জিন্না আহমেদ
নির্দেশক : বোলপুর আমরা সবুজ
'নাট্যমেব জয়তে' পত্রিকা ২৬ জানুয়ারি ২০২০ সংখ্যার প্রথম পাতায় প্রকাশিত
নির্দেশক : বোলপুর আমরা সবুজ
'নাট্যমেব জয়তে' পত্রিকা ২৬ জানুয়ারি ২০২০ সংখ্যার প্রথম পাতায় প্রকাশিত
এই অপরূপ
পৃথিবীর বিতত সারাৎসারের উপলব্ধিজাত অভিব্যক্তির শৈল্পিক প্রকাশের অভিনব মাধ্যম হিসেবে যাঁরা থিয়েটারের বহুকৌণিক বিশ্লেষণ করেছেন তাদের মধ্যে পোলান্ডের জর্জিও গ্রটস্কি অন্যতম। তিনি থিয়েটারচর্চায় মানবীয় সম্ভাবনা ও বোধিচিত্তের অসীমতা উপলব্ধি করে এক অনুপম
বৈশিষ্টের থিয়েটাররীতির প্রবর্তন করেছেন। তাঁর এই প্রবর্তনা
উত্তরাধুনিক কালপর্বের ট্রানজিশনাল বিশ্বে বিকল্প 'থিয়েটার-ল্যাবরেটরি' হিসেবে খুবই সুপরিচিত। থিয়েটারচর্চার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই 'থিয়েটার ল্যাবরেটরি' কে অনেক
বিশ্লেষকই একটি গবেষণাগার হিসেবে অভিহিত করেছেন । কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে গ্রটস্কির থিয়েটার চর্চা নিছক একাডেমিক পরিসরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়। এ হলো মানুষের
অবদীপ্ত মননকে মন্থন করে সত্যের
অমৃতরূপের উদ্ভাসন ঘটানোর নিগূঢ় অনুশীলন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পুঁজিবাদী দুনিয়ায় যখন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় অবক্ষয়ের চিহ্নগুলো স্পষ্ট হতে শুরু
করেছিল ঠিক তখনই
থিয়েটারের নিজস্ব ভাষ্যকে অকপটে তুলে আনার অভিপ্রায় থেকেই গ্রটস্কির বিকল্পচিন্তনের শুরু। মূলত সেই সময়ের
থিয়েটারের অস্তিত্বগত সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রটস্কি প্রশ্নব্যাকুল হয়েছিলেন। তাঁর চিত্তালোড়িত জিজ্ঞাসা ছিল যে, শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম থেকে থিয়েটারের স্বাতন্ত্র্য কোথায়? এর বিশিষ্টতা কী? এবং কোথায়
নিহিত আছে এর অদম্য
শক্তি? প্রশ্নবিদ্ধ গ্রটস্কির মননের গভীরেই জন্ম নেয় এক বিকল্প
প্রত্যয়।
গ্রুটস্কির বিকল্প থিয়েটারভাবনা আবর্তিত হয় একই
সাথে থিয়েটারের আঙ্গিক ও অন্তর্বস্তুকে
কেন্দ্র করে। আঙ্গিকের দিক দিয়ে থিয়েটার শব্দটি কী তাৎপর্য বহন করে তার
উত্তর খুঁজতে গিয়ে গ্রটস্কি প্রাথমিকভাবে হতাশ হয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, থিয়েটারওয়ালাদের কাছে থিয়েটার হচ্ছে এমন একটা জায়গা যেখানে অভিনেতারা সুনির্দিষ্ট পাণ্ডুলিপি আবৃত্তি করেন, শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে দৃশ্যায়িত করেন এবং দর্শকদের কাছে তা সহজেই
বোধগম্য করে তুলতে
প্রয়াস রাখেন। এখানে পাণ্ডুলিপিই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গ্রটস্কি এই থিয়েটারকে
পাণ্ডুলিপিভিত্তিক একটা পণ্ডিতি বা তর্ক
