চন্দননগরে বাঘ
দ্রাম... এক ঝলক আগুন, ধোঁয়া...
পৌষ সংক্রান্তি। উৎসব, পাড়াঘরে উৎসবের আনন্দ।
সন্ধ্যা প্রায় নেমে এসেছে।আকাশে অল্প আলো। কেরোসিনের কুপি, হারিকেনের আলোয় উনুনের পাশে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের মা, কাকীমাদের ঘিরে ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে বসে আছে - কেউ থেবড়ে, কেউবা উবু হয়ে। ওদের সবার তীক্ষ্ণ নজর ওই হাঁড়ির দিকে, কখন নামবে হাঁড়িটা। ওই হাঁড়ির মধ্যে বগবগ করে ফুটছে সাদা সাদা পিঠে।
আজ উৎসব।
আর ঠিক ওই সময়েই, দুজোড়া জ্বলন্ত চোখ একে অন্যকে তীব্রভাবে দেখছে। একজনের চোখে বিস্ময়, অন্যজনের চোখে প্রতিশোধের আগুন।দুজনের মাঝে দূরত্ব খুব বেশী হলে ফুট পনেরো।
সন্ধ্যে হতে না হতেই বাড়ীর সব জানলা দরজা বন্ধ। গোয়ালে গরু, ছাগল... সে তো বিকেল হতে না হতেই সবাইকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।বেশ কিছুদিন ধরেই আজ এর, কয়েকদিন পরে ওর... কারুর না কারুর গোয়াল থেকে গরু, নাহলে ছাগল টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কে? কে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? বাঘ, একটা বাঘ...অনেকেই দূর থেকে দেখেছে তাকে, আশপাশের সব পাড়ায় একটা ভয় ছড়িয়ে পড়েছে।
গঙ্গার ধারে ওই যে বিরাট বাড়ীটা... বড়,বড় থাম, চওড়া বারান্দা, সামনে ফুলের বাগান, ফোয়ারা... ওখানে ফরাসী সাহেবরা থাকে। লোহার গেটে যে দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে, সে তো ভোলাকাকা, অনন্তপুরে থাকে। ছেলেটা ওই 'দ্যুপ্লে কলেজ' এ পড়ে ফেরার সময় প্রায় রোজ একবার করে ওই ভোলাকাকার কাছে গিয়ে বায়না করত একটা কুকুর বাচ্চা'র জন্যে। ওই বিশাল বাড়ীটায় যে ফরাসী সাহেব (মঁসিয়ে সি.এফ.ব্যারন, ফ্রেঞ্চ এডমিনিস্ট্রেটর) থাকে, তার একটা খুব সুন্দর কুকুর আছে, তার বাচ্চা একটা চাইই চাই ওই ছেলেটার।
কুকুর তো একটা লাগবেই। ছেলেটা যখন ডাক্তারবাবুর সঙ্গে সরস্বতী নদী, অনন্তপুর, শঙ্করবাটি... এসব জায়গায় যায়, তখন সে দেখে, ডাক্তারবাবুর বন্দুকের গুলি লাগা মরা হরিয়াল, বড় বড় হাঁসগুলোকে দৌড়ে গিয়ে মুখে করে নিয়ে আসছে ডাক্তারবাবুর কুকুর পপি। কাঁধে ডাক্তারবাবুর বন্দুকটা ঝুলিয়ে যখন সে হেঁটে যেত,তখন নানা স্বপ্ন দেখত সে। একদিন তারও একটা বন্দুক হবে, সে উড়ন্ত পাখী মারবে, একটা কুকুর থাকবে... আকাশে সার সার কত বড় বড় পাখী... সরস্বতী নদীর ধারে হরিয়াল পাখির মেলা...
