সপ্তর্ষি-র নাট্য-উৎসব
কৌশিক পৈলান
'নাট্যমেব জয়তে' পত্রিকার ১০ জুলাই ২০২০ সংখ্যার প্রথম পাতায় প্রকাশিত
কৌশিক পৈলান
'নাট্যমেব জয়তে' পত্রিকার ১০ জুলাই ২০২০ সংখ্যার প্রথম পাতায় প্রকাশিত
কলকাতা : করুণাময়ী সপ্তর্ষি-র দ্বিতীয় নাট্য-উৎসব শেষ হল ২৩-২৫ জানুয়ারি, ২০২০ মুক্ত-অঙ্গন রঙ্গালয়ে। প্রথম দিন সন্ধ্যা ৬ টায় এই উৎসবের সূচনা করেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও নাট্য গবেষক ড. সন্ধ্যা দে এবং অভিনেতা ও পরিচালক সমীর চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ড. সন্ধ্যা দে কে উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানান দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি কৌশিক গাঙ্গুলী, ওনার হাতে তুলে দেওয়া হয় উৎসবের স্মারক এবং ফুলের টব। এরপর সমীর চৌধুরীকে উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানান দলের অপর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও কোষাধ্যক্ষ তপন পুরকাইত।
আমরা প্রতিনিয়ত পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছি। আমাদের সীমাহীন লোভ, জাগতিক সুখের চাহিদায় পরিবেশ ধীরে ধীরে প্রতিকূল হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক নেতাদের সাথে কর্পোরেট দুনিয়ার অশুভ আঁতাত এই ধ্বংসযজ্ঞকে ত্বরান্বিত করছে। আমরা নিজেরা বাঁচতে চাইছি, সঙ্গে বাঁচাতে চাইছি আগামী প্রজন্মকে। সেকারনেই বিশ্ব-উষ্ণায়ন রোধে গাছ লাগানো এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার করে ড. সন্ধ্যা দে গাছে জল দিয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন। পরে সমীর চৌধুরী, কৌশিক গাঙ্গুলী এবং তপন পুরকাইত গাছে জল দিয়ে উৎসবের শুভ সূচনা করেন।
আমাদের আরও একটা স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল "করুণাময়ী সপ্তর্ষি নাট্যপত্র,২০১৯"-এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশের মাধ্যমে। প্রকাশ করেন ড. সন্ধ্যা দে এবং সমীর চৌধুরী।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. সন্ধ্যা দে বলেন বেঁচে থাকা আর বাঁচিয়ে রাখার জন্য নাটক, প্রতিদিনের মন খারাপের মাঝে আমাদের এই নাট্য-যাপন অক্সিজেন যোগায়। শেষে তিনি সংগীত পরিবেশন করেন।
উৎসবের প্রথম দিনে প্রথম নাটক ছিল চন্দননগর সৃজনের 'সম্পর্ক'। নাট্যকার ও পরিচালক ধীমান দাস এই নাটকে সম্পর্ক প্রকাশ করেছেন ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, মনুষ্যত্ব দিয়ে। পরের নাটক ছিল রঙ্গ-ব্যাঙ্গ অদ্বিতীয়ার 'চোখের যত্ন নিন'। গৌতম রায়ের কাহিনী নিয়ে এই হাস্য রসাত্মক নাটকের অবতারণা করেছেন সুশান্তনীল ঘোষ।নাটকে নির্ঝঞ্ঝাট কেরানি শ্যামলের জীবন চলছিল রোজকারের মতোই । কিন্তু একদিন হঠাৎ তার প্রাক্তন বান্ধবী মিষ্টি এসে হাজির হয় এবং বলে তাঁর স্বামী অন্ধ হয়ে যাচ্ছে আই রিপ্লেসমেন্টের জন্য শ্যামলের চোখ দুটো চাই, ইতিমধ্যেই দশ বছর বাদে শ্যামলের ছোট ভাই অমল এসে হাজির হয় এবং পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে তাঁর ছেলের জন্য শ্যামলের চোখদুটো নিতে চায়। একে একে বিভিন্ন পরিচিত মানুষ আসতে থাকে, যাদের প্রত্যেকেরই চোখ চাই। কিন্ত চোখ থাকলেই কি দেখা যায়? চোখ থাকতেও আমার অন্ধ, তাই সবার চোখের যত্ন নিতে হবে।