বিতর্কের আয়োজনমাত্র বলে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, প্রথাবদ্ধ থিয়েটারে অভিনেতারা পূর্বনির্ধারিত সমানুপাতিক সক্রিয়তায়
লিপ্ত হয়। একধরনের
মধ্যযুগীয় বাকযুদ্ধ (oral
dialogu) শিল্পকেই পুনরুজ্জীবিত করা হয়
এই থিয়েটারের মাধ্যমে।
দ্বিতীয়ত, প্রথাবদ্ধ জনপ্রিয় থিয়েটারগুলোতে থাকে নিটোল প্লট-আশ্রিত কাহিনিনির্ভর শ্লথ উপস্থাপনা।এই সব থিয়েটার
নির্মাণে কাহিনির আবেগকে ত্বরান্বিতকরণের জন্যই প্রযোজকেরা প্রভূত প্রযুক্তি প্রকরণের ব্যবহার করে থাকেন। এটা সাধারণত দর্শকের সস্তা বিনোদনপিপাসাকেই চরিতার্থ করে। এই বিনোদন সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক আড়ম্বরনির্ভর, অন্তর্জাত প্রেষণার সাথে এর কোন সম্পর্ক
থাকে না। থিয়েটার নির্মাণের এই ধরনের
আড়ম্বরের বাহুল্যের বিষয়েই গ্রটস্কি প্রশ্ন তুলেছেন এবং সন্ধিগ্ধ হয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁর দেয়া একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে
পারে। যেমন আন্তিগোনে নাটক দেখার সময় দর্শকদের
অধিকাংশই আন্তিগোনের প্রতি অনুরক্ত থাকে কিন্তু থিয়েটারের বাইরে দর্শকদের মধ্যে যে ‘ক্রেয়ন’সুলভ প্রবণতা বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে এর থেকে
দর্শক মুক্ত থাকতে পারে না। প্রচলিত ধারার থিয়েটার প্রকৃতপক্ষে মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বস্তুত এই কারণেই জাগতিক ক্ষুব্ধতার স্তব্ধ উর্দ্ধলোকে সত্যের আনন্দরূপের উদ্ভাসনের মাধ্যম হিসেবে থিয়েটারের গুরুত্বকে অভিনব তাৎপর্যে তুলে ধরেছিলেন গ্রুটস্কি। তিনিই একমাত্র সেই নাট্যব্যক্তিত্ব
যিনি অকপটে অভিমত রেখেছেন যে এই প্রচলিত, গণ্ডিবদ্ধ ত্রুটিপূর্ণ ও বিপজ্জনক থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। থিয়েটারের মধ্যে যে শুধু
প্রকরণ যোগ করবে না বরং অপসারণ করবে। আত্মতাড়িত গ্রটস্কি বলেছেন, নিজেই আমরা নিজেকে জিজ্ঞাসা করবো যে, কোনগুলো ছাড়া থিয়েটার হয় না। আরোপিত
বাহুল্যকে চিহ্নিত করার জন্য গ্রটস্কি কিছু প্রশ্ন জড়ো করেছেন
এবং নিজেই উত্তর দিয়েছেন। যেমন :
থিয়েটার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ নথি তথা গবেষণাধর্মী লেখা পড়তে চান ? Click Here...
প্রশ্ন-পোশাক এবং সেট
ছাড়া কি থিয়েটারের
অস্তিত্ব কল্পনা করা যায়?
উত্তর- হ্যাঁ, পারা যায়।
প্রশ্ন- প্লটের জন্য সঙ্গীত ছাড়াই কি থিয়েটার হতে পারে?
উত্তর- হ্যাঁ, পারে।
প্রশ্ন- আলোকসজ্জা ছাড়া কি থিয়েটার হয়?
উত্তর- হ্যাঁ, অবশ্যই হয়।
প্রশ্ন- সবশেষে একটি Text বা পাণ্ডুলিপি ছাড়া কি থিয়েটার
হয়?
উত্তর- হ্যাঁ, সেটাও পারা যায়। থিয়েটারের ইতিহাস সেটা বলে। থিয়েটার শিল্পের বিবর্তনের ইতিহাসে পাণ্ডুলিপি এক সর্বশেষ
উপাদান।
কিন্তু অভিনেতা ছাড়া কি থিয়েটার কল্পনা করা যায়?