এই নে, ব্যাগটা ধর, কাউকে কিছু বলবি না, যা পালা। ভোলাকাকার থেকে ব্যাগটা নিয়ে দৌড় দিল ছেলেটা। কুঁই, কুঁই,কুঁই... পেয়ে গেছে, পেয়ে গেছে তার অনেকদিনের চাওয়া সেই ছোট্ট, নরম, তুলতুলে ছানাটাকে।
ডাক্তারবাবুর চেম্বারে বসে নানান শিকারের গল্প শুনতে শুনতে ছেলেটা বড় হচ্ছিল, তখন তার বয়স চোদ্দ। একলব্যের মতো ছেলেটা ডাক্তারবাবুকে দেখত কেমন করে গুলি ভরে, কেমন করে ট্রিগার টানে, কেমন করে বন্দুকে একচোখ বুঝে নিশানা লাগাতে হয়।
বড়দার ঘরে বন্ধ কাঁচের আলমারিটার ভেতরে রাখা বন্দুকটার দিকে রোজ দেখে ছেলেটা। সেটা হাতে নেবার খুব ইচ্ছে তার। একদিন দুপুরে ঘুমন্ত বৌদির আঁচল থেকে চুপিসাড়ে আলমারির চাবিটা খুলে নিল সে। তারপর আস্তে আস্তে বার করল সেই দোনলা বন্দুক। তাদের বিরাট বাড়ীর একটা ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল ছেলেটা। ঠিক ডাক্তারবাবুর মতো করে বন্দুকে গুলি ভরল...
কুঁই, কুঁই করা ছোট্ট কুকুরছানাটা বড় হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে, নাম তার টমি। পপির সঙ্গে সেও যেতে লাগল সরস্বতীর ধারে, অনন্তপুরের মাঠে, বিলকুলির জঙ্গলে। সেও একদিন মুখে করে কুড়িয়ে আনল হরিয়াল পাখী। ছেলেটা খুব ভালবাসত তার টমি'কে। টমি যেন তার প্রাণ।
বন্ধ ঘরের জানলা দিয়ে ওই বড় জামরুল গাছে বসা একটা কাক'কে নিশানা করল ছেলেটা। একচোখ বুজে, ট্রিগারটা খুললো, ক্লিক - একটা শব্দ, তারপর নির্ভুল নিশানায় উড়িয়ে দিল কাকটাকে।
আওয়াজ, বন্দুকের আওয়াজ, এই ভর দুপুরে কে বন্দুক চালালো! কে ! হৈ, হৈ, চিৎকার, চেঁচামেচি... বাড়ীর লোকেরা আবিষ্কার করল বন্ধ দরজার ওপাশের ছেলেটাকে। দরজা খোল, দরজা খোল...
দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সে, হাতে বড়দার বন্দুক। বন্দুক চালিয়েছিস? বন্দুক? কে শেখালো? ইত্যাদি হাজার প্রশ্ন। ছেলেটা নির্ভীকভাবে বলল, এক টিপে একটা কাক মেরেছি। কোথায় কাক! দেখি,দেখি... ছেলের নিশানা দেখে সবাই অবাক ।
গভীর রাত। কিরকম যেন সব আওয়াজ। পাড়ার কুকুরগুলো পরিত্রাহি চিৎকার করছে। বাঘ, বাঘ... বাঘ এসেছে... এবাড়ী, ওবাড়ী থেকে চেঁচামেচি, টর্চের আলো.. পরের দিন সকালে ছেলেটা দেখল তার ভালবাসার টমির মাথায় বাঘের থাবার আঘাত, সে রক্তাক্ত, মৃত। মাথায় আগুন জ্বলে উঠল ছেলেটার। বাঘের প্রতি এক তীব্র রাগ জন্মাল তার মনে। বাগে পেলে সেই বাঘকে সে মারবেই, এরকম পণ করল সে মনে মনে।
এতদিনে বাবা, বড়দার অনুমতিতে ছেলেটা তার নিশানা আরো নির্ভুল করে নিয়েছে। তাদের বিশাল ছাদে দাঁড়িয়ে সে প্রায় রোজ অভ্যাস করত বন্দুক চালানো, অফুরন্ত গুলি তাদের বাড়ীতে, গুলির দাম বিয়াল্লিশ টাকায় একশটা, ১৯৪০ বা ৪১ সাল তখন। ছেলেটার বয়স ১৭।
