বব ডিলানের টিউন টা আর তোলা হোলো না আমার - অশোক ঘোষ

ক্যানভাস 

লিসা এই মুহূর্তে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ছবি আঁকছে... ইজেল ভরা রঙ নিয়ে একটা landscape বানাচ্ছে !
দোতলার এই ঘর টা শিল্পী লিসার ছবি আঁকবার উপযুক্ত... দক্ষিণের খোলা বারান্দা... বাইরে গাছ গাছালি, তার পাস দিয়ে চলে গেছে একটা সরু এক ফালি রাস্তা শহরের বড় রাস্তার দিকে !ঘরে যেরকম আঁকার সরঞ্জাম তেমনি অনতিদূরে একটা পিয়ানো, পুরনো আমলের... লিসার মা ছিলেন সঙ্গীত শিল্পী... রবীন্দ্রনাথের গান, ধ্রুপদ, ভজন সহ নানান বিদেশি গান গাইতেন তিনি... !
লিসা ছোটো বেলায় মায়ের কাছে গানের তালিম নিলেও পেশা গত ভাবে আঁকার প্রতি ঝোঁক তাকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে !
বছরে একবার কলকাতার একাডেমী তে ছবির প্রদর্শনী করে সে... চিত্রকর মহলে তার পরিচিতি কম নয় !
মুখে লম্বা একটা সিগারেট ধরিয়ে অদূরে উঁচু টুলে বোসে নিজের আঁকা টা মন দিয়ে দেখতে দেখতে ছোটো বেলায় হারিয়ে যায় সে....

এইসব নানা স্মৃতি ভিড় করে আসছে তার মনে... !
সিঁড়ি দিয়ে ইলেক্ট্রিক গিটার কাঁধে দুরদার করে উঠে আসছে শুভ..... সরাসরি লিসার ঘরের বাইরে থেকে চিৎকার দেয়.... "লি, লি.. আসবো? "
ন্যাকামো না করে আয়... !
সম্বিত ফিরে বলে ওঠে লিসা, শুভর 'লি'!
শুভ ঢুকেই পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে লি কে... !
ছাড় ছাড় বলছি, মার খাবি কিন্তু !
... "ছাড়বো না... আগে মার তুই, তারপর ছাড়বো.. "
প্লিজ শুভ, প্লিজ !
... "পথে এসো বাবা.. "
দিনকে দিন শয়তান হয়ে উঠছিস শুভ !
"ধর ধর গান ধর... !"
মানে, এখন গান গাইবো !পাগল কোথাকার !

.. "বলছি যখন তখন গাইবি ব্যাস.. "
অসম্ভব, আমি গাইবো না ! আমার ভালো লাগছে না একদমই, 
শান্ত কণ্ঠে শুভ বলে... "কী হোলো তোর? "
কিছু না... 
... "কিছুই যদি না তবে গান গাইবি না কেন !"
এতো কৈফিয়ত আমি দিতে পারবোনা ব্যাস !
.. "কিছু একটা হয়েছে তোমার, আমার চোখ কে ফাঁকি দেবে কী ভাবে. !"
লিসা একটা সিগারেট ধরায় !মনটা আমার ভালো নেই রে শুভ... !

...."কেন, ওই ডিরেক্টর মাল টা খুব ডিসটার্ব করছে বোধ হয় !!!"

