । ইতিমধ্যে  রবীন্দ্রনাথের "জাতীয়তাবাদ" নিবন্ধ সহ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন, অধ্যাপক বিশ্বজিত রায় প্রমুখের কিছু লেখা পড়ে উদবুধ হয়ে "গোরা" উপন্যাস নিয়ে আবার ভাবনাচিন্তা শুরু করল বিপ্লব দে । নতুন করে  সময়ের নিরিখে জাতীয়তাবাদকে এবং রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হল বিপ্লব দে 'র নাট্যরূপ ।  নাট্যরূপে প্রাধান্য পেল রবীন্দ্রনাথের ভারত ভাবনা । উগ্র স্বদেশীয়ানা, অন্ধ জাতীয়তাবেগ, হিংসা, দ্বেষ এর নিয়ত চর্চার বিপরীতে বিশ্বমানবতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধকে গুরুত্ব দেওয়া হল নাটকে।এরপর শুরু মহলা । দলের সবাই খুশি এই উদ্যোগে । মোহিতবন্ধু অধিকারী,তরুণ সরকার,তনিমা অধিকারী প্রমুখ  দলের সবাই নতুন উদ্যমে নেমে পড়ল "গোরা" র নবরূপায়ণে । নির্দেশকের দায়িত্বেও বিপ্লব দে । 


প্রায় সাত মাস ধরে চলল মহলা । ২০১৯ এর ৯ ডিসেম্বর "গোরা" নবরূপে মঞ্চে এল । জয় করে নিল দর্শকের মন । মঞ্চভাবনায় মুন্সীয়ানা, আলোর যথাযথ ব্যবহার, উপযোগী আবহের প্রয়োগে "গোরা'' নতুন করে ভাবাল দর্শকদের । ৮০-৮৫ হাজার টাকা প্রযোজনা খরচে নির্মিত এই নাটক নৈহাটি,কলকাতা (নাট্য আকাদেমির নাট্যমেলায় রবীন্দ্র সদনে), বহরমপুর সহ যেখানেই মঞ্চস্থ হয়েছে সেখানেই দর্শকবন্দিত হয়েছে এই ধ্রুপদী প্রযোজনা ।কলকাতার রবীন্দ্র সদনে মহানগরীর বহু বিশিষ্ট নাট্যজনের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার দলের নাট্যসচেতন দর্শক এই প্রযোজনায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন । বিপ্লব দে নিজে অভিনয় করেছেন গোরা চরিত্রে । অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে মোহিতবন্ধু অধিকারী (পরেশবাবু), তরুণ সরকার (বিনয়), পার্থপ্রতিম দাস (পানুবাবু), শিপ্রা সেন (সুচরিতা), মহুয়া চক্রবর্তী (ললিতা), তনিমা অধিকারী (আনন্দময়ী) সহ প্রত্যেক শিল্পীর অনবদ্য অভিনয়ের পাশাপাশি শ্যামাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলো, স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবহ,  সন্দীপ সুমন ভট্টাচার্যের মঞ্চ নাটক উপযোগী অবশ্যই ।  "গোরা" তাই ৪৩ বছরের ঋত্বিক নাট্যদলের এক অবিস্মরণীয় প্রযোজনা ।

Post a Comment

0 Comments