দ্বিতীয় দিনে প্রথম নাটক রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধের
'সোনমণি'। নাটক ও প্রয়োগ: দানী কর্মকার।3 রাজস্থানের প্রেক্ষিতে নারীর প্রতিবাদের, প্রতিরোধের গল্প। পরের নাটক ছিল বঙ্গীয় নাট্যাঙ্গানের 'রিপোর্টার' নাট্যকার ও পরিচালক ভাস্কর চক্রবর্তী এই নাটকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ রূপে সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরতে চেয়েছেন।
উৎসবের তৃতীয় ও শেষ দিনে প্রথমে ছিল আয়োজকদের নবতম প্রযোজনা মনোজ মিত্রের 'আঁখি পল্লব'। আঁখি, এক সাধারণ সমকালীন চিন্তাভাবনার মেয়ে। বিপরীতে পল্লব, শান্ত স্বভাবের আবেগপ্রবণ গবেষক। গল্পের শুরুতে দেখা যায় তাদের সংসারে অনটনের মধ্যেও পরস্পরের প্রতি পরস্পর ভরসায় বাঁচে।আঁখির অনুলেখিকার চাকরি করে যা ওদের একমাত্র রোজগার। পল্লব তার স্বর্গীয় মাস্টারমশায়ের থেকে পাওয়া এক প্রাচীন পুঁথির রচনাকারীর হদিশ খুঁজতে সারাদিন ওই প্রাচীন পুঁথি আর অন্যান্য সহায়ক বইতে মুখ গুঁজে থাকে। এতেই আঁখি গভীরভাবে আশঙ্কিত, যা জন্ম দেয় অভিমানের, অনুযোগের। এরই মধ্যে একদিন পল্লবের হাতে আসে শিলচরে আঁখির নতুন চাকরির নিয়োগপত্র। স্ত্রীকে হারানোর ভয় তাকে ঘিরে ধরে। অভিমান আর আশঙ্কা থেকেই দাম্পত্য কলহ। প্রবল কথা কাটাকাটির পরে অপমানিত আঁখি একাকিত্বে স্বামীর গবেষণা ও আসন্ন খ্যাতির কাছে তাকে হারানোর ভয় প্রকাশ্যে আনে। ভাগ্যের ফেরে ওই একই চাকরি পল্লবের কাছে আসে যা সে সানন্দে গ্রহণ করে। কিন্তু পরমুহূর্তেই বিবেক দংশনের হাত থেকে মুক্তি পেতে নিজেকেই শেষ করে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। কি হল এরপর? অঙ্কিতা দিন্দা এবং অভিনেতা ও পরিচালক অমিত রায়ের দাপুটে অভিনয়ের সঙ্গে ইতি দাস ও তপন পুরকাইতের যোগ্য সঙ্গত এই নাটকে ক্লাইম্যাক্স ধরে রাখে। উৎসবের শেষ নাটক ছিল টালিগঞ্জ স্বপ্নমৈত্রীর 'লুকোচুরি'। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পান্তাবুড়ি গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছেন শ্রীজীব গোস্বামী। এক বুড়ি যার দিন চলে পান্তা খেয়ে। হঠাৎ তার পান্তা চুরি হয়ে যায়। বুড়ি ভাবে রাজাকে নালিশ করবে, কিন্তু তার বন্ধুরা তাকে বারণ করে। বুড়ি কি আর বারণ শোনে, চোর সে ধরবেই। চোর ধরা পড়ল। রূপকের আড়ালে সমাজের ক্লেদাক্ত রূপ তুলে ধরে পরিত্রানের সন্ধান করেছেন পরিচালক ইন্দ্রনীল মুখার্জী।









0 Comments