ফালতু বকিসনা, উনি কেন বিরক্ত করবেন আমায় !
.. "তুই তো বলেছিলি, মানুষ টা তোর গান শুনে ফিদা হয়ে গেছে.. তোকে লি বলে ডেকে নাকি শান্তি পায়, তোর মুখচ্ছবি তার বুকে... তোর চোখ লোকটাকে পাগল করে দেয়..., "
জোরে শ্বাস ফেলে শুভ.. "তোর কাছ থেকেই শোনা.." হটাৎ ঝাঁজিয়ে ওঠে লিসা... তো কী, হ্যাঁ লোকটা আমায় ভালোবাসে, আমার প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, আমার গান নিয়ে সে তার নাটকে কাজে লাগাচ্ছে... আমায় নিয়ে গল্প লিখছে, সে গল্প নিয়ে শর্ট ফিল্ম হচ্ছে... এই সব বলতে বলতে কারপেট পাতা মেঝেতে চিৎ হয়ে শুয়ে পরে লিসা!
লিসা একটু খোলামেলা পোশাক পড়তেই অভ্যস্থ, এখন বাড়িতে বলেই একটা লোয়ার  বারমুডা, আর অন্তরবাস ছাড়া স্লীভ লেস শার্ট.... যার ফলে তার বুকের অধিকাংশ টাই অনাবৃত, যেখানে বারবার শুভর চোখ চলে যাচ্ছে !
শুভ গিটার নিয়ে মেঝেতেই লিসার মাথার দিকে বোসে একটা গান বাজায়... 'এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে, বাহির হয়ে এসো
বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে আমার ঘরে এসো... '
গিটার টা সরিয়ে শুভ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে লিসার অনাবৃত বুক দুটোর দিকে !
নিস্তব্ধ ঘরে দুজনেই চুপ করে আছে !
দুজনের অনুচচারিত কথা গুলো বোধ হয় দুজনেই চুপ করে শুনছে !
... "তুমি কতো সুন্দর লিসা, "
তুই আমার বুক দুটো দেখছিস.. আমার আর কোনো সৌন্দর্য তোর চোখে পরে না.. জানি, 
... "মোটেই না, আমার চোখে তোর সবটাই সুন্দর.. কিন্তু ওই বুড়ো ডিরেক্টর এর প্রতি ইদানিং... ওই লোকটাই তোকে শেষ করে দিচ্ছে... !তুই তো আগে এরকম ছিলি না লি!!"
ঠিক, তুই যাকে লোক বলছিস, আমি তাকে সুন্দর মানুষ হিসেবেই দেখি.. 
.. "তোর কী কোনো পছন্দ নেই? "
আছে তো, আর আছে বলেই ওনাকে শ্রদ্ধা করি, ওনাকে আমার ভালো লাগে !
.. "কেমন একটা দেখতে লোকটা !ভাবুক প্রকৃতির ক্যালানে বললে ভুল হয় না..!"
মাইন্ড ইওর ল্যাংগুয়েজ শুভ, মানুষ টা সম্পর্কে কিছু না জেনে..., এই রে আমি এতো রিএক্ট করলে শুভ ধরে ফেলবে আমায়... ধুস আমি আবার কী সব ভাবছি... ওনাকে ভালো লাগে ঠিকই কিন্তু তাছাড়া তো আর কিছু নয়... কিন্তু শুভ কী আমায় ভালোবাসে!
... "জানিনা ওই নাটকের লোকটার সঙ্গে আমার লি র কোনো সম্পর্ক হোলো কী.., !লি কী বোঝে না যে ওকে আমি ভালোবাসি? "
বোঝার বিষয় তো ভিন্ন, শুভ এই তিন বছরে কোনোদিন আমায় বলে নি তো যে আমায় ভালোবাসে, কিন্তু ওই মানুষ টা খুব পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে তার কথায়, লেখায়..!. 
..."আমি তোর গায়ে হাত দিই, কোনোদিন কিছু বলিস না, আজ প্রথম তুই রিএক্ট করলি.. তোর মাথা ব্যাথা করলে ঘাড় টিপে দিয়েছি... পায়ের ডিম এ তোর মাসল পেইন হয়েছে নির্দ্বিধায় পায়ে মেসেজ দিয়েছি...!"
ঠিক, অস্বীকার করবোনা, কিন্তু কোনোদিন তো বললি না তুই আমায়... স্পষ্ট জানতে চেয়েছি অনেকদিন !সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছিস... !
এইসব ভাবনা শেষ করেই লিসা পায়ে পায়ে উঠে যায় পিয়ানোর দিকে, শুভ তা লক্ষ্য করে !
লিসা পিয়ানোয় ঝংকার তুলে গেয়ে ওঠে.... 'ও তোতা পাখিরে, শিকল খুলে উড়িয়ে দেব, মাকে যদি এনে দাও আমার মাকে যদি এনে দাও.. !
পিয়ানোর স্কেল ধরে শুভ গিটারে ওই গানের সুর তোলে.. !
লিসার চোখ বেয়ে দরদর করে জল পড়তে থাকে.. "কাঁদছিস কেন লি !"
আজ মার মৃত্যুদিন, সকাল থেকে মায়ের মুখটা আঁকার চেষ্টা করেও পারছিলাম না শুভ... তাই একটা ল্যান্ডস্কেপ করে ছেড়ে দিয়েছি !
বীভৎস একটা যন্ত্রনায় ভেতর টা তোলপাড় হচ্ছে..., কাঁদতে কাঁদতে বলে লিসা....
নিচে বেল বাজে... লিসা বারান্দার দিকে এগিয়ে আসে
.."কেঁদে আর কী করবি বল !"
ঠিক, মার জন্যে মনটা খারাপ, আরো খারাপ কিছুতেই মায়ের চোখ দুটো আঁকতে পারছিলাম না !
তুই এলি, কিন্তু... 
নিচে বেল বাজে
.. "আমি নিচে গিয়ে খুলে দিচ্ছি.. "
না, থাক... অনিমা মাসি আছে খুলে দেবে, তুই এখানে আয়... !
আপনি ঐদিক টা ঘুরে ছোটো গেট এর কাছে আসুন, আমার রান্নার মাসি খুলে দেবেন !
... "এই লোকটাকে তুই বাড়িতে আসতে বললি.. !"
গিটার তুলে শুভ বলে... "তিন বছরেও তোর মনে জায়গা নিতে পারলাম না... আর এই লোকটা তিনদিনেই.... "
তিন ঘন্টায় শুভ, তিন ঘন্টায় !তোকে মিছিল এ নিতে পারিনি কোনোদিন, মিছিলএর গান তোর সহ্য হতোনা... তোর ওই জাত পাতের আদর্শ আমার মনে তোকে ঠাঁই নিতে দেয়নি শুভ, হুম বন্ধু আমার তুই... গানের বন্ধু.. !
ভদ্রলোক আসে... আসুন 
'এই যে আপনার মায়ের ছবি, এটা মালা... !'
আপনার সাথে আলাপ করিয়ে দিই.. আমার বন্ধু গিটারিস্ট শুভ, 
'হ্যালো.. বাবলু, বাবলু শেখ !আপনার কথা লি র মুখে শুনেছি... i glad to meet you here !'
...'আপনি মুসলমান !'
লিসা সজোরে হোহো করে হেসে ওঠে... সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নামতে থাকে শুভ!!


