সৌরভ শীল
প্রেক্ষাগৃহের উষ্ণতা, গ্রিনরুমের মায়াবী আলো, নকল পোশাক , স্পিরিট গামের গন্ধ, থার্ড বেল আলোকসম্পাত, আবহ, রঙ্গমঞ্চের মুগ্ধতা - সবই যেন কল্পকথা। অতিমারীর দুঃসময়ে থিয়েটার যেন কোন সুদূর অতীতের থমকে যাওয়া স্থাপত্য। শিল্পীরা ভাস্করের হাতুড়ি ছেনির আঘাতে গড়ে ওঠা ভাস্কর্য। নিরব অথচ বাঙময় । প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তের অসম লড়াইকে প্রকট করে তার নৈশব্দ যাপন। একদিকে বাধা পড়েছে হাতিয়ার নিয়মের নিগড়ে। অন্যদিকে প্রাথমিক চাহিদা -খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান। প্রতি দিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দীর্ণ সে। অথচ একদিন মঞ্চকে ভালোবেসেই তো তারা বেছেছিল জীবিকা। থিয়েটারকে জড়িয়ে নিয়েছিল জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে। করেছিল আজীবন একসাথে চলার শপথ।
নাট্যশিল্পীদের এই দুঃসময়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন কৃষ্ণনগরের নাট্যদল সিঞ্চন । ৩২ বছর ধরে ভিন্ন আঙ্গিকের নাটক মঞ্চে এনে যারা সমৃদ্ধ করেছে বাংলা নাট্যমঞ্চকে আজ তারা আবার উদাহরণ সৃষ্টি করলেন তাদের কর্মসূচি 'বন্ধুতা'র মধ্যে দিয়ে। 'পাহাড় থেকে সাগর সারা বঙ্গে / কৃষ্ণনগর সিঞ্চন থিয়েটারের সঙ্গে'-এই শ্লোগানকে হাতিয়ার করে সারা পশ্চিমবঙ্গের ২৩ টা জেলার ৭২ নাট্যকর্মীর একাউন্টে পৌঁছে দিলেন সহায়তা। এছাড়াও সাইক্লোন 'ইয়স' বিধ্বস্ত পূর্ব মেদিনীপুরের একটি নাট্যদলের পূনর্গঠনের জন্য বরাদ্দ করলেন অর্থ।
পরিকল্পনা শুরুতে সিঞ্চনের বন্ধুরা নিজেদের সাধ্যমত অর্থ সম্মিলিত করে গড়ে তোলে তহবিল। ক্রমেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন কৃষ্ণনগর শহরের সুধীজনের অনেকেই। এমনকি বিদেশ থেকেও আসে সহায়তার প্রতিশ্রুতি । সমস্ত কর্মসূচির সাথে তারা যুক্ত করেন বিভিন্ন জেলার বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বদের । বিশিষ্টজনেরা নিজ নিজ জেলার বেরোজগার হয়ে পরা নাট্যশিল্পীদের চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করলে দলের তরফে তাদের একাউন্টে থেকে পৌঁছে দেয়া হয় অর্থ। কৃষ্ণনগর সিঞ্চন এর সম্পাদক সোমেন বিশ্বাস জানালেন- "সকলের সহায়তা ছাড়া এই কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্ভব হতো না । আমরা আগামী দিনে এই কর্মসূচিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবো।"
কৃষ্ণনগর সিঞ্চন' এর নির্দেশক নাট্যকার সুশান্ত কুমার হালদার বললেন "আনলক পর্ব শুরু হলে অন্যান্য পেশা একটু একটু করে স্বাভাবিক হলেও এইসব নাট্যকর্মীরা পেশায় ফিরবেন আরো পরে । কারণ মানুষের হাতে অর্থ এলে এবং ভয় দূর হলে তবেই তারা ফিরবেন থিয়েটারের অঙ্গনে। তবে হবে নাট্যশিল্পীদের রুজিরুটি। এক ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো এই সব শিল্পীরাই থিয়েটারের সম্পদ । এদের হারালে থিয়েটার পিছিয়ে পড়বে অনেক যোজন। এদের জন্য কোন সরকারি পরিকল্পনাও তো নেয়। এই দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকার বার্তা দিতেই সিঞ্চনের কর্মসূচি 'বন্ধুতা'।" থিয়েটার তো যৌথতারই শিক্ষা দেয়। এই দুঃসময়ে সেটাই বেঁচে থাকার একমাত্র মন্ত্র। সিঞ্চন তাকেই আবারও প্রতিষ্ঠা দিল। নাট্যব্যক্তিত্ব দেবাশিস সরকার বললেন -"জেলার নাট্যদল হিসেবে কৃষ্ণনগর সিঞ্চন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকুক এই মহতী উদ্যোগ ।"

0 Comments