চলে গেলেন সোনারপুর তথা বাংলার নাট্য জগতের কিংবদন্তী অভিনেতা ও নির্দেশক রমেন দেব



 


প্রলয় চক্রবর্তী  :  রমেন দেব, ৭৭ বছর বয়সে গত ১৬/০৫/২০২০ সন্ধ্যা ৭টায় চলে গেলেন না ফেরার দেশে | লুঙ্গি পরে, গায়ে একটা সাধারণ হাফ শার্ট - যার অর্ধেক বোতাম খোলা, হাতে প্রজ্বলিত বিড়ি, বাজার করে ফেরার পথে হরিনাভি মোড়ে চায়ের দোকানে বললেন 'বড় কাপে একটা ছোট চা দে ' - যেন একজন এলেবেলে মানুষ | কাজে যাওয়ার পথে ওখানে বসে থাকতে দেখে কাছে গিয়ে একটা প্রণাম করলাম | পাশে বসা মানুষগুলোর যেনো চমক লাগলো, প্রশ্নালু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে - 'একে হঠাৎ প্রণাম কেনো? ' 'প্রণাম',  কারণ আমরা যারা ওনার পায়ের কাছে বসে থিয়েটারের পাঠ নিয়েছি তাঁরাই জানি 'রমেন দেব' কি, কেনো তিনি প্রণম্য | সোনারপুর তথা বাংলার নাট্য জগতের এক কিংবদন্তী অভিনেতা, নাট্য নির্দেশক ও নাট্য শিক্ষাগুরু |


রামেনদার মুখ থেকে শোনা ওনার অতীত : ১৯৬০ সালে ১৯ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "শারদ উৎসব " নাটকে লংকেশ্বরের ভূমিকায় অভিনয় দিয়ে শুরু | ওই বছরই কুমারেশ ঘোষের 'ম্যানিয়া' মঞ্চস্থ হবে হরিনাভি স্কুলে, কিন্তু দলের একটা নাম দরকার | অবশেষে সঙ্গী অমর  চক্রবর্তী, অরুন কর, স্বপন ভট্টাচাৰ্য ও আরও কয়েকজনকে নিয়ে তৈরী করলেন "হরিনাভি আমরাকজন " নাট্যদল | প্রতিবছর একটি করে নতুন প্রযোজনা করতেন গ্রামের যুবকদের নিয়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওনার জন্য বরাদ্দ হতো মুখ্য চরিত্র | 
      শম্ভু মিত্র ও অমিত মৈত্র রচিত "কাঞ্চনরঙ্গ" হরিনাভি স্কুলে অভিনীত হলো | পাঁচু র চরিত্রে রামেনদা এবং বিপরীতে 'তরলা' চরিত্রের জন্য আনা হলো  ষ্টার লেন থেকে পেশাদার অভিনেত্রীকে | নাটক শেষে সেই অভিনেত্রী বললেন - 'এই নাটকটিতে আমি ছয়টি পাঁচু র বিপরীতে অভিনয় করেছি, তারমধ্যে আপনিই সেরা '| গণনাট্যে যুক্ত হয়ে গ্রামবাংলায় প্রচুর পথনাটক করেছেন | দুদিকে হ্যাজাক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো সংগঠকরা, ছাইয়ের গাঁদায় উঠে অভিনয় করতেন |

 
মঞ্চাভিনয় ও নির্দেশনায় অনবদ্য প্রতিভার ছাপ রেখেছেন যে সকল নাটকে তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - 'তাসের দেশ', 'এক যে ছিলো রাজা',  'অভিনয়',  'অবশেষে', 'অংশীদার', 'থানা থেকে আসছি' তে তিনকড়ি হালদারের ভূমিকায়, 'সাজানো বাগান', ' ভজ কেরোসিন',  'আসামী হাজির ',  'একটি অবাস্তব গল্প', 'বায়েন',  'চোরেদের লজ্জা হলো' প্রভৃতি | রামেনদা বললেন, 'নানা রঙের দিনগুলি' তে রজনী চাটুজ্জের ভূমিকায় অভিনয় করবো, অনেকে বললেন অজিতেশ বাবুর অভিনয় একবার দেখে এসো | আমি ভাবলাম নিজের মতো করবো, ওনার অভিনয় দেখে প্রভাবিত হতে পারি - বাকিটা ইতিহাস | বললেন, 'দুই মহল ' নাটকে 'লালুয়া' র চরিত্রে অভিনয় দেখে 'সোনারপুর কৃষ্টি সংসদ' এর প্রাণপুরুষ ডঃ সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত পিঠ চাপড়ে বললেন 'তুমি তো কৈলাশ হে ', বলার সময় চোখের কোলটা চিক চিক করে উঠলো | এমন ছোট ছোট পাওয়া ওনার জীবনে অনেক বড় হয়ে থেকে গেছে | কেবল ওনার অভিনয় দেখার জন্য এতো মানুষ এই সকল প্রযোজনা দেখতে আসতো যে উদ্যোক্তাদের নতুন করে খাতার পাতা ছিঁড়ে  টিকিট বানাতে হতো |


