' গনশা রে…' - দুঃসময়ে জলপাইগুড়ি রবীন্দ্রভবনে 'কলা-কুশলী’র পালা - NEWS THEATRE FORUM



 গনশা রে

তপতী বাগচী


দেব গণেশ বিঘ্ননাশকারী,বুদ্ধি ও জ্ঞানের দেবতা রূপে পূজিত হন।তিনি সিদ্ধিদাতা । কিন্তু  কাশিয়াবাড়ির গনশা তো তা নয়।সে বরং বুদ্ধিতে একটু খাটোই। দেখতে বড়সড় ।তার খিদেও একটু বেশী। তাকে  ক্ষেপিয়ে সবাই মজা দ্যাখে।পার্বতী আর মহাদেবের ভারী চিন্তা, এ ছেলে নিয়ে তারা কি যে করে !সে পড়াশোনা বা চাষের কাজ কিছুইতো শিখে উঠতে পারছেনা।

তাকে নিয়েই জলপাইগুড়ির কলাকুশলী র সাম্প্রতিক পালা গনশা রে।  উত্তরবঙ্গের স্থানীয় ভাষা রাজবংশীতে ছন্দে বাঁধা সংলাপ , ভাওয়াইয়ার আঙ্গিকে গান এবং তিন সূত্রধারের কথকতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে বর্তমান  সামাজিক সমস্যার কিছু নির্মম  রূপ।

থিয়েটার সংক্রান্ত বই কিনতে চান ?

দেখে নিন বুকলিস্ট, অর্ডার করুন অনলাইনে


যে শিশুটি যেমন তাকে সেভাবেই গ্রহণ করার ধৈর্য্য বা ইচ্ছে এই সমাজের আজ  আর নেই।ছাঁচে ঢুকিয়ে তাকে  তৈরী করতেই হবে , “…just another brick in the wall ”  



চারদিকে সুখের হাতছানি,নিজেরা তো পারলামনা,তাই সন্তানই হয়ে উঠুক সেই সুখ পেড়ে আনার জাদু-আঁকশী।আমাদের মাথা উঁচু করে দিক সে।আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যে, সামাজিক পদমর্য্যাদা্র কারণে যারা আমাদের তুচ্ছ করেছে এতদিন তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে বলতে চাই যে দ্যাখ কেমন লাগে তাতে যদি অনৈতিক অসৎ পথ নিতে হয়,এজেন্ট বা দালালের হাত ধরতে হয় তাতেও আপত্তি নেই।কারণ আমরা জেনে ফেলেছি সাফল্যের মত সফলতা আর নেই। 

আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব পুড়িয়ে সন্তানের দু পায়ে ঢেলে দিতে হয়।দৌড় জন্মানোর আগেই ছুটে চলে আসে ট্র্যাক।আমরাও রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে পড়ি স্টার্টিং পয়েন্টে,ট্রিগার টানার অপেক্ষায়।টার্গেট, শুধু টার্গেট। সন্তানের  ভাবনা-জগত গড়ে তোলার দায় নিলামনা, ব্যার্থতাকে সহজভাবে মেনে নেবার মানসিক শক্তি সন্তানকে দিতে পারলামনা।কত শৈশব হারিয়ে গেল এভাবে ,সমাজ সেদিকে ফিরেও তাকালনা।

সাধারণ মানুষ নূতন নূতন প্রযুক্তির ব্যবহার শিখেছে।মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার আর অচেনা নয় তাদের কাছে।কিন্তু কুসংস্কারের মূল এখনো বিদ্ধ হয়ে আছে অনেক গভীরে।এজেন্ট মদনরা এভাবেই করে-কর্মে খাচ্ছে।ধর্ম-ব্যবসা তাই সবচেয়ে লাভজনক এখনো।এসত্য বর্তমান নাটকের সমান্তরাল বিষয়।এর চার পাশে ছড়িয়ে আছে আরো  সমস্যার  সূক্ষ্ম বিস্তার,বাস্তব জীবনের মতই। প্রলোভনের শিকার হয়ে চালাকীর আশ্রয় নেয়া,অসদুপায়ে অর্জিত স্বাচ্ছন্দ্য হারানোর উৎকন্ঠা,স্নেহ-মমতার মত সুকুমার প্রবৃত্তি বলি দিয়েও ভোগবাদী জীবনের কাছেই আত্মসমর্পণ ইত্যাদি। 

