নাট্য পরিবারে মামলার নিষ্পত্তি কবে ? কী চায় বাংলা থিয়েটার ? কেন হয়েছিল মামলা, জানুন বিস্তারিত - NEWS THEATRE FORUM

 

পৃথ্বীশ রানা  ★  সত্য জিৎ  ★  ব্রাত্য বসু

রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তথা নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রী ব্রাত্যব্রত বসু একজন সাধারন নাট্যকর্মী সত্য জিৎ বিরুদ্ধে একটি মামলা করে রেখেছেন ২০১৮ সাল থেকে । বিভিন্ন সময়ে এই আলোচনা ঘুরেফিরে রাজ্যের নাট্যকর্মীদের মুখে মুখে আলোচিত হলেও সময়ের নিয়মে আবার তা হারিয়েও যায় । নতুন বছরের শুরুতেই বাংলা থিয়েটার জগতে আনন্দের খবর নিয়ে এসেছে নাট্যকার ব্রাত্য বসু মহাশয় এর সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার প্রাপ্তির খবর । স্বভাবতই পাশাপাশি আবারও ঘুরেফিরে একটি প্রশ্ন আসছে, যে নতুন বছরে কি আদৌ একজন নাট্যকর্মীর বিরুদ্ধে করা মামলার নিষ্পত্তি হবে ? বাংলা থিয়েটারের প্রবীণরা কি মুখ খুলবেন এই বিষয়ে ?


জেনে নেওয়া যাক ঠিক কী ঘটেছিল সেইদিন, যে কারণে রাজ্যের মন্ত্রী তথা স্বনামধন্য নাট্যব্যক্তিত্ব এক সাধারন নাট্যকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা ঘোষণা করলেন ।


'দিনটা ছিল ২০১৮ সালের কোনো এক রবিবার সকাল । নাট্যকর্মী সত্য জিৎ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতোই নাটকের খবর প্রচার করার জন্য ফেসবুক খুলতেই চোখে পড়ে বেশকিছু ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট । অসংখ্য মানুষ নাট্যকার ব্রাত্য বসু সম্পর্কে কিছু মতামত পোষণ করছিলেন তাদের ফেসবুক টাইমলাইনে । সত্য জিৎ বারবার স্ক্রল করে করে প্রত্যেকের পোস্ট পড়ে বোঝার চেষ্টা করেও যখন সে আসল কারণটি বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন তাঁর পরিচিত এক নাট্যকার এর কাছে ফোন করে জানতে চান ঠিক কি কারণে মানুষ ব্রাত্য বসু সম্পর্কে এই ধরনের পোস্ট লিখছেন ?


সেই নাট্যকার তখন তাকে একটি ইউটিউব লিংক সত্য জিৎ এর হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে পাঠান । লিংক ক্লিক করা মাত্র সত্যজিতের কাছে একটি ভিডিও চালু হয় যেখানে দেখা যায় মাননীয় নাট্য ব্যক্তিত্ব তথা রাজনৈতিক কর্মী ব্রাত্য বসু তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায় একটি জনসভায় বক্তব্য রাখছেন । ভিডিওটি খুব মনোযোগ সহকারে শোনেন । এরপর সত্যজিতের মনে হয় একজন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব তিনি তার রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য রাখছেন, সেই বক্তব্য থিয়েটারের অসংখ্য মানুষদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়া কাম্য । কারণ সত্য জিৎ মনে করেন, থিয়েটার 'দলীয় রাজনীতি'র উর্ধ্বে হলেও কখনোই সামগ্রিক 'রাজনীতি'র উর্ধ্বে নয় । তাই একজন নাট্যব্যক্তিত্ব তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ ঠিক কী রকম তা জানতে পারলে আমাদের সাধারন থিয়েটার কর্মীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ।


সত্যজিৎ সেই ইউটিউব লিংকটি তাদের দ্বারা পরিচালিত 'নাটকের শো (কবে,কথায়)'Click Here নামক ফেসবুক গ্রুপে শেয়ার করেন । প্রসঙ্গত সত্য জিৎ জানিয়েছেন, তিনি কোনো ভিডিও আপলোড করেননি । শুধুমাত্র ইউটিউব থেকে পাওয়া একটি লিংক তিনি শেয়ার করেছিলেন । যে ইউটিউব চ্যানেলের ওই ভিডিওটি আপলোড করা হয়েছিল সেই চ্যানেলটির সঙ্গে তাঁর বা তাঁর দলের ব্যক্তিগতভাবে কোন যোগাযোগ বা পরিচিতি নেই । অর্থাৎ একটি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে লিংক নিয়ে আরেকটি সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করা হয়েছে মাত্র । শুধুমাত্র সত্যজিৎ ছাড়াও এই লিংকটি ইউটিউব থেকে নিয়ে কয়েক হাজার মানুষ দেখেছিলেন এবং শেয়ার করে ছিলেন ।