       দীর্ঘদিন উনি তরুণ রায়ের দলে কাজ করেছেন | সেখানে থিয়েটার এর শিক্ষা পেয়েছেন তরুণ রায়, উৎপল দত্ত, শোভা সেন, অজিত কর প্রমুখের কাছে | বিশ্বরূপা তে অভিনীত 'আগন্তুক', 'মুখোশের আড়ালে' প্রভৃতি নাটকে বলিষ্ঠ অভিনয় সত্ত্বার পরিচয় দিয়েছেন | ইন্দ্রপুরীতে  চলচ্চিত্র পরিচালক দিলীপ রায়ের সহকারী হিসাবে কাজ করার সময় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের সান্নিধ্যে আসেন | উনি ওঁকে নিজের দলে অভিনয় করার প্রস্তাব দেন | না না কারনে তা আর হয়ে ওঠেনি |


        আমরা ঠিক করেছি 'তৃতীয় নয়ন ' নাটকটি করবো | যখন প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, তখন ঠিক হলো রামেনদাকে এনে পুরো রিহার্সাল দেখিয়ে ওনার মতামত নেয়া হবে | অসুস্থ, অশক্ত শরীরে কোনোমতে এলেন | খুব মনোযোগ সহকারে দেখলেন | রিহার্সাল শেষে আমরা সকলে ওনার পায়ের কাছে বসলাম ও জানতে চাইলাম যে কার কি ত্রুটি হচ্ছে বলো | সবাইকে ছেড়ে উনি 'ধনবাহাদুর' বলে একটি চরিত্র নিয়ে পড়লেন | রাধেদা চরিত্রটিতে অভিনয় করছিলেন এবং সংলাপ বা উপস্থাপনার দিক থেকে চরিত্রটির তেমন গুরুত্ব ছিলো না | উনি উঠে লুঙ্গি কোঁচা করে হেঁটে দেখালেন পাহাড়ি মানুষ কেমন ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটে - সেই মুহূর্তটি সেদিন ওই রিহার্সালে উপস্থিত আমরা কেউ জীবনে ভুলবো না | রাধেদা অত্যন্ত পরিশ্রম করে সেই হাঁটা খানিকটা রপ্ত করলেন এবং মঞ্চে তা ব্যবহার করলেন | ওই নাটকটি বিশেষত ধনবাহাদুরের ওই হাঁটার জন্য দর্শক মনে দাগ কেটে গেলো | রমেনদার ওই সামান্য ছোঁয়া একটি দৃশ্যকে কতটা বাস্তব করে তুলতে পারে তা খুব কাছ থেকে সেদিন দেখেছিলাম | এইভাবে হাতে ধরে বহু অভিনেতা উনি তৈরীও করেছিলেন | 


      শেষকরি থিয়েটার নিয়ে রমেনদার উপলব্ধি দিয়ে | প্রতিভার সাথে আত্মনিয়োগ ও কঠোর অনুশীলন ওনার শিল্পকর্মের মূলকথা | যখন প্রশ্ন করলাম নতুন নাট্যকর্মীদের জন্য তোমার কি বার্তা? বললেন, "থিয়েটারের কাছে কিছু আশা করবে না, থিয়েটারকে শুধু দিয়ে যেতে হবে নিজে নিঃস্ব হয়ে | তোমার জন্য পরে থাকবে বেদনা, আনন্দ মিশ্রিত দ্যোতনা | এবং দর্শক প্রশংসা করলে মনকে বোঝাবে তোমার তো আরও অনেককিছু দেয়ার ছিলো, এই অতৃপ্তির মধ্যেই শিল্পীর বাস "| অনেক কথাই এই পরিসরে না বলা থেকে গেলো, আর যবনিকা পড়ল আদ্যন্ত থিয়েটার নিবেদিত প্রাণ সকলের প্ৰিয় রামেনদার ঘটনাবহুল জীবনের | বাংলা রঙ্গমঞ্চ হারালো তার এক সহযোদ্ধাকে |
                     

Post a Comment

0 Comments