আইরিন শবনম : গত ১৮ই অক্টোবর মালদা মডেল মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে প্রদর্শিত হয়ে গেলো মালদা সমবেত প্রয়াসের নাটক—‘পরিযায়ী কথা’। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, প্রাঙ্গনে, এবং এই করোনা কালে । তবে একথা ভাবলে ভুল হবে যে কেবলমাত্র এই বিশেষ সময়ের দাবীতে প্রয়াসের এই বিশেষ ফর্মের খোঁজ । দীর্ঘ পঁচিশ বছরের এই দলটি প্রসেনিয়াম থিয়েটার দিয়েই তার যাত্রা শুরু করে ছিলো, মাঝখানে কয়েকটি অঙ্গনমঞ্চ নাটক করলেও মূলত প্রসেনিয়াম থিয়েটারই করেছে । কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বারবারই তার সীমাবদ্ধতায় ছটফট করেছে, যা তাদের নাটকের নির্বাচন (নিশাবসান, নিষিদ্ধ নির্মাণ,পরভূমে ইত্যাদি)ও উপস্থাপনার স্বাতন্ত্র থেকেই অনুভব করা গেছে। হয়তো এই যন্ত্রনাই শেষ পর্যন্ত তাদের ‘মান-হুঁশ’, ‘কোন দিক সাথী’, ‘শোনা কথা’-র মতো নাটকগুলি করিয়েছে,যা একই সঙ্গে মঞ্চ, অঙ্গনমঞ্চ, পথেও প্রদর্শন করা সম্ভব । সমবেত প্রয়াসের নাট্যাভিনয়ের ইতিহাস তার সমাজ সচেতনতার সাক্ষী । গতবছর তারা প্রদর্শন করে বাদল সরকারের ‘বীজ’ নাটকটি, যা যথেষ্ট দর্শক সমাদর লাভ করেছে। এই সময় থেকেই তারা মোটামুটি স্থির করে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের সুরক্ষিত বলয়ে আবদ্ধ না থেকে সরাসরি মানুষের কাছে নাটককে নিয়ে যাবার পথ হিসেবে মুক্তাঙ্গনকে বেছে নেওয়ার কথা, এবং তারই ধারাবাহিকতায় এসেছে এই ‘পরিযায়ী কথা’।করোনা মহামারী আমাদের এক অপরিচিত শব্দবন্ধের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়েছে—‘লকডাউন’।
ট্রান্সজেন্ডার ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কথা ভেবে বহরমপুর ঋত্বিক এর নাটক 'মা' - থিয়েটার ফোরাম
এই লকডাউনের ফলে মানুষ যে কী ভীষণ অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছে, তা আমরা জানি। কিন্তু আমাদের এই চেনাজানার বাইরে এমন এক কঠিন সত্যি আমাদের চোখের সামনে উঠে এসেছে, যেন ভারতবর্ষের কঙ্কাল প্রেতাত্মার মত বেরিয়ে এসেছে রাজপথে রাজপথে । এ কোন ভারতবর্ষ ! এরা কারা ! কোথায় ছিলো ! এদেরকে তো আমরা চিনিনা ! এরাও আমার স্বদেশবাসী ? দলেদলে ‘ভুখা পেট নাঙ্গা পা’ মানুষ রাজপথ রেলপথ জঙ্গল নদী পেরিয়ে, কোলেকাঁখে বাচ্চা কিংবা ভারী বোঁচকা নিয়ে হাঁটছে শ’য়ে শ’য়ে মাইল । গর্ভবতী রমনী, বৃদ্ধ- বৃদ্ধা, শিশু, খোঁড়া পায়ে বাচ্চা মেয়ে, আমাদের বিবেককে ফালা করে হেঁটে চলেছে, মারা পড়েছে; যা দেখে আমরা শিউরে উঠেছি, কষ্ট পেয়েছি, ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আরো বেশি নিজেদের সুরক্ষিত বলয়ে সেঁধিয়ে গেছি। কিন্তু সমবেত প্রয়াস তা করেনি, করতে পারেনি, তারা এই যন্ত্রনাকে রূপ দিতে চেয়েছে, এর কারণ অনুসন্ধান করেছে এবং উত্তরণের কথা ভেবেছে।তাদের মনে হয়েছে ‘চুপ করে থাকা এখন শব্দহীন পাপ’। কারণ তারা মনে করে নাটক কোন বিনোদনের মাধ্যম নয়, নাটকের আছে মহৎ সামাজিক দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব পালন করতে না পারলে নাটক করা বৃথা। তাই তারা সামাজিক দূরত্বকে তুড়ি মেরে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে, লকডাউনে নাটক লিখে তার মহড়া শুরু করেছে । অবশেষে ১৮ই অক্টোবর তা প্রদর্শিত হলো ।