চলুন, বসবেন তো... !
.. "হুম গান না শুনে যাবোই না !"
বেশ... কী খাবেন বলুন এখন? 
.. "চা, লিকার... "
লিসা নিচে যায় চা বলতে, এরই মধ্যে বাবলু উঠে ঘরের তিন দেওয়াল জুড়ে লিসার পেইন্টিং গুলো দেখতে থাকে... সব কটা পেইন্টিং এ এক মানবীর ব্যাথা যন্ত্রণার অস্তিত্ব অনুভূত হয় !ছবির নিচে টাইটেল দেখে বাবলুর ভাবনা নিশ্চিত হয়... !
পিছন থেকে লিসার কথা কানে যায় বাবলুর... ছবি দেখছেন !এদিকে আসুন চা ঠান্ডা হয়ে যাবে !
ধীর পায়ে টি টেবিল এর বিপরীতে থাকা সোফায় এসে বসে বাবলু!
.. "আবার ডিম ভাজা !আমার খুব প্রিয়, গান কখন শুনবো গান !"
শোনাবো, আপনার আনা মালাটা মায়ের ফটো তে দিলাম !আপনি কিন্তু লাঞ্চ করে যাবেন !
... "না, আজ অন্য কাজ আছে, আমাকে একবার হসপিটালে যেতে হবে... "
প্লিজ, আপনি এই অসময়ে চলে যাবেন না !
.. "কথা দিচ্ছি অন্যদিন এসে খেয়ে যাবো..

কী ভাবছেন..? 
.. "কিছু না, ও হ্যাঁ, ভাবছি কোনটা আপনার বেশি পছন্দের..? "
মানে? 
.. "সঙ্গীত না আঁকা কোনটা? "
গানের মধ্যে মাকে খুঁজে পাই.. সুর আমার রক্তে.. ছবি তো ছোটবেলা থেকেই আঁকি.. মা বলতো আমার বাপি নাকি দারুন আঁকতেন.. আমি সে হাত টা পেয়েছি.. এটা মায়ের কথা !
ছবি আঁকা আর গান গাওয়া দুটোতেই আমি এক ধরণের মিষ্টি যন্ত্রনা অনুভব করি... সে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত যাই হোক না কেন.... !

সম্বিত ফেরে লিসার, লিসার মোবাইল বাজে.... 
মোবাইলে তার বিশিষ্ট বন্ধু নাট্য পরিচালকের নাম ভেসে ওঠে... !
কানে মোবাইল নিয়ে লিসা বলে... আপনি? দ্রুত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়... বাবলু কে দেখে যেন প্রাণ পায় লিসা... পায়ে পায়ে পাশে গিয়ে দাঁড়ায় শুভ ও বলে... "বব ডিলানের টিউন টা আর তোলা হোলো না আমার... চলি "
এবার আমার মায়ের চোখ দুটো আমি আঁকবোই...

পিয়ানো বাজিয়ে সেই গান চলে.'.. লক্ষী সোনা পাখি আমার.. মাকে খুঁজে এনে দাও.. ও তোতা পাখি রে.. 'অঝোরে চোখ দিয়ে জল পড়ছে লিসার.. দুটো হাত আঁকড়ে ধরে পিয়ানোর টুলে বসে কান্নারত লিসা কে... 
ঠিক আজকের দিনে মা আমায় ছেড়ে চলে গেসলো !
নিচে বেল বাজে...
দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে বাবলুর উদ্দেশে নামতে থাকে লিসা... 
বাবলু চিৎকার দিয়ে ওঠে... 'লি সা.... '
লিসা হুমড়ি খেয়ে পরে বাবলুর বুকে... বাবলু ধরে নেয় লিসা কে... লিসা ডাক ছেড়ে কাঁদে.. কান্নার মাঝেই শুনতে পায় সেই ছেলেবেলায় শোনা মায়ের কণ্ঠের করুন রাগ !!



Post a Comment

0 Comments