'তোর বাবাকে বলগে যা' - চন্দননগরে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে সুপারহিট যাত্রাপালা



লা সোসিয়েতে দ্য পারেসে ও নৃপেন

পর্ব - ২


নিশি রাতের কান্না। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে। নাম ভূমিকায় মনোজ কুমার। সুপারহিট, যাত্রাপালা। 

এইরকম একটা পোস্টার পড়ে গেল আমাদের শহরে। সবাই চেনে "মনোজকুমার" নামধারী মনোজ পাল-কে। একজন আপাদমস্তক যাত্রাপাগল মানুষ। সে নিজে যাত্রাপালা লিখবে, নিজেই পরিচালনা করবে, নিজেই মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করবে। ছোটোখাটো একটা ব্যবসা করে সংসার চালাত সে। কিন্তু ব্যবসার থেকেও অনেক বেশী মন, প্রাণ ছিল তার যাত্রাপালা লেখার, পরিচালনা আর অভিনয় করার। রাস্তায় যখনই তাকে দেখা যেত, আমরা দেখতাম মনোজদার বগলে একটা লম্বা, মোটা খাতা। জিজ্ঞাসা করলে বলত, এটা নতুন পালা, লিখেছি, সামনের অমুক মাসে প্রথম গাইব। যাত্রায় অভিনয় করব বলে না, বলে গাইব। "আজ আমাদের গান আছে"- মানে, আজ আমাদের অভিনয় আছে। তাই পালাগান। কখনও ইংরেজী মাস দিয়ে "গান"- এর তারিখ ঠিক হয়না, হয় বাংলা মাসের নাম দিয়ে। মনোজদার নিজের একটা যাত্রার দল ছিল - 'সপ্তসুর'। যাত্রা বা থিয়েটার বা অভিনয়ের প্রতি তার এই তীব্র প্যাশন অনেকের কাছেই হাসির খোরাক ছিল - বিশেষ করে তাদের কাছে, যারা ঐ বিষয়টা কিছু জানেই না বা বোঝে না।



নিশি রাতের কান্না, নামভূমিকায় মনোজকুমার আর প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে - এই দুটো কথা মনোজদাকে রাস্তাঘাটে আরো হাসি  বিদ্রুপের করে তুলল। সবাই জিজ্ঞাসা করতে লাগল, তুমি তো নামভূমিকায় করবে, কোনটা করবে "নিশি", "রাত" না কি "কান্না"?তুমি সেন্সর বোর্ড থেকে "A" মার্কা সার্টিফিকেট কি করে বার করলে? তোমার যাত্রা তো শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, কি করে বুঝবে