খবর পেল, অনন্তপুরে একজনের গোয়াল থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া গরুর আধখানা পড়ে আছে একটা জঙ্গলে। বাকী গরুটা নিশ্চয়ই খেতে আসবে বাঘটা। টমি'র বদলা নিতেই হবে। সন্ধ্যের মুখে একজনকে সঙ্গী করে কাছাকাছি একটা গাছে উঠে বসল ছেলেটা। অপেক্ষা, অপেক্ষা। মশা, নানা পোকামাকড়ের কামড় কিছুই খেয়াল করছে না সে, তীক্ষ্ণ চোখে নজর রেখেছে ওই আধখাওয়া গরুটার দিকে। জঙ্গলে দপ দপ করে জ্বলে উঠল একজোড়া চোখ। নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে যমদূত, ক্লিক-ট্রিগার অন করল ছেলেটা.. হঠাৎ চটাস করে একটা আওয়াজ, সঙ্গী মশা মারল। যমদূত মুখ তুলে দেখল গাছের দিকে। তারপর? তারপর আর সে নেই। পারল না সেদিন ছেলেটা তার টমির হত্যার বদলা নিতে।
কিছুদিন পরে ছেলেটা আরো একবার ব্যর্থ হোল প্রতিশোধ নিতে। এবারও তার আর এক সঙ্গীর দোষে। তাই ছেলেটা মনে মনে ভেবে নিল, আর নয়, আর কাউকে সঙ্গে নেবেনা, এবার সে একাই যাবে, একা, সামনাসামনি, মুখোমুখি। এখন ছেলেটার বয়স ১৭। কালো কুচকুচে পাথরের মতো শরীর, রীতিমতো কুস্তি লড়া শরীর, দুর্জয় সাহস তার। এখন সে তরতাজা এক যুবক।
পৌষ সংক্রান্তির সকালে যুবক খবর পেল, কাদের গোয়ালের গরু নিয়ে গেছে বাঘে। আধখাওয়া গরুটা পড়ে আছে একটা ডোবার ধারে।আজকেই মারতে যাব বাঘটাকে। যাবার আগে মা'কে প্রণাম করে ছেলেটা বলল, 'মা, বাঘ মারতে যাচ্ছি, আশীর্বাদ করো'। মায়ের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে, বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ বড়দার সেই বন্দুক নিয়ে ছেলেটা পৌঁছে গেল সেই ডোবার ধারে। একা। সম্পূর্ণ একা।শীতকাল।
দ্রুত অন্ধকার নেমে আসছে। ছেলেটা দেখল আধখাওয়া গরুটা পড়ে আছে। একটা শিয়াল দাঁড়িয়ে সেখানে। পালালো শিয়ালটা। ওই গরুটার থেকে ফুট পনেরো দূরে গিয়ে বন্দুক হাতে দাঁড়ালো ছেলেটা। চারদিক দেখছে সে। অন্ধকার নেমে আসছে, দু একটা জোনাকি জ্বলছে নিভছে। সময় চলে যাচ্ছে। অপেক্ষা, অপেক্ষা। যদি আসে সে। যদি... এলো, সে এলো।
গরুটার পেছনদিক দিয়ে এসে, সে দাঁড়ালো। হলুদ শরীরে কালো ছোপ ছোপ দাগ। তার বড় বড় চোখ দুটো অন্ধকারে দপ দপ করে জ্বলছে। ছেলেটা আর তার মাঝের দূরত্ব খুব বেশি হলে পনেরো ফুট। একদম সামনাসামনি, মুখোমুখি, দুজনেই মাটিতে দাঁড়িয়ে। কয়েক মূহুর্ত... ছেলেটা ট্রিগার টানলো, ক্লিক- আওয়াজ। দ্রাম... এক ঝলক আগুন, ধোঁয়া, গুলি সোজা গিয়ে লাগলো যমদূতের বুকে। লাফ, এক মরণপণ লাফ দিল বাঘটা ওই ছেলেটার