১৫ টি সংবাদ পত্র (আজকের) পি.ডি.এফ কপি পড়ুন, এই লিংকটি ক্লিক করে -- CLICK HERE
পঁয়ত্রিশ মিনিটের নাটক, কুশীলব সাত জন (নারী-২,পুরুষ-৪, বালক-১)।নাটকের বিষয় নামেই প্রকটিত, তবে নামকরণ দেখে যদি মনে হয় পরিযায়িদের দুঃখ দেখানোই নাটকের উদ্দেশ্য , তাহলে ভুল হবে। তাদের অসহনীয় দুর্দশা, মর্মান্তিক পরিণতি নিশ্চয়ই নাটকে এসেছে, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি করে এসেছে তাদের এই অবস্থার কারণ খোঁজা, বঞ্চনার পেছনের ইতিহাস, তার রাজনীতি। হ্যাঁ রাজনীতি। খুব স্পষ্ট ভাবে রাজনৈতিক উচ্চারণ আছে এই নাটকে, কোন লুকোছাপা নেই, কারণ ‘প্রয়াস’ মনে করেছে এটাই এই সময়ের দাবী। একেবারে লোকায়ত ঢং-এ সামনের দর্শকদের নমস্কার ও আদাব জানিয়ে দুজন অভিনেত্রীর গানের মধ্যে দিয়ে নাটকের শুরু হয়। পেছনে ঢোল-ডাফলি নিয়ে বসে আছে কোরাস দল। গানে বলা হচ্ছে—‘ করোনা অতিমারী খুললো সবার চোখ/ পরিযায়ী নামে নাকি আছে কিছু লোক/ দেখতে কেমন খায় কী, কোথায় তাদের বাস………।। সংখ্যা কত কেউ জানেনা, হিসাব কিছু নাই/ অবাক কান্ড হয় নাকি তা? ভেবে দেখো ভাই//’ এভাবে সূচনাতেই নাটকের সুর বেঁধে দেন নাটকের নির্দেশক। কেয়া বাগচীর লেখা মূল নাটকটির সম্পাদনা এবং নির্দেশনার কাজটি করেছেন শরদিন্দু চক্রবর্তী। আমরা দেখতে পাই একদল শ্রান্ত ক্লান্ত শ্রমিক হেঁটে যাচ্ছে রাজপথ ধরে, দলে আছে এক গর্ভবতী মহিলা আমিনা, হাঁটতে হাঁটতেই তার প্রসব যন্ত্রনা শুরু হয় রাস্তার মাঝখানে, এই ভীষণ বিপদের সময় তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় দলের আর এক বর্ষীয়সী মহিলা সরস্বতী মাসি, রাস্তার একপাশে নিয়ে গিয়ে পরম মমতায় তাকে নির্বিঘ্নে তাকে প্রসব করায়- যেমনটা ঘটে থাকে গ্রামে-গঞ্জে, কিন্তু যাকে বিষিয়ে তোলা হচ্ছে, ঘৃণা আর বিভেদের প্রাচীর গড়ে তোলা হচ্ছে সযত্নে—তা স্পর্শ করেনা গতর খাটা, একই যন্ত্রনার শরিক হওয়া এই গরীব-গুর্বো মানুষগুলোকে। স্পষ্ট উচ্চারণে নয় প্রায় নিরুচ্চারেই এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নাটকে। এরপর এসেছে তাদের গায়ে কীটনাশক স্প্রে করা ও ট্রেনে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া সেই মর্মান্তিক দৃশ্য। এইপর্যন্ত নাটক করুণ এবং মর্মস্পর্শী। কুশীলবদের অভিনয়ে চোখে জল এসেছে দর্শকের, তবে আমাদের মনে হয়েছে, নাট্যকার এতক্ষণ যেন জমি তৈরী করেছেন দর্শক মনের, যে জমিতে তিনি তার আসল বৃক্ষটি রোপণ করতে চান।
আত্মকথনে চপল ভাদুড়ী, পর্ব - ৩ -- CLICK HERE
এরপর পরিযায়ীরা তাদের পরিচয় তুলে ধরতে শুরু করেছে—কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ বস্ত্র, কেউ গৃহ সহায়িকা, কেউবা যৌনকর্মী। পেটের দায়ে যে কোন কাজ করতে তারা বাধ্য হয়। দর্শক অনুভব করে—দেশ গড়ার আসল কারিগর এরাই, কিন্তু এদের কথা কেউ ভাবেনা, এদের জন্য নেই কোন আইন, কারণ এদের কোন দল নেই, নেই কোন ঝান্ডা। তাই কোরাস গান ধরে—‘আমরা জন্মাই আর খাটি, খাটি আর মরি, পিঁপড়ের মতো, পোকা মাকড়ের মতো, শীতের রাতে ঝরা পাতার মতো’। এখানে একটি অনবদ্য কম্পোজিশন তৈরী হয়। তার পরেই ঠিক বিপরীত ছবি তুলে ধরতে কোরাস ঝটতি গান ধরে—‘আমরা থাকি নিরাপদে, মরছে ওরা মরুক, কী আসে যায় তোমার আমার, চলছে যা তাই চলুক’ বলিষ্ঠ গলার শ্লেষাত্মক এই গান সামনে বসা মধ্যবিত্ত