এই প্রশ্নোত্তরে
গ্রটস্কি বলেছেন, এ ধরনের কোনো উদাহরণ তাঁর জানা নেই। আবার, দর্শক ছাড়া কি থিয়েটারের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায়? এই প্রশ্নের উত্তরে গ্রটস্কি বলেছেন, থিয়েটার উপস্থাপনার প্রাক্কালে কমপক্ষে একজন দর্শকেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিষয়টিকে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, দর্শক এবং অভিনেতার মধ্যে যা কিছু
সেই মুহূর্তে ঘটে তাকেই
থিয়েটার বলা যায়।
আর সবকিছু সম্ভবত আনুষঙ্গিক হলেও অত্যাবশ্যক নয়। ধারাবাহিকভাবে
প্রচলিত থিয়েটারে ব্যবহৃত সঙ্গীত, আলো, পোশাক-পরিচ্ছদ, মুখোশ, সেট ও সাজ-সরঞ্জামের মতো উপাদানগুলোর
ব্যবহারে আকস্মিকভাবে থিয়েটার সৃজনে সমৃদ্ধি ঘটে না।
এই সব বাহুল্য
উপাদানগুলিকে গ্রটস্কি থিয়েটারের প্লাস্টিক উপাদান বলেছেন। মূলগতভাবে গ্রটস্কির নিরাভরণ থিয়েটার শুধু দর্শক এবং অভিনেতার
দ্বারাই গঠিত হয়। এই উভয়পক্ষের
ওপরই গ্রটস্কির থিয়েটারের সৃজনিক কুশলতা। তবে এক্ষেত্রে গ্রটস্কি দর্শককে পদ্ধতিগতভাবে যতটা প্রশিক্ষিত করে না তুলতে
পেরেছেন তার চেয়ে
সমধিক প্রশিক্ষিত করতে পেরেছেন অভিনেতাকে। গ্রটস্কির থিয়েটার ল্যাবরেটরিতে অভিনেতারা কীভাবে প্রশিক্ষিত হয় এবং
অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাদের কাজটা কী, সেটা আমাদের বোঝা খুবই জরুরী। গ্রটস্কি তাঁর এই কাজ
সম্পর্কে বলেছেন যে, শরীরের অনেক গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিনয়
করতে সবাই পারে। কিন্তু সেই প্রকৃত অভিনেতা যে শরীরকে
নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে গড়ে
তুলতে পারে অবলীলায়। যে শরীর
দিয়ে মননের সত্যোপলব্ধির শুদ্ধপ্রকাশ সম্ভব, একজন অভিনেতা যদি সেই শরীরকে টাকার জন্য কিংবা একান্তই দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবহার করে তাহলে সেটা হবে গ্রটস্কির
মতে নিছক বেশ্যাবৃত্তি। এ প্রসঙ্গে
তাঁর মতে শত
শত বছর ধরে
কোনো না কোনোভাবে
থিয়েটার বেশ্যাবৃত্তির মতোই ব্যবহৃত হচ্ছে। অপরপক্ষে, একজন পাপী যেভাবে একজন সাধকে পরিণত হয় ঠিক
সেভাবেই একজন অভিনেতাও তার দুর্দশাগ্রস্ত
অবস্থা থেকে এক পবিত্র, শক্তিশালী স্তরে নিজেকে উত্তীর্ণ করতে পারে।
গ্রটস্কি একজন অবিশ্বাসী হয়েও পবিত্র অভিনেতার কথা বলেছেন।
গ্রটস্কি বর্ণিত এই পবিত্রতা হলো মুক্তি ও প্রগতির পবিত্রতা। এই পবিত্রতা
আসলে অভিনেতার প্রশিক্ষণ-পদ্ধতির নির্যাসের নামকরণ। এই প্রক্রিয়ায় অভিনেতা নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, নিঃশেষ করে নিজেকে
খাঁটি করে তোলে।
এটা হলো একটা
সাধনপ্রণালী যার মাধ্যমে
অভিনেতার মনস্তাত্ত্বিক সকল বাধা দূরীভূত হয়। এই