কিন্তু ব্রাত্য বসু মহাশয় কয়েক হাজার মানুষকে বাদ দিয়ে একমাত্র সত্যজিতের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন । তার প্রথম টার্গেট ছিল এই ভিডিও শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে । সত্যজিৎ ভিডিওটি শেয়ার করার দু'দিনের মধ্যেই তার কাছে ব্রাত্য বসু একটি উকিলের নোটিশ পাঠান । যে নোটিশে উল্লেখ করা ছিল এই ভিডিওটি নাট্যকর্মী সত্য জিৎ বিকৃত করে আপলোড করেন এবং ভুলভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন । নোটিশে আরো উল্লেখ করা হয় পরবর্তী ৭২ ঘন্টার মধ্যে উপযুক্ত উত্তর লিখিতভাবে পাঠাতে হবে অন্যথায় মামলা করা হবে ।

সত্যজিৎ, ব্রাত্য বসুর উকিলের চিঠি পাওয়া মাত্রই লিখিতভাবে যথাসময়ে ইমেইল এবং স্পিড পোস্ট (প্রমান আছে) এর মাধ্যমে তার উত্তর লিখে পাঠিয়ে দেন । সত্যজিৎ সেখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেন, তার বিরুদ্ধে যে ভিডিও বিকৃতির অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন । কারণ ভিডিও যদি বিকৃত করা হয়ে থাকে তবে এ-কাজ তিনিই করেছেন, যিনি ইউটিউব চ্যানেলটি পরিচালনা করেন, অর্থাৎ ইউটিউব চ্যানেলটি যার ।

যে ইমেইল আইডি থেকে ইউটিউব চ্যানেলটি পরিচালনা করা হয় বা ভিডিও আপলোড করা হয় সেই ইমেইল আইডির যিনি মালিক একমাত্র সেই ব্যক্তিই এই কর্মকাণ্ড ঘটাতে পারবেন । তাই ব্রাত্যব্রত বসু যদি মনে করে থাকেন যে এই ভিডিও বিকৃত করা হয়েছে তবে ওই ইউটিউব চ্যানেলের মালিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা উচিত ।

এরপর সত্যজিৎ আরো বলেন, 'এতকিছুর পরেও ব্রাত্য বসু যদি আমার দ্বারা কোনরকম অসম্মানিত বোধ করে থাকেন তবে আমি একজন তরুণ নাট্যকর্মী হিসেবে তার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইছি' । 

এই চিঠি পাওয়ার পরেও মাননীয় মন্ত্রী বিধান নগর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে নাট্যকর্মী সত্যজিতের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা দায়ের করেন । সত্যজিতের দোষ ছিল তিনি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে একটি লিঙ্ক নিয়ে শেয়ার করে ছিলেন । যা করেছিলেন আরো কয়েক হাজার মানুষ । তাদের বিরুদ্ধে ব্রাত্য বাবু কোনরকম মামলা করেননি সর্বোপরি যিনি ওই ভিডিওটি আপলোড করেছিলেন তার বিরুদ্ধেও কোনোরকম মামলা হয়নি । ইউটিউবে আজও সেই ভিডিও সেই চ্যানেলেই আছে । এখন প্রশ্ন হলো তাহলে সত্যজিৎ'কে টার্গেট কেন ?

 ব্রাত্য বসুর পক্ষ থেকে এই মামলার সমস্ত রকম ক্ষমতা দেওয়া আছে আরেক নাট্যকর্মী পৃথ্বীশ রানা মহাশয়ের ওপর । যিনি গত তিন বছর ধরে এই মামলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন । গত প্রায় তিন বছর ধরে আদালতে একের পর এক তারিখ ঘোষণা হলেও এখনো পর্যন্ত একদিনও এই মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সওয়াল-জবাব হয়নি । 

সত্যজিৎ একজন সাধারন নাট্যকর্মী । বনগাঁ রেলওয়ে স্টেশনে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চলে । কোভিড পরিস্থিতির পরে সেই চায়ের দোকান  বন্ধ হয়ে সামান্য স্টেশনারি দোকানে পরিণত হয়েছে । দিনের পর দিন এভাবে আদালতে হাজিরা দেওয়া তাঁর জন্য বেশ দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে উঠছে । ২০২২ সালের প্রথম দিন তাই সত্য জিৎ একটি কথাই জানতে চায়, এবছর কি এই মামলার নিষ্পত্তি হবে ?

Post a Comment

0 Comments