দিকে। ডাক্তারবাবুর শেখানো শিকারের নিয়ম মেনে, গুলি চালিয়েই, গুলি চালানোর জায়গা থেকে পিছিয়ে এসেছে ছেলেটা। গুলি খাওয়া বাঘ লাফ দিয়ে এসে পড়ল ঠিক ওখানেই, যেখানে ছেলেটা ফ্র্যাকসান অফ সেকেন্ড আগে দাঁড়িয়েছিল ঠিক সেখানেই। তখনও মরেনি সে, থর থর করে কাঁপছে। এগিয়ে এলো ছেলেটা। বাঘটার গায়ে পা রেখে, পায়ের জয়েন্টে আরো একটা গুলি করল। প্রচণ্ড জোরে কেঁপে উঠে নিথর হয়ে গেল চিতাবাঘটা। ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা কুড়ি।
হৈ, হৈ, চিৎকার, চেঁচামেচি... বিলকুলি,বকুবপুর, বেজড়া.. সব গ্রামের লোক দৌড়ে দৌড়ে আসছে। কারুর হাতে টর্চ, কারুর হাতে হারিকেন, কেউ কেউ হ্যাজাক জ্বেলে এনেছে... বাঁশের মাচা তৈরী হয়ে গেল, সেই মাচায় সেই চিতাবাঘ আর ছেলেটা। সবাই মিলে মাচা কাঁধে করে নিয়ে আসলো তাদের বাড়ীর ওই বিশাল উঠোনে।
লোক, লোক, সারারাত লোক এলো আর গেলো। সবাই সেই মরা বাঘকে দেখে যাচ্ছে। খবর পেয়ে পরের দিন ছুটে এলেন হুগলী জেলার মাননীয় ম্যাজিস্ট্রেট এস.দত্তমজুমদার। তাঁর পরিবার, তিনি আর এই যুবকের ছবি তোলা হোল। সরকারী ভাবে বাঘের দৈর্ঘ্য মাপা হোল - ছ' ফুট সাত ইঞ্চি। ডুপ্লে কলেজের সহপাঠিরা এসে তাকে নিয়ে গেল স্কুলে, সেখানে হেডমাস্টারমশাই ফটিকবাবু যুবকের হাতে তুলে দিলেন পুরষ্কার। এখন যেখানে সিভিল কোর্ট সেখানেই বসত চন্দননগরের শাসন পরিষদ, সেই অফিসে নিয়ে যাওয়া হোল যুবককে, সেখানেও তাকে সম্বর্ধনা দেওয়া হোল।
হ্যাঁ, এখন বন্যপ্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ। কিন্তু তখন এটাই ছিল খুব বীরত্বের কাজ। বাঘ মারলে সরকার থেকে কুড়ি টাকা পুরষ্কার দেওয়া হোত, পরে এতই বাঘ মারার লোক হয়ে গেল যে, সরকার তার পুরষ্কার মূল্য কমিয়ে করল আট টাকা।
পরের দিন যুবকের বড়দা সেই চিতাবাঘের মাথা সমেত চামড়া নিয়ে গেলেন কোলকাতায় কাথবার্টসন অ্যাণ্ড হারপার এর দোকানে। এই দোকানের স্টাফ করা দুটো বাঘের চামড়া আজকেও যুবকের বাড়ীতে আছে।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, দুটো চামড়া। সেই যুবক আজ তাঁর এই বয়সেও খুবই সক্রিয় এবং তাঁর স্মৃতি সত্যিই অভাবনীয়। এনার নাম মাননীয় পশুপতি মান্না। এইতো আমাদের এই মনসাতলাতেই তাঁদের বাড়ী। সবাই 'মান্নাবাড়ী' বলেই জানে।
ওই বাঘ মারা যাবার পর বছর দুয়েক আর কারুর গরু, ছাগল খোয়া যায়নি। দুবছর পরে আবার এক বাঘিনী এসে উপস্থিত হোল। এবারেও ওই যুবক সামনাসামনি দাঁড়াল সেই বাঘিনীর সামনে।