আত্মদগ্ধতার প্রক্রিয়ায় অভিনেতা নিজের প্রাত্যহিক পার্থিব প্রবৃত্তির উন্মোচন করে যেটা বিপরীতে দর্শকের মধ্যেও সঞ্চায়িত হয়। গ্রটস্কির থিয়েটার ল্যাবরেটরি প্রকৃতপক্ষে অভিনেতার মধ্যে জেগে থাকা এক অলৌকিক
উদ্দীপনার শিরোনাম। মঞ্চে একজন পবিত্র অভিনেতা উদ্দীপিত হলেই বলা যায় যে,
সে শরীর দেখাচ্ছে না নিজেকে
উৎসর্গ করছে। একজন পবিত্র অভিনেতা (Holy Actor) বা
নিবেদিত অভিনেতার মধ্যে তিনটি উপাদান রয়েছে বলে গ্রটস্কি উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো- আত্মখনন, আত্মোন্মোচন ও আত্মোৎসর্গীকরণ। এই তিনটি উপাদান অভিনেতাকে পৃথিবীর সাধারণ ও বহুল ব্যবহৃত কোনো জায়গার পরিবর্তে মানুষের স্বপ্ন ও বাস্তবতার এক বিশেষ সীমান্তরেখায় নিয়ে যায়। একজন কবির শব্দ বা ভাষা নির্মাণের মতোই একজন অভিনেতাকেও ধ্বনি ও শরীরভঙ্গির
মাধ্যমে নিজস্ব মনোবিশ্লেষণাত্মক ভাষা তৈরি করতে পারতে হবে। গ্রটস্কির পবিত্র অভিনেতার গন্তব্য থিয়েটারের এই ভাষা
নির্মাণের শেষতম বিন্দুর দিকে। গ্রটস্কির পবিত্র অভিনেতা এই থিয়েটার
ভাষার শেষ বিন্দুতে
এসে শরীরের উপর এক অলৌকিক
নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে।
যেখানে অভিনেতার শব্দ, শরীর ও চিন্তা একটি সরলরেখার একই প্রকাশবিন্দুতে অবস্থান করে। গ্রটস্কির থিয়েটার প্রসঙ্গে এই বিশ্লেষণটুকু
সংগ্রহ করেছি ইস্রাফিল শাহীনের একটি অনবদ্য লেখা থেকে। তিনি বলেছেন, “জর্জি গ্রটস্কির থিয়েটার ল্যাবরেটরি প্রকৃতপক্ষে এক দুঃসাধ্য
কিন্তু সম্ভবপর থিয়েটারেরই সমার্থক। এক্ষেত্রে অভিনেতাই সবকিছু। প্রকৃতপক্ষে একজন পবিত্র অভিনেতা নিজের ভষ্মের মধ্যে ফিনিক্স পাখির মতোই উত্থিত হয়”।
সত্যি কথা বলতে কি, পাশ্চাত্যের গ্রটস্কির থিয়েটার ভাবনার মধ্যে প্রাচ্যের রবিঠাকুরের জীবনদর্শনের এক অপরূপ
সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। রবিঠাকুরও বিশ্বাস করতেন প্রতিটি শুদ্ধ মানুষের মধ্যে এক মুক্তিস্বরূপ
সত্তার অধিষ্ঠান রয়েছে। এ ‘আমি’র আবরণ
স্খলিত হলে তবেই
চেতনার শুভ্র জ্যোতির বিচ্ছুরণ সম্ভব। প্রতিটি মানুষেরই দেহগত সসীমতা থেকে মননগত অসীমতার দিকে অভিযাত্রা রয়েছে। রবিঠাকুর সসীম থেকে অসীমে এবং অসীম
থেকে সসীমের খণ্ডতায় প্রত্যাবর্তন করতে চেয়েছেন বারবার। সে কারণেই তিনি বলেছেন- ‘আমার কাব্য সাধনার একটিমাত্র পালা। সে পালার নাম সীমার মধ্যে অসীমের মিলন সাধনের পালা’। গ্রটস্কির থিয়েটারও আসলে তাঁর সাধনার একটি মাত্র পালা সে পালার
নামও চৈতন্যের উদ্ভাসনের পালা।
তথ্যসূত্র: Towerds a Poor
Theatre : Jerzy Grotowski_ Methuen Ltd. London 1975
গ্রটস্কির থিয়েটার ল্যাবরেটরি : অভিনেতার আধ্যাত্মিক পথ পরিক্রমাঃ ইস্রাফিল শাহীন.




0 Comments