হল মুখি হচ্ছে দর্শক, মুর্শিদাবাদে চলছে বিভিন্ন নাটকের কাজ, একটি কর্মকান্ডে গাঙচিল - THEATRE FORUM


অম্বুনাথ সাহা


 বহরমপুর  আমরা নাট্যকর্মী,নাটক নিয়ে স্বপ্ন দেখা,নাটক নিয়ে নতুন ভাবনা,রিহার্সালের সময় বন্ধু বান্ধবদের সাথে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে একটা নাটক তৈরি বা নাটক নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া,মানুষকে নাটকের মধ্যে দিয়ে তৃপ্ত করতে পারলে মনের ভেতরে অদ্ভূত এক প্রশান্তি কাজ করে; যাক দর্শকের ভালো লেগেছে,তখন নাটক নির্মাণের আগে দুঃখ কষ্ট,রাগ অভিমান,পরিশ্রম সব ভুলে যায় আমরা ।।।

কিন্তু করোনা আবহে বিগতদিনগুলো আমাদের অর্থাৎ নাট্যকর্মীদের বা অন্যান্য শিল্পীদের বা সাধারণ মানুষের কিরকমভাবে ভয়ে-আতঙ্কে দিন কেটেছে বা এখনও কেটে যাচ্ছে সে আর নতুন করে বলার কিছু নেই, অনেক দুঃখ কষ্টের পর আবার আমরা একটু একটু করে মঞ্চে ফিরছি, দর্শক হল মুখি হচ্ছে, তা ছাড়াও তৈরি হয়েছে নাটক মঞ্চায়নের জন্য নানান ছোট ছোট স্পেস যেখানে অল্প কিছু দর্শক নিয়ে চলছে নাটক।।

এভাবেই পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে মুর্শিদাবাদের বুকেও চলছে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন নাটকের কাজ। এরকমই নাটক নিয়ে নানান কর্মকাণ্ডের মধ্যে বহরমপুর গাঙচিল নিজেদের ব্রতী রেখেছে সর্বক্ষণ।। 

গাঙচিলের এমনই কর্মকান্ডের মধ্যে একটির সাক্ষী থাকতে গত ২৩ শে অক্টোবর বহরমপুর রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠিত হলো বহরমপুর গাঙচিলের নাট্যোৎসবে।

নাট্য উৎসবে অংশগ্রহণ করেছিল মুর্শিদাবাদের লোক আঙ্গিকে নির্মিত এবং চাকদহ নাট্যজনের নাটক আলকাপ আশ্রিত "কমলী কথা" যার নির্দেশনা রাহুলদার এবং রাহুলদার অভিনয়ে আরও একটি নাটক কলকাতা কলেজস্ট্রিট মার্গনের প্রযোজনা "কালসন্ধ্যায়" ।

প্রথম নাটকটা শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টায় এবং দ্বিতীয় নাটক সন্ধ্যা ৭.৪৫ মিনিটে ।

মধ্যবর্তী সময়ে এক অনবদ্য বাঁশির সুরঃ পরিবেশন করেন সৌমাভ ঘোষ 





চকদহ নাট্যজন প্রযোজিত নাটক "কমলী কথা " নাটকটি সম্পর্কে না বললে অনেকটাই বাকি থেকে যাবে নাটকটির এটি পঞ্চম তম শো ।একদিকে পরিশীলিত শহুরে থিয়েটার, অন্যদিকে মাটির গন্ধ মাখা জ্ঞানের গরিমার প্রবীণ, বিশুদ্ধ লোকসংস্কৃতির ধারায় সমগ্র মানুষের ইতিহাস। প্রকৃতি এবং বিশ্বের কাছে জিজ্ঞাসা আমি কে? আমার কি কাজ? স্বপ্নের মোহ কাটিয়ে নিজেকে খোঁজার যন্ত্রনা, নিছক শিল্পী থেকে মানুষ হয়ে ওঠার যন্ত্রনা। একজন শিল্পী যখন তাঁর সারাজীবনের সৃষ্টির দিকে ফিরে তাকান, তখন তিনি যা কিছু তৈরি করতে পেরেছেন তাকে আড়াল করে দাঁড়ায়, "আরো কত কিছু করা যেত কিন্তু করা হলো না।" এই স্মৃতি তাকে কষ্ট দেয় আমৃত্যু। 

এই যাত্রাপথে সব ফুরিয়ে যাওয়ার পরও যেটা থাকে সেটা হলো গভীর- গভীরতম জীবন এবং মানুষ তাঁরই উন্মোচনে মাথা খুঁড়ে চলে অনন্তকাল। সেই খুঁজে চলার মধ্যেই থাকে অপার আনন্দ। নিজেকে বিশ্লেষণ করতে করতে বিশ্লেষিত হয় সমাজ। 

সামাজিক কাঠামোর মধ্যে মানুষের অধিকার এবং কর্তব্য নিয়ে কথা বলে থিয়েটার। থিয়েটার সত্য নয়, কিন্তু থিয়েটারের মিথ্যা, সত্যের উদঘাটনে বাস্তবকে বিশ্লেষণ করে। তাই বোধহয় "কমলীকথা" নাটকের কমলী বা শরিফুল পথ চলতে চলতে গেয়ে ওঠে "আমি মানুষ দেখতে এসেছি ভবে"।।




ঠিক কিছুক্ষন পর শুরু হয় কলকাতা কলেজস্ট্রিট মাগর্ন প্রযোজিত নাটক "কালসন্ধ্যায়" । অবসরপ্রাপ্ত জাহাজের ক্যাপ্টেন রক্তকমল বিশ্বাস কোনো এক সময়ে এক জাহাজডুবিতে আক্রান্ত হয়ে আজ মানসিক ভারসাম্যহীন।তিনি আজ ভাবেন যে সেই জাহাজী সঙ্গীরা আজও হয়তো ফিরে আসবে তাঁর দেওয়া গুপ্তধন নিয়ে। সবাই আজকের এই কর্পোরেট জগতে বিকিয়ে যাওয়া অসুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন, পারস্পরিক হিংসায় উন্মত্ত, নবীন প্রজন্মের প্রলোভনে শেষ হয়ে যাওয়া সমাজে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থতায় লড়াই করে চলেছে। তার মধ্যে এই ক্যাপ্টেন বিশ্বাসের গুপ্তধনের হদিশ কে পাবে? কি সেই গুপ্তধন? তা কি শুধুই পার্থিব জগতের মণিমানিক্য নাকি এই পচে যাওয়া , স্বার্থপর সমাজের থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবার চাবিকাঠি? কিসের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন ক্যাপ্টেন? তিনি কি সত্যিই মানসিক ভারসাম্যহীন নাকি আমরা বর্তমান সময়ের ইঁদুর দৌড়ে ছুটে চলা মনুষ্যত্ত্বহীন সামাজিক সদস্যরা সুস্থ মানুষ? কে তার জবাব দেবে? সেই সত্যের, ক্যাপ্টেন রক্তকমলের সেই স্বপ্নের গুপ্তধনকে খুঁজতে হলে আপনাদের দর্শকাসনে বসতেই হবে । এক অনন্য প্রযোজনায় প্রস্তুত এই নাটকটি ।




বহরমপুরে নাট্যপ্রেমী মানুষজনের শুভ বিজয়ার পর আবার রবীন্দ্র সদন প্রাঙ্গণে উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো । অনেকদিন পর এই রকম দুটি ভিন্ন স্বাদের নাটক দেখে দর্শকাসন থেকে অনেক প্রশংসা কুড়িয়ে নিয়েছে এই দুটি নাটক ।।

Post a Comment

0 Comments