চাঁদনী রাতে, ঘড়িতে সাড়ে আট, বিলকুলি'তে একটা হিমসাগর গাছের ডালে বসে, এগিয়ে আসা বাঘিনীকে পেয়ে গিয়েছিল সে। চাঁদের আলো বাঘিনীর গায়ে চকচক করছিল। সেই বাঘিনীর একদম ঠিক কপালের মাঝে গুলি চালিয়েছিল সে। বাঘিনী সেই অবস্থাতেই বেশ কিছুটা দূর চলে গিয়েছিল। যুবক তার পেছনে ধাওয়া করে তাকে দ্বিতীয় গুলি করে তাকে যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিল। সেই বাঘিনীর মাথা চুরচুর হয়ে যাওয়ায়, বাড়ীতে শুধু তার চামড়াটুকুই আছে।
নিজের একটা বন্দুকের খুব শখ ছিল তাঁর। হুগলী জেলার ম্যাজিস্ট্রেট দত্তমজুমদার সাহেব বলেছিলেন, তোমার একুশ বছর বয়স হোক, তখন তুমি কিনে নিও। এখন তো তোমাকে লাইসেন্স দেওয়া যাবেনা। আমি তোমাকে একটা সার্টিফিকেট দেব, সেই সার্টিফিকেট দেখিয়ে একুশ বছর বয়স হলেই তুমি লাইসেন্স পাবে।উনি সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। সাবালক হবার পর, নিজের রোজগারের পয়সায় কিনেছিলেন ডবল ব্যারেল 'হলওয়ে নর্টন' রাইফেল।
আজ যেখানে আমাদের চন্দননগর মিউজিয়ম, সেই মিউজিয়াম এর পেছনদিকের লনে ছিল চন্দননগর রাইফেল ক্লাব। সেই ক্লাবের সদস্য ছিলেন তিনি।
ওনার নির্ভুল নিশানার কথা জেনে, অবিভক্ত ২৪ পরগণা জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ গ্রেগরী গোমজ তাঁকে ডেকে পাঠান এবং দুজনে একসঙ্গে সুন্দরবনে শিকার করতে যান।
আজকেও তাঁর স্মৃতিতে এইসব ঘটনা, কথা উজ্জ্বল হয়ে আছে।
একটা সময় ছিল, যখন চন্দননগরের পশ্চিমদিকের এই নবগ্রাম, ব্যাজড়া, শ্বেতপুর, নপাড়া ইত্যাদি জায়গায় গভীর জঙ্গল ছিল। সরস্বতী নদীর ধারেও জঙ্গল ছিল। এক ফরাসী পর্যটকের লেখায় জানা যায়, এসব এলাকায় বাঘ দেখা যেত। একসময়ে চন্দননগরে সুন্দরী গাছের জঙ্গল ছিল, যা মাটির তলায় চলে গিয়ে ফসিল হয়ে আছে।
১১ ই অক্টোবর, ১৭৩৭ সালে এক বিরাট ঝড় হয়, সেই ঝড়ে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ মারা যান এবং এদের সঙ্গে মিশেছিল অসংখ্য গরু, ছাগল, ঘোড়া, বাঘ, এমনকি কুমীরের মৃতদেহ।
এ সবই ইতিহাসের পাতায় আছে।
কিন্তু আমি আজ যে ঘটনার কথা বললাম, এও ইতিহাস। আমাদের শহরে আরো এরকম ইতিহাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমাদের উচিত সেইসব ইতিহাস খুঁজে বের করা। নচেৎ সেই ইতিহাস চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে।\
--------------------------------------
নোটঃ
1.বড়দাঃ মাননীয় অনাদি মান্না। প্রখ্যাত সমাজসেবী এবং ব্যবসায়ী। সেই আমলে এনাদের ব্যবসা চলত এখনকার বাংলাদেশে, মায়নামার ইত্যাদি জায়গায়। সরস্বতী নদী দিয়ে তাঁদের মালপত্র আসাযাওয়া করত।এনার নামে খলিসানী বিদ্যামন্দির এর মাঠে মঞ্চ আছে।