সহজ স্রোতে বয়ে গিয়েছে গনশার কাথা। ইঞ্জেকশন দিয়ে বুদ্ধি বাড়ানোর লোভ দেখিয়ে এজেন্ট এসে নিয়ে যায় গনশাকে।বুদ্ধির বদলে বাড়ে তার কান আর নাক।দেখতে তাকে সিদ্ধিদাতার মতই লাগে।তাকে ব্যবহার করে  প্রণা্মী কুড়োয় বাবা-মা।ঘর ভরে ওঠে।তাদের লোভও বাড়ে।রাজনৈতিক নেতা তা্র হয়ে সভা করতে নিয়ে যেতে চায় গনশাকে। কিন্তু গনশার এসব কিচ্ছু ভাল লাগেনা। সে মানুষ হয়েই থাকতে চায়।স্বাধীন ভাবে মাঠে জঙ্গলে খেলে বেড়াতে চায়। তার কান্না কেউ শোনেনা।মা-বাবা এবং এজেন্টের চাপে তার দমবন্ধকর আসহায়তা মন্দবুদ্ধি গনশা খুব একটা প্রকাশ করতে পারেনা।মানসিক যন্ত্রণায় সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। জ্বরে তার শরীর পুড়ে গেলেও সত্য-প্রকাশের ভয়ে কেউ ডাক্তার ডাকেনা।মা-বাবার চোখের সামনেই তার মৃত্যু ঘটে গেলে এজেন্ট এর বুদ্ধিতে সেখানে তৈরী হয় গণেশ বাবার থান।

 ‘কাথা শুধু কাথা না হয়,তার ভাঁজে ভাঁজে অনেক শিক্ষা থাকে।তার কণা মাত্র আত্মস্থ করতে পারলেও সমাজের কল্যাণ।পালাশেষে দোতরার সঙ্গতে ভাওয়াইয়ার সুরে অনিন্দিতা রায় এর কন্ঠে এই করুণ আবেদন মঞ্চে ভেসে বেড়ায় ।

এজেন্ট মদন এর চরিত্রটি একজন আধুনিক সেলসম্যানের  নির্য্যাস। মানুষকে প্রথমে লুব্ধ করা,পরবর্তীতে স্বরূপ প্রকাশ করে তাদের দুর্বলতাকে স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহার করার আধুনিক কৌশল।অপূর্ব সাহা সেই চরিত্র রূপায়ণে কোনো খামতি রাখেননি।ব্যক্তিগত ভাবে আমি তাঁর অভিনয়ের ভক্ত।কলা-কুশলীর পূর্ববর্তী প্রযোজনা, কিছু ফিল্মী বাতচিতএ ওঁর একক অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছি।দুটি চরিত্রের ম্যানারিজম কিছু কিছু অংশে একই রকম বলে মনে হল আমার।যদিও এতে বর্তমান নাটকের রসগ্রহণে কোনো অসুবিধে হবার কথা নয়।


মা-বাবার ভূমিকায় সুতপা সেনগুপ্ত এবং নীলাঞ্জন গুহ তাঁদের চরিত্রে যথাযথ।  শিশুশিল্পী অন্বয় রায় এর অনায়াস অভিনয় গনশার সহজসারল্য আত্মস্থ করেছে । গনশার বন্ধু খোকনের চরিত্রে অল্প সময়ের জন্য হলেও শিশু-শিল্পী অহন রায় দর্শকের নজর কেড়েছে।নির্দেশক তমোজিৎ নিজেও একজন ভাল অভিনেতা। তিন সূত্রধার তাঁদের নাচ গান কথায় কুশলতার সঙ্গে নাটকের ঘটনা-সূত্র ধরে রেখেছেন।পালাশেষে দর্শকের অন্তরে গনশা রে …’ এই হুতাশ যেন আপনি উঠে আসে।

স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কাহিনীকে নাট্যরূপ দিয়েছেন নির্দেশক তমোজিৎ রায় নিজেই।দোতরা, হারমোনিয়ম,বাঁশী , ঢোল ব্যবহৃত হয়েছে আবহে। এই নাটকে সঙ্গীতাংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দখল করে আছে।এবং সেই ভূমিকা যথাযথ পালন করেছেন সৌভিক ধর,শান্তনু সাহা,দীপংকর রায়, অনিন্দিতা রায় এবং তমোজিৎ রায়। 


এই দুঃসময়ে জলপাইগুড়ি রবীন্দ্রভবনের পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ আরো একবার কলা-কুশলী র গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেছে। এর প্রত্যেক সদস্যের প্রতি আমার অশেষ শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। 


Post a Comment

0 Comments