আন্তিগোনে গ্রীক পুরাণের একটি বিয়োগাত্মক চরিত্র । আন্তিগোনে চরিত্রটি অবলম্বনে সফক্লিস , ইউরিপিদেস থেকে শুরু করে সিমাস হিনি পর্যন্ত অসংখ্য নামিদামি নাট্যকার বহু নাটক রচনা করেছেন । সফক্লিসের ইডিপাস ট্রিলজির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিরিজাংশ আন্তিগোনে নাটকটিতে একই সমাজের দুই শ্রেণীর নারীকে আমরা প্রত্যক্ষ করি । পুরুষশাসিত সমাজে ন্যায়ের পক্ষে লড়াইয়ের তীব্র অঙ্গীকারের মাধ্যমে আন্তিগোনে আমাদের সামনে আড়াই হাজার বছর আগে নারী সমাজের যে প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে তা একালেও বিরল ।
এবার আসি নৈহাটি রঙ্গসেণার রঙ্গ উৎসবে কন্নড় ভাষায় কর্ণাটকের নাটক " সফক্লিসেস আন্তিগোনে" র মঞ্চকথায় । ডিরেক্টর ছিলেন মাইশোরের নাট্যদল জনগণমন সংগঠনের শ্রীমতী সুমথি কে. আর ।
প্রথম দৃশ্যেই আলো, বাজনা ও কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে প্রকাশ পেলো অসহনীয়তা ও দ্বন্দ্ব । একটি সাদা কাপড়ের আদলে মৃতদেহ দেখা যায় যা কিনা গ্রুপ কোরিয়োগ্রাফির মাধ্যমে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় । অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ইডিপাসের দুই ছেলের মৃত্যু । পরবর্তী দৃশ্যে আন্তিগোনের প্রবেশ এবং রাজার আদেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ । তার পরের দৃশ্যে থিবসের রাজা ক্রেয়নের ঘোষণা ,' ইডিপাসের ছেলে পলিনেসের মৃতদেহ কেউ কবর দিতে পারবে না । পলিনেসের মৃতদেহ শিয়াল কুকুরের খাদ্য হোক "। কিন্তু আন্তিগোনে ঠিক করে সে কবর দেবে । আন্তিগোনের বোন ভীত হয়ে পড়ে এবং আন্তিগোনেকে রাজার বিরুদ্ধাচরণ করতে না করে । তারপরের দৃশ্যেই পুরুষ ভাব অর্থে সূর্যের সামনে নিজেদের আত্মকথন বয়ান । অসাধারণ পোশাক, আলো ও কোরিওয়োগ্রফিতে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দেওয়ার দৃশ্য । ঠিক তার পরের দৃশ্যে ক্রেয়নের রাজপ্রাসাদের ছবি ফুটে ওঠে এবং ক্রেয়ন মানুষের এই পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারছিল না । তারপরের দৃশ্যেই আবার প্রার্থনার ঢঙে নারীদের নিজেদের কথা ব্যক্ত করেছে স্তোত্রের মাধ্যমেই এবং মানবশক্তিকে আবাহন ।
প্রত্যেক দৃশ্যে দারুন কোরীয়গ্রাফি নাটকটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে । আন্তিগোনের বিদ্রোহের ফলে তাকে রাজা বন্দী করে এবং আন্তিগোনেকে তার বোন ইসমেনি ক্ষমা চাইতে বলে । কিন্তু আন্তিগোনে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে । আন্তিগোনেকে রাজা ক্রেয়ণ শাস্তি দেয় । এতটুকু ভয় না পেয়ে আন্তিগোনে তার নিজের বক্তব্য রাখে রাজার সামনে । রাজার শুভানুধ্যায়ী বয়োজ্যেষ্ঠ রাজাকে সংযত হতে বলে । এই নাটকে আলোর বিশেষ প্রভাব নাটকের একটি দৃশ্য থেকে আর একটি দৃশ্যকে আলাদা করেছে । আস্তে আস্তে রাজার ভিতরে পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায় । রাজা লুটিয়ে পড়ে বিবেক যন্ত্রনায় ।নিজের প্রতি ধিক্কার দিতে থাকে । রাজা ক্রেয়ন অনুতপ্ত হয় ।এই নাটকে রাজশক্তির অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানো এক অরাজনৈতিক শক্তির নাম " আন্তিগোনে " । অসাধারণ আলো , আবহ , কোরীয়গ্রাফি এবং অভিনয় নাটকটিকে দর্শকের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে । ভাষা কখনও নাটকের অন্তরায় হতে পারে না , আর ও একবার প্রমাণিত হোলো ।


0 Comments