বিজয়কুমার দাস
রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য ধর্মমঙ্গল।বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য মঙ্গলকাব্য।বিরাট প্রেক্ষাপট।এ কাহিনির নায়ক লাউসেন।স্বর্গের নৃত্যসভায় নর্তকী জাম্ববতীর তাল ভঙ্গ হওয়ায় শাপভ্রষ্ট হয়ে তিনি মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করেন বেণুরায়ের কন্যা হিসাবে।নাম রঞ্জাবতী।রঞ্জাবতীর বড়দি গৌড়েশ্বরের পাটরানী।আর বড় ভাই মহামদ গৌড়েশ্বরের মন্ত্রী।ঢেকুরগড়ের অধিপতি কর্ণসেন গৌড়েশ্বরের অধীনে এক সামন্ত রাজা।গৌড়েশ্বরের আর এক সামন্ত রাজা ইছাই ঘোষ।চন্ডীর বরপুত্র ইছাই বিদ্রোহী হয়েছিল গৌড়েশ্বরের বিরুদ্ধে।তাঁকে দমন করতে গিয়ে কর্ণসেন হলেন পরাজিত।তাঁর ছয় পুত্র,, পুত্রবধুরাও নিহত।এই শোকার্ত কর্ণসেনের সঙ্গে গৌড়েশ্বর নিজ শ্যালিকা রঞ্জাবতীর বিয়ে দিলেন।বিয়ের পর কর্ণসেন ময়নাগড়ে নতুন সামন্ত রাজা হলেন।কিন্তু মহামদ এই বিয়ে মেনে নিলেন না।অবশ্য কর্ণসেন-রঞ্জাবতীর পুত্র লাউসেনের কাছে হার মানলেন মহামদ।প্রতিষ্ঠিত হল ধর্মরাজ্য।ধর্মঠাকুরের তপস্যা করে রঞ্জাবতী পুত্ররূপে পেয়েছিলেন লাউসেনকে।
এই বিশাল প্রেক্ষাপটকে নিয়ে নাটক প্রযোজনা করে চমকে দিয়েছে লাভপুরের বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী।এ নাটক গড়ে তোলারও একটা প্রেক্ষাপট আছে।২০১১ সাল থেকে লাভপুরে সংস্কৃতি বাহিনী লোকসংস্কৃতি উৎসবের আয়োজন করত।সেই উৎসবে যোগ দিত জেলার বাউল, বহুরূপী,রায়বেঁশে,রণপা শিল্পী,ঢাকি,ঢুলিরা।একবার নাট্যব্যক্তিত্ব মণীশ মিত্র এই উৎসবে এসে এত লোকশিল্পীর সমাবেশ দেখে দলের কর্ণধার উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়কে পরামর্শ দেন এই লোকশিল্পীদের নিয়ে একটা কাজ করতে।
১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ভাল প্রযোজনা করেছে।২০১৫-১৬ সালে শুরু হল লোকশিল্পীদের নিয়ে নাটকের ভাবনা।সমস্ত লোকশিল্পী ও দলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বৈঠকে লোকশিল্পীরা সম্মতি জানালেন।সাহস জোগালেন এলাকার সুপরিচিত কার্তিক দাস বাউল।শুরু হল নাটক লেখা।অবশেষে প্রাধান্য পেল ধর্মমঙ্গল।লাভপুরের তারাশঙ্কর ভবনে মহলা শুরু।নাটক শুনে সবাই খুশি।মহলা চলত সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত।সেখানেই সবার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হত।৬০ জন শিল্পীকে নিয়ে তৈরি হল ভূমিকালিপি।তার মধ্যে ৩০ জন লোকশিল্পী আর ৩০ জন দলের ছেলেমেয়ে।চার মাস চলল রিহারসাল।ক্লোজডোর অভিনয় হল তারাশঙ্কর ভবনেই।এরপর ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট লাভপুর অতুলশিব মঞ্চে প্রকাশ্যে অভিনয় উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়ের রচনা ও নির্দেশনায় "ধর্মমঙ্গল " নাটক।চমকে গেলেন উপস্থিত লাভপুরের দর্শক ও বীরভূমের নাট্যজনেরা।
" ধর্মমঙ্গল" এর সেই জয়যাত্রা এখনো চলছে।লাভপুরের পরেই কলকাতার রবীন্দ্র সদন মঞ্চে।বহু বিশিষ্ট অতিথি ও রাজধানীর নাট্যজনদের দ্বারা আবার সমাদৃত।তারপর থেকে জেলার বিভিন্ন শহরে, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এবং রাজ্যের বাইরে মঞ্চস্থ হয়েছে এ নাটক।ডাক এসেছে জাতীয় নাট্য উৎসবে।
অভিনীত হয়েছে রাজ্যের বাইরে পুরী, ভূপাল, রাউরকেল্লা, ভুবনেশ্বরে । ভূপালে আদি বিদ্রোহী নাট্য উৎসবে ও রাউরকেল্লায় নবোদিত নাট্য উৎসবে । বীরভূমের লাভপুর, ধনডাঙা, বিষয়পুর,সাহোড়ার লোকশিল্পীরা বিভিন্ন ভূমিকায় দাপিয়ে অভিনয় করে এ নাটকে। বহুরূপী, বাউল, রায়বেঁশে, ঢাকি, ঢুলিরা নানা সাজে,বাদ্যে, গানে, শারীরিক কসরতে নাটক জমিয়ে দেয় । পাশাপাশি দলের শিল্পীরাও বিভিন্ন চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের নজির রেখেছে । নাটকের মঞ্চভাবনায় কাজী মেহবুব ইসলাম, আবহে কার্তিক দাস বাউল, আলোয় খাইরুল ইসলাম,পোশাক পরিকল্পনায় রূপা সুতার,অণ্বেষা ঘোষ, আবহ নিয়ন্ত্রণে কাজল মুখার্জী প্রশংসনীয় দায়িত্ব পালন করেছে।লাউসেনের চরিত্রে অভিনয় করে নির্দেশক উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় এবং মহামদের চরিত্রে সুব্রত চট্টোপাধ্যায়।রূপা,অন্বেষা সহ দলের ৮ জন অভিনেত্রী অভিনয় করেছে এ নাটকে । নির্দেশক উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় জানালেন, দলের ছেলেমেদের পাশাপাশি লোকশিল্পীদের কঠোর পরিশ্রম ছাড়া এ নাটক সম্ভব হত না।বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনীর "ধর্মমঙ্গল" তাই যথার্থই সাহসী অথবা দু:সাহসী প্রযোজনা ।
নিজেদের নাটকের প্রস্তুতি পর্বের সংবাদ প্রকাশে আগ্রহী
নাটকের দল অবশ্যই যোগাযোগ করুন
লেখক বিজয় কুমার দাস এর সাথে
যোগাযোগ : ৯৪৩৪৩৭৪৯৭৪
0 Comments