দু’মাসে পাওয়ার আশা ক্ষীণ - অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাক্সিন পরীক্ষার ফলাফল কতটা যুক্তিসম্মত ?



বিভিন্ন গণমাধ্যমের কল্যানে আমরা সবাই ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছি যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষায় মানবদেহে করোনা ভ্যাক্সিন (ChAdOx1 nCoV-19) প্রয়োগের প্রাথমিক ফলাফল-সম্বলিত গবেষণাপত্রটি ‘ল্যানসেট’ জার্নাল-এ গতকাল অর্থাৎ ২০শে জুলাই প্রকাশিত হয়েছে। এই পরীক্ষাটি নিয়ে আগে থেকেই সাধারণ মানুষের মনে অনেক উৎসাহ তৈরি হয়েছিল। গবেষণাপত্র প্রকাশের আগেই অনেক বৈদ্যুতিন, মুদ্রণ ও সামাজিক গণমাধ্যমে প্রায় ঢক্কানিনাদ সহকারে প্রচার করা হয়েছে যে ভ্যাক্সিনটি ইতিমধ্যেই সফল, কার্যকরী এবং মাস দু-একের মধ্যেই সকলের ব্যবহারের জন্য পাওয়া যাবে। গণমাধ্যমের প্রচার শুনে অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন যে এই ভ্যাক্সিন পরীক্ষার ফলাফল থেকে আমাদের কতটা উৎসাহিত হওয়া যুক্তিসম্মত। আমি খুব সংক্ষিপ্ত আর যতটা সম্ভব সরলাকারে বলার চেষ্টা করছি এই পরীক্ষার প্রাথমিক ফল থেকে কি কি জানা গেল আর কি কি এখনও জানা বাকি।


    
         পরীক্ষাটি (ট্রায়াল পর্যায় – ১ম ও ২য়) ২৩শে এপ্রিল থেকে ২১শে মে, ২০২০-এর মধ্যে করা হয়েছে ১০৭৭ জন সুস্থ পূর্ণবয়স্ক (১৮-৫৫) স্বেচ্ছাসেবীর উপর। এঁদের মধ্যে কিছু স্বেচ্ছাসেবী ভ্যাক্সিন পেয়েছেন আর কিছু স্বেচ্ছাসেবী পেয়েছেন ছদ্ম-ভ্যাক্সিন। এই বিশেষ পরীক্ষাটি ছিল ‘সিঙ্গল ব্লাইন্ডেড’ প্রকৃতির অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবীরা জানতেন কে ভ্যাক্সিন নিয়েছেন আর কে ছদ্ম- ভ্যাক্সিন। কিন্তু যাঁরা তাঁদের শারীরিক অবস্থার পর্যালোচনা করছিলেন এবং রেকর্ড রাখছিলেন, তাঁদের জানানো হয় নি কে ভ্যাক্সিন গ্রুপের আর কে ছদ্ম-ভ্যাক্সিন গ্রুপের। প্রসঙ্গতঃ, ‘ডাবল ব্লাইন্ডেড’ পরীক্ষার ক্ষেত্রে কাউকেই জানানো হয় না কে কোন গ্রুপের। এরপরে রাশিবিজ্ঞানের অনেক গাণিতিক হিসাব নিকাশ করে দেখা হয়েছে যে এই দুই গ্রুপের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই কোনো পার্থক্য আছে কিনা এবং তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।  

         এই গবেষণাপত্র থেকে আমরা কি কি জানতে পারলাম-

১) নিরাপত্তা- এই ভ্যাক্সিন প্রাথমিকভাবে নিরাপদ। প্রয়োগের ফলে যে ধরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া  দেখা গেছে যেমন -যন্ত্রণা, মাথাব্যথা, জ্বর-জ্বর অনুভূতি, পেশীব্যথা, শারীরিক অস্বস্তি ইত্যাদি, সেগুলির কোনোটি-ই মারাত্মক কিছু নয়। সাধারণ প্যারাসিটামল দিয়ে এই সমস্যাগুলি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং ভ্যাক্সিনটি গ্রহণের সহনক্ষমতা বাড়ানো যায়। 

২) হিউমোরাল ইমিউনিটি- ভ্যাক্সিন প্রয়োগের ২৮ দিনের মধ্যে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে যা কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী SARS-CoV-২ ভাইরাস-এর বাইরের কাঁটার সঙ্গে আটকে ভাইরাস-কে নিষ্ক্রিয় করে দিতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ২৮ দিন পরে এঁদের ১০ জনের উপর দ্বিতীয় ডোজ (বুস্টার) প্রয়োগে দেখা গেছে  এঁদের প্রত্যেকের মধ্যে ভাইরাস-নিষ্ক্রিয়কারী অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। 

৩) সেল-মিডিয়েটেড ইমিউনিটি- ভ্যাক্সিন প্রয়োগের ১৪ দিনের মাথায় বিশেষ ধরণের টি-কোষের সক্রিয়তা সব থেকে বেশী পাওয়া গেছে। তারপরও অন্তত ৪২ দিন (ভ্যাক্সিন প্রয়োগের ৫৬ দিন পর পর্যন্ত) এর সক্রিয়তা পাওয়া গেছে, তবে ১৪ দিনের পর থেকে তা কমেছে। বুস্টার ডোজ-এ এই ক্ষেত্রে কোনো লাভ হয় নি (এই প্রকারের অন্যান্য ভ্যাক্সিন-এর ক্ষেত্রে আগেও অবশ্য সেইরকম-ই ফলাফল ছিল)। এই টি-কোষ ভাইরাস-আক্রান্ত দেহকোষকে মেরে ফেলে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।




