নৈহাটি : রঙ্গসেণা'র রঙ্গোৎসব , একটি অভিনব নাট্যোৎসব নৈহাটি শহরের যা কিনা শুরু হয়েছিল ২০১৮তে । গুটি গুটি পায়ে চলতে চলতে সেই নাট্যোৎসব চার বছর পেরিয়ে পাঁচে পা দিলো । এই পঞ্চম রঙ্গোৎসবের দ্বিতীয় পর্ব - দ্বিতীয় জাতীয় নাট্য উৎসবের মাধ্যমে ভারতবর্ষের নানা প্রান্তের প্রচুর পরীক্ষামূলক ও সৃষ্টিশীল নাটক প্রদর্শনের চেষ্টা করে রঙ্গসেণা । এ বছর কোভিড-১৯ এর ভয়ংকর প্রকোপের
ফলে রঙ্গসেণা এই দ্বিতীয় জাতীয় নাট্যোৎসব আন্তর্জালের মাধ্যমে নাট্যপ্রেমী মানুষের সামনে তুলে ধরেছে
১০ই জুলাই থেকে ২৪শে জুলাই অবধি । স্বভাবতঃই ১০ই জুলাই ছিল নাট্যোৎসবের প্রথম দিন । এই দিন আন্তর্জালের মাধ্যমে প্রদর্শিত হয় অসমীয়া ভাষায় আসামের পূর্বরঙ্গ নাট্য গোষ্ঠীর ৮০ মিনিটের নাটক ," দি জার্নি অব দা রিং " , ডিরেক্টর শ্রী গুনাকর দেব গোস্বামী ।
একটি অসম্ভব সুন্দর নাটক দেখলাম আমরা । নাটকের শুরুতেই আলোর কারুকাজ ও আবহের দ্বারা মঞ্চ একটি আশ্রমের রূপ নেয় । শকুন্তলার বিরহী কান্না দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করে । নাটকের ছায়া চরিত্রের গলার সংগীত মূর্ছনা শকুন্তলার বিরহী রূপকে মূর্ত করে তোলে । পরবর্তী দৃশ্যে অসাধারণ অঙ্গভঙ্গিতে দুর্বাসা মুনির ক্রোধ প্রকাশ , আশ্রমিকদের মধ্যে ভীত আচরণ এবং শকুন্তলাকে অভিশাপ প্রদানের অভিনয় মন ছুঁয়ে যায় । শকুন্তলার শৃঙ্খলাবদ্ধ অভিনয় আজকের নারীর প্রতিভূ । আজও নারী নিজের অসহায়তা মুখ ফুটে বলতে পারে না , অপেক্ষা করে আর এক পুরুষের যেমন শকুন্তলা অপেক্ষায় ছিল রাজা দুষ্মন্ত তাকে দূর্বাসা মুনির শাপমুক্ত করবে । সেই অভিশাপের কথামত দুষ্মন্ত এলেন , শকুন্তলার প্রেম হোলো তার সাথে কিন্তু বিবাহ ব্যতিরেকে শারীরিক মিলন হোলো । প্রত্যেকটি ঘটনা এক এক করে ফুটে উঠছিল কুশীলবদের শারীরিক ক্ষিপ্রতায় , বাজনায় আলোতে আর এক আবহিক সুরে । মনে হচ্ছিল যেন আমরা সেলুলয়েডে সিনেমা দেখছি । মণিপুরী নৃত্যের ছোঁয়ায় শকুন্তলার মিলনোত্তর খুশি দ্বিগুণ হয়ে ধরা দেয় দর্শকের চোখে । কিন্তু পরবর্তী দৃশ্যে গর্ভবতী হবার জন্যে শকুন্তলাকে সমাজের লোকলজ্জার সামনে পড়তে হয় এবং কন্ব মুনির হাহাকার ,ক্ষোভ , দুঃখ ফুটে ওঠে অসাধারণ অভিনয়ে । অসমীয়া ভাষা না জানলেও শুধুমাত্র অভিনয় ও শারীরিক কুশলতার জোর আর অভিনয়ের মাধ্যমে নাটকটি সহজবোধ্য হয়ে ওঠে আমাদের মত দর্শকের কাছে । পরবর্তী দৃশ্যে শকুন্তলার স্বামীগৃহে যাত্রা চোখে জল এনে দেয় । প্রত্যেকটি দৃশ্য রুদ্ধশ্বাসে দেখছিলাম ।রথ টানার অনবদ্য অভিনয় দেখার মত । রাজা দুষ্মন্তর প্রাসাদে যাবার পর শকুন্তলার অভিনয়ে ফুটে ওঠে দুষ্মন্তর বিস্মৃতি । শকুন্তলার সখীর দুর্বাসা কে আহ্বান এবং মঞ্চে দূর্বাসার আগমন ও শকুন্তলাকে আবার অভিশাপ প্রদান আর তারপর শকুন্তলার অভিশাপমুক্ত হবার আকুতি হৃদয় ছুঁয়ে যায় । শকুন্তলা ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসে । ঠিক তার পরের দৃশ্যে আমরা দেখতে পাই জেলেদের । অভিনব পোশাক ভাবনা নাটকে প্রাণ এনে দিয়েছে । মাছের অভিনয় অনবদ্য ।
একটি নাটকে ছোট ছোট চরিত্র কত গুরুত্বপূর্ণ এই নাটকটি না দেখলে বোঝা যাবে না । মাছের পেট থেকে আংটি উদ্ধার আর সেই আংটি পেয়ে প্রধান জেলের আনন্দ ও রাজপ্রাসাদে পৌঁছনোর অসাধারণ অভিনয় । কাকে ছেড়ে কার অভিনয় দেখবো ? একেই বলে গ্রুপ থিয়েটার । অবশেষে আংটি দেখে রাজা দুষ্মন্তের শকুন্তলাকে মনে পড়ে যাওয়া । একি শুধুই নাটক ? এই কাহিনী আজও আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । শকুন্তলা আজকের নারী , দুর্বাসা আজকের পুরুষ , রাজা দুষ্মন্ত আমাদের আজকের রাজা আর জেলে ও আংটি শুধুমাত্র আমাদের প্রজাদের রাজার খেয়ালের হয়রানি । চতুর্থ অথবা ষষ্ঠ শতকের সাথে একবিংশ শতাব্দীর এক মিলন । আলো , বাজনা , আবহ , নাচ, গান, পোশাক এবং সবশেষে অভিনয় " দি জার্নি অব দা রিং " কে পর্বতীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে ।




0 Comments