দর্শকের মনে তীব্র অস্বস্তির জন্ম দেয়। এরপর খুব দ্রুত মধ্যবিত্ত জীবনে লকডাউনের নানা প্রতিক্রিয়ার খন্ডচিত্র একঝলক দেখিয়েই কোরাস চলে যায় পুরোপুরি রাজনৈতিক ভাষ্যে—সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, চীন পাকিস্তান যুদ্ধের যুযু এবং আত্মনির্ভর ভারতের ভাঁওতা। আত্মনির্ভর ভারতের পর্দা ফাঁস করে একের পর এক পরিসংখ্যান—দেশে বাইশ কোটি বেকার, বিশ্বক্ষুধা সূচকে ১১৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০২-এ, প্রতি বছর ১২ হাজার কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করে।এভাবে যখন চাবুকের মতো একটার পর একটা সংলাপ আছড়ে পড়তে থাকে, তখন কোরাসের তৈরী কম্পোজিশনে আত্মনির্ভর ভারত ধ্বসে পড়তে থাকে। প্রত্যেকটি কম্পোজিশন এতো যথাযথ ও মনোজ্ঞ হয়েছে যে পরিসংখ্যানগত নীরস তথ্যও দর্শকের একঘেয়ে লাগেনি।
এবার আসি অভিনয় প্রসঙ্গে। প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার নাটক রচনা ও উপস্থাপনায় একটি বিশেষ শৈলীর প্রয়োগ আছে, সাধারণত এ ধরনের নাটকে যা খুব একটা চোখে পড়েনা। মুক্তাঙ্গন নাটক লাউড হয়, সেখানে অভিনয়ও লাউড হবে এই ধারণাকে সরিয়ে রেখে অভিনয় শৈলীতে সূক্ষ্ম কাজের প্রয়োগ করা হয়েছে। কাট কাট সংলাপ, অনুভূতি প্রকাশের অভিব্যক্তিকে অনাবশ্যক অবদমন বা অতিমাত্রায় শরীরী বিভঙ্গের প্রয়োগে এ ধরনের নাটকের আবেদন মূলত মস্তিষ্কের কাছে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু এই নাটককে এমনভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে যার ফলে মস্তিষ্ক এবং হৃদয় উভয়ের কাছেই এর আবেদন পৌঁছেছে। তবে অভিনয় উৎকর্ষ আরো বৃদ্ধি পেলে পরিচালকের উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হবে বলে মনে হয়। যদিও প্রত্যেকের অভিনয়ই ছিলো সাবলীল। অন্তঃসত্ত্বা আমিনার চরিত্রে শর্মিষ্ঠা দাস, স্বজন হারানো অসহায় আর্তিতে কেয়া বাগচী, বলিষ্ঠ কিন্তু মর্মস্পর্শী গানে কৌশেন্দু দাস এবং শিশুশিল্পী শরণ্য নাটকে অন্য মাত্রা যোগ করেছে। কোরাসে শুভজিৎ বসাক, অরুনাংশু ভট্টাচার্য এবং সৌমেনের অভিনয়ও যথাযথ। তবে কোরাসে কাউকে কাউকে কখনো কখনো একটু কম লগ্ন মনে হয়েছে, আরো অনুশীলন প্রয়োজন। মধ্যবিত্ত জীবনের যে খন্ডচিত্র আঁকা হয়েছে তা আর একটু স্পষ্টতা পেলে ভালো হতো।
আর একটি কথা না বললেই নয়, তা হচ্ছে নাটকে গানের ব্যবহার। গান এই নাটকে এক শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। সহজ সরল ভাষা ও সুরে গানগুলিতে যেমন হৃদয়ছেঁড়া আর্তি ঝরে পড়েছে তেমনি উদাত্ত বলিষ্ঠতায় প্রতিবাদের সুর ও ধ্বনিত হয়েছে। গান এই নাটকে এক বড় সম্পদ।
কোভিদের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে সেদিন যে দর্শক সমাগম হয়েছিলো(৭৫-৮০) এবং নাটক দেখে তাদের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট আশাপ্রদ।নাটক একটু হলেও যে দর্শককে আলোড়িত করেছে, ভাবাতে পেরেছে,তা নাটকের এক বড় প্রাপ্তি; তবে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষের বাইরে, ‘যারা জন্মায় আর খাটে.........’ সভ্যতার সেই আসল কারিগরদের কাছে পৌঁছাতে পারলে তবেই এই নাটক পূর্ণতা পাবে বলে মনে হয়। সময়ের স্বরকে তুলে ধরা এই নাটক আরো অনেক প্রদর্শনের দাবী রাখে।
।




0 Comments