2.ডাক্তারবাবুঃ ডাঃ মণিমোহন মুখোপাধ্যায়। এনার বাড়ী ছিল লালবাগানে। সেই সময়ে, বউবাজারে অজিত পাল এর এখনকার কাপড়ের দোকানের পাশে তাঁর চেম্বার ছিল। ঘোড়ার গাড়ী করে লালবাগান থেকে এই চেম্বারে আসতেন তিনি। তাঁর শিকারের শখ ছিল। শিকার সংক্রান্ত নানা ইংরাজী পত্রপত্রিকা আসত তাঁর কাছে।
3.দ্যুপ্লে কলেজঃ আজকের কানাইলাল বিদ্যামন্দির। ১৮৬২ সালে চন্দননগরে প্রথম ফরাসী স্কুল শুরু হয়, নাম ছিল Ecole de Sainte Marie. সেই স্কুলেরই ১৯০১ সালে ফরাসী শাসক জোসেফ ফ্রাঁসোয়া দ্যুপ্লে এর নামে নাম হয় দ্যুপ্লে কলেজ। দ্যুপ্লে কলেজ নাম হলেও এই স্কুল একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ফরাসী শিক্ষা ব্যবস্থায় কলেজ(ফরাসী বানানটা লিখতে পারলাম না) বলতে ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস নাইন বোঝায়। ১৯৪৮ সালের ৯ মে, শহীদ কানাইলালের নামে এই স্কুলের নাম হয় 'কানাইলাল বিদ্যামন্দির'।
4.গঙ্গার ধারে ওই বিরাট বাড়ী - আজ যেটা চন্দননগর মিউজিয়ম বা Institute De Chandernagar. এটাই ছিল ফরাসী শাসক দুপ্লে'র বাসস্থান, পরে অন্যান্য ফরাসী শাসকদের।
5. মাননীয় পশুপতি মান্নার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর জন্ম তারিখ ২২ ডিসেম্বর, ১৯২৪. এবং উনি তাঁর ১৭ বছর বয়সে প্রথম বাঘটিকে মেরেছিলেন। ওনার কথা অনুযায়ী এই ঘটনা ১৯৪১ সালের। কিন্তু ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এর সার্টিফিকেট অনুযায়ী এই ঘটনা ঘটেছিল ১৩ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে। তখন তাঁর বয়স ১৭, এটাও উল্লেখ করা আছে। আমরা কোন তারিখ বা বয়স বা তাঁর জন্ম তারিখ গ্রহণ করব, সেটা পাঠকই ঠিক করবেন। তারিখটা যাই হোক না কেন, ঘটনাটা ঘটেছিল।
6. ১৯৫০ এ এই ঘটনা ঘটেছিল মেনে নিলে, তখনকার ফ্রেঞ্চ এডমিনিস্ট্রেটর এর নাম ছিল
Mr. G.H.Tailleur. June 49 এ চন্দনননগর এর শাসনব্যবস্থা চলে এসেছিল শাসন পরিষদ এর কাছে। May 1950 এ Mr. Tailleur চন্দনননগর ছেড়ে চলে যান। যেহেতু, পশুপতিবাবুর কথায় জানা যায়, চন্দননগর শাসন পরিষদ তাঁকে সম্বর্ধনা দিয়েছিল, সেই হেতু এটা ধরে নেওয়া যায়, এই ঘটনা ১৯৫০ এ হয়েছিল।
#কৃতজ্ঞতা - মাননীয় পশুপতি মান্না, নটরাজ মান্না, অভিজিৎ সিংহ রায়, সুলগ্না চক্রবর্ত্তী এবং অজয় দেশী।
লেখক : তুষার ভট্টাচার্য
'ক্লাসিক' চন্দননগর নাট্যসংস্থার সঙ্গে যুক্ত ১৯৭২ সাল থেকে, ভালোবাসেন থিয়েটার । থিয়েটারের যেকোন কাজই প্রিয় কাজ তার ।
২০০১ সালে সরকারী চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন, আজও যুক্ত আছেন থিয়েটার চর্চায় ।








0 Comments