নিজস্ব সংবাদদাতা : ওরা লোকশিল্পী । সারাবছর সংসারে ওদের অভাব-অনটন লেগেই থাকে । শিল্পের মরশুমে যা রোজগার হয় তা দিয়ে সারাবছর পরিবারের পেট চালানোই দায় ! এরমধ্যে আবার করোনা মহামারীতে বিভিন্ন লোকশিল্প যেমন গাজন, কীর্তন, ছৌ, নাটুয়া ইত্যাদি সমস্তটাই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্পীদের পরিবারে জীবন-জীবিকার দূরাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ।
এরকমই একজন শিল্পী রমেশ হালদার । তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে একটি কীর্তন দলের নিয়মিত খোল বাদক এবং এলাকার শববাহী শ্মশান যাত্রা পথের কীর্তনেও খোল বাজিয়ে থাকেন । ছয় সদস্যের সংসারে রমেশ বাবু একাই রোজগার করেন । কীর্তন দলে খোল বাজিয়ে বার্ষিক চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা ও শব যাত্রায় খোল বাজিয়ে বার্ষিক বারো-পনেরো হাজার টাকা রোজগার করতেন । কিন্তু করোনা সংকট কালে পুরো লকডাউন এর সময়ে কীর্তন এবং শববাহী যাত্রায় সমস্ত রোজগার বন্ধ হয়ে গিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ।
অন্যদিকে গাজন শিল্পী হামিদ মন্ডল গত চল্লিশ বছর ধরে একজন কাহিনীকার, গাজনের গান লেখক এবং সুরকার । প্রতি বছর চৈত্র মাসের গাজনে তিনি প্রায় পঞ্চাশ, ষাটটি দলে গাজনের গান ও ছক দিয়ে থাকেন । কিছু বড় বড় দলও তার কাছ থেকে গান ও ছক নেয় । তার বিনিময় ছোট দলগুলোর কাছ থেকে এক হাজার টাকা করে মোট প্রায় পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা এবং বড় দলগুলি মিলিয়ে আরও অতিরিক্ত পনেরো-কুড়ি হাজার টাকা রোজগার করেন । এই টাকাতেই সারাবছর ধরে পাঁচ জনের সংসার কোনমতে চলে যায় । কিন্তু এবছর লকডাউন চৈত্র মাসে গাজন না হওয়ায়, তার রোজগার সারা বছরের মতো শূন্য হয়ে গেছে । কিভাবে চলবেন সারা বছর সেই চিন্তায় তার দিন কাটছে ।
এরকমই অনেক ঘটনা আমাদের আশেপাশেই আছে । প্রত্যেকটি লোকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের পরিবারে প্রায় একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সামান্য রোজগার করে তারা যেভাবে সারাবছর চালান, সেই রোজগার টুকু যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না । এরকমই মোট ২৬ জন শিল্পীর পরিবারের পাশে এসে দাড়ালো 'জনসংস্কৃতি সেন্টার ফর থিয়েটার অফ দি অপ্রেসড' । তারা এই ২৬ টি পরিবারকে আগামী চার মাসের জন্য সমস্ত রকম খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করার দায়িত্ব নিয়েছেন । এই মহৎ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সমস্ত শিল্পীমহল । জনসংস্কৃতির নির্দেশক ডঃ সঞ্জয় গাঙ্গুলী জানান, আমরা করোনা মহামারী এবং আমফান দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন রকম কাজ করছি । ইতিমধ্যেই সুন্দরবন এলাকার বেশ কয়েকটি জায়গায় ত্রাণ বিলি করা হয়েছে । প্রস্তুতি চলছে আরও কিছু জায়গায় পৌঁছনোর । তারই মাঝে এই ২৬ টি শিল্পী পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া হলো । প্রয়োজন ছিল সকল শিল্পীর দায়িত্ব নেওয়ার, কিন্তু আমরা আর্থিকভাবে পেরে উঠলাম না, তবুও চেষ্টায় আছি যদি আরো কিছু পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া যায় । সমস্ত মানুষের কাছে আমি আবেদন জানাচ্ছি, আপনার বাড়ির আশপাশে কোনো না কোনো শিল্পী আছেন, তাদের খোঁজ করুন এবং এলাকার কিছু পরিবার একজোট হয়ে এই সংকটময় সময়ে তাদেরকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করার দায়িত্ব নিন । শিল্পীদের সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব ।' লোকো শিল্পী হামিদ মন্ডল জানান, এই অসময়ে জনসংস্কৃতি যেভাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আমরা তাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকব ।


0 Comments