           কি কি এখনও জানা বাকি-

১) কার্যকারিতা- এই ভ্যাক্সিন প্রয়োগের ফলে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি বা নির্দিষ্ট টি-কোষ মানবদেহে সংক্রমণ রুখতে সত্যিই কার্যকরী কিনা। অর্থাৎ ভ্যাক্সিন নেওয়ার পরে শরীরে ভাইরাস ঢুকলে এই নতুন অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে নিষ্ক্রিয় করতে পারছে কিনা। শরীরের বাইরে পরীক্ষাগারের পাত্রে ভাইরাস নিষ্ক্রিয়করণে সক্ষম হলেও শরীরের ভিতরে সেটা হবে কিনা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তার জন্য অপেক্ষা করে দেখতে হবে যে যাঁরা এই ভ্যাক্সিন পেলেন তাঁরা ভবিষ্যতে সংক্রমিত হচ্ছেন কিনা, হলে যাঁরা ভ্যাক্সিন নেন নি তাঁদের থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম কিনা। উল্লেখযোগ্যভাবে কম হলে তবেই বলা যাবে ভ্যাক্সিন সফল।

২) সংক্রমণের পরবর্তী নিরাপত্তা- কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাক্সিন নেওয়া গ্রুপ-এ সংক্রমণের হার কিন্তু ভ্যাক্সিন না নেওয়া গ্রুপের থেকে বেশীও হতে পারে, একে বলা হয় ‘অ্যান্টিবডি -ডিপেন্ডেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট’। এক্ষেত্রে এই অ্যান্টিবডি ভাইরাস-কে নিষ্ক্রিয় করার বদলে তাকে উল্টে সাহায্য করে দেহকোষের ভিতরে ঢুকতে। এইরকম আগে কয়েকবার ঘটেছে SARS, MERS, ডেঙ্গি-র ক্ষেত্রে। বিশেষ করে যদি ভাইরাসটি নিজেকে সামান্য পরিবর্তন (মিউটেশন) করে তখন এরকম হতেই পারে। সেক্ষেত্রে বিপদ অনেক, সুস্থ মানুষ ভ্যাক্সিন নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তাই এই বিষয়টি নিশ্চিত হবার পরেই সকলের জন্য ভ্যাক্সিন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া উচিৎ।  

৩) স্থায়িত্ব- এই অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতা ভ্যাক্সিন নেবার পরে শরীরে কতদিন পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে তা জানা যায় নি এখনই। জানা যায় নি এমন কোনো প্রতিরোধক্ষম স্মৃতিকোষ তৈরি হচ্ছে কিনা যা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, যারা ভাইরাস আবার আক্রমণ করলে পুরনো শত্রুকে দেখেই চিনে নিয়ে তাড়াতাড়ি সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করে পরবর্তী সংক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করতে পারবে।

৪) সার্বিকতা- বয়স্করা (৫৫ বছর বয়সের ঊর্দ্ধে), অসুস্থরা (কো-মর্বিডিটি আছে এমন), অল্প বয়সীরা (১৮-এর নিচে) এই পরীক্ষার অন্তর্গত ছিলেন না। কিন্তু এই রোগে অসুস্থ এবং বয়স্করাই বেশি মারা যাচ্ছেন, তাই তাদের ক্ষেত্রে এটি কতটা নিরাপদ এবং কার্যকরী তা জানা প্রয়োজন। স্বেচ্ছাসেবী যাঁরা এতে অংশগ্রহণ করেছেন অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ ইউরোপিয়ান। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন জনজাতির উপরে এর প্রভাব কি দেখা দরকার সার্বিকভাবে ভ্যাক্সিন প্রয়োগের অনুমতি দেবার আগে। 

 এছাড়াও কিছু টেকনিক্যাল সীমাবদ্ধতা ছিল, যেমন – সিঙ্গল ব্লাইন্ডেড পরীক্ষা (হওয়া উচিৎ ডাবল ব্লাইন্ডেড), বুস্টার ডোজ-এর গ্রুপ অত্যন্ত ছোট এবং নন্‌-র‍্যান্ডমাইজ্‌ড, দীর্ঘকালীন নিরাপত্তা বোঝার জন্য যথেষ্ট সময় না অপেক্ষা করা। 


            উপরোক্ত সীমাবদ্ধতাগুলি সত্ত্বেও প্রাথমিক ফলাফল হিসাবে এটি একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফলাফল। গবেষক ও অংশগ্রহণকারী স্বেচ্ছাসেবীদের ধন্যবাদ প্রাপ্য। এই গবেষণায় যুক্ত  গবেষকরা নিজেরাই অধিকাংশ সীমাবদ্ধতাগুলি লিপিবদ্ধ করেছেন এবং ৩য় পর্যায়ের পরীক্ষায় সেগুলি দেখার কথা বলেছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা এখনও চলছে, তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাও শুরু হয়ে গেছে এবং তা ব্রাজিল, দঃ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে করা হচ্ছে। আগামী পর্যায়গুলিতে বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তিদের উপরও পরীক্ষা করা হবে, সব শেষে শিশুদের উপরও পরীক্ষা হবে। এই পত্রেই বলা হয়েছে যে ভ্যাক্সিন প্রয়োগের পরে অন্তত ১ বছর পর্যন্ত নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা হবে। অর্থাৎ বলা যায়, ভ্যাক্সিনটি এখনও পর্যন্ত বেশ সম্ভাবনাময় হলেও দু’মাসের মধ্যেই সকলের জন্য ভ্যাক্সিন পাওয়ার আশা ক্ষীণ।     

Dwijit GuhaSarkar
B.Sc. (Physiology) & M. Sc. (Biochemistry) from Univ of Calcutta.
PhD in Biomedical Sciences (Univ. of Massachusetts Medical School).
Postdoc Research from Bose Institute

Post a Comment

0 Comments