প্রত্যন্ত সুন্দরবনের একটি ছোট্ট দ্বীপে ঐকতান নাট্যোৎসব ২০২০ - থিয়েটার ফোরাম

ঐকতান নাট্যোৎসব ২০২০

কৌশিক পৈলান

'নাট্যমেব জয়তে' পত্রিকার ১০ জুলাই ২০২০ সংখ্যার 'প্রথম পাতায়' প্রকাশিত

কালীনগর : প্রত্যন্ত সুন্দরবনের একটি ছোট্ট দ্বীপ গ্রাম কালিনগরে অনুষ্ঠিত হল ঐকতান নাট্যোৎসব ২০২০। ৬ মার্চ প্রখ্যাত অভিনেতা শ্রী কমল চট্টোপাধ্যায়ের হাতে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে থেমে যাওয়ার পর উৎসব শুরু হয় ৮ মার্চ সন্ধ্যা থেকে। উৎসবের মাঠটি অপেক্ষাকৃত নিচু হওয়ার জন্য ৮ তারিখ বেলা ১২ টা পর্যন্ত মাঠের খানিকটা অংশের জমা জল সরিয়ে উৎসব শুরু হতে পারলো শুধুমাত্র ঐকতানের সাধারণ সদস্য- সদস্যা, এলাকার মানুষের আন্তরিক তৎপরতায় এবং আমন্ত্রিত নাট্যদলগুলোর সীমাহীন সহযোগিতায়। 


সমস্ত বাধা কাটিয়ে গিরিশ কারনাড নামাঙ্কিত অস্থায়ী মঞ্চে শুরু হয় ঐকতান নাট্যোৎসব-২০২০। উদ্বোধন করেন রাজডাঙ্গা দ্যোতকের নির্দেশক শ্রী শুভাশীষ ভট্টাচার্য, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ সেলিম। মঞ্চে তাঁদেরকে বরণ করে নেন উৎসব কমিটির সভাপতি মাননীয় অনল ভৌমিক মহাশয়। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পরই শুরু হয় রাজভাঙ্গা দ্যোতক নিবেদিত নাটক দ্বিখন্ডিত; শীর্ষেন্দু মুখপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে সৌভিক সেনগুপ্তের নাট্যরূপে এবং শ্রী শুভাশীষ ভট্টাচার্যের নির্দেশে। শান্তনু নাথ সহ দ্যোতকের দলগত অভিনয় দর্শকমনকে মুগ্ধ করে। ওইদিন দ্বিতীয় পর্বে ছিল গোবরডাঙ্গা স্বপ্নচর এর নিবেদিত গোগল যখন একা। মোহাম্মদ সেলিম রচিত নাট্যটি এসময়ে খুব জরুরি ছিল, তা কিন্তু সমস্ত দর্শক এক বাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন। পরদিন ছিল ৯ মার্চ দোল উৎসব, রং এর উৎসব। উৎসবে উপস্থাপিত হয়েছে চাকদা নাট্যজনের দমফাটা হাসির নাটক 'কোলে বসে'। প্রখ্যাত নাট্যাভিনেতা কমল চট্টোপাধ্যায় এবং সুমন পাল দুটি পৃথক স্ত্রী চরিত্রে রূপদান করে মানুষের মন জয় করে নেন। এই নাটকটির সম্পদ দেবাশীষের নির্দেশনা ও মঞ্চ ভাবনা ভেঙে যাওয়া এসময়কে দেবাশীষ মঞ্চে ধারণ করেছেন অদ্ভুত মুন্সীয়ানায়। দ্বিতীয় পর্বে ছিল কালিকাপুর বাংলা প্রসেনিয়ামের 'বিরহী বন্দুক'। নাটকটিকে এ সময়ের দলিল বলা যেতে পারে। চিত্রা মুখোপাধ্যায়ের কাহিনীকে নাট্যরূপ দিয়েছেন এ কে এম সাইফুল্লা। তিনিই এ নাটকের নির্দেশক।



একদম শেষ দিন ১০ মার্চ আমন্ত্রিত দল ছিল বগুলা সূচনা, তাদের অন্যতম সেরা প্রযোজনা 'পুঁটি রামায়ণ' নিয়ে। মনোজ মিত্রের এই অসাধারণ নাট্যটিকে সৃজনের সুনিপুণ নির্দেশনায় অসামান্য দক্ষতা সঙ্গে মঞ্চে উপস্থাপিত করেন বগুলা সূচনার কলাকুশলীরা। হাস্যরসের আড়ালে শাসনতান্ত্রিক অবস্থার নগ্নতা উপভোগ্য হয়ে ওঠে দর্শকের কাছে। উৎসবের শেষ উপস্থাপনাটি ছিল ঐকতানের নিজস্ব প্রযোজনা 'তথাপি'। দীপন নায়েকের রচনাও নির্দেশনায় 'তথাপি' নাটকটি চিহ্নিত করে এসময়ের আলোচিত সমস্যাকে, অভিনেতার জীবনের সংকটকে, অভিভাবকদের অসহায়তাকে এবং নতুন প্রজন্মের সংকটকে এবং তার মুক্তির পথ নিয়ে কথা বলে এই নাটক। নাটকটির শেষে কার্টেন কলের পরে দর্শক প্রতিক্রিয়া ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজা, জয়শ্রী, তনিমা, সঞ্জীব, নিতাই, মহেশ, বাপির অভিনয়ে, কৃত্তিবাসের আলো এবং কবি শঙ্করের আবহ সংযোজনে দর্শক সমাদৃত হয় নাটকটি। উৎসব শেষে মঞ্চ থেকে আগামী বছরের উৎসবের ঘোষণা করা হল, আগাম আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখা হল নাট্যমদী দর্শককে।

এই উৎসবটির মূলগত চরিত্র হল প্রত্যন্ত এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা নানা উপায়ে আর্থিকভাবে সাহায্য করে অতি যত্নে গড়ে তুলেছেন এই উৎসবটিকে। যার ফলে আয়োজক এবং সাধারণ দর্শকদের পৃথক করা যায় না। নাট্যোৎসবটিকে কেন্দ্র করে যেন মিলন মেলায় পরিণত হয় উৎসব প্রাঙ্গণ।

Post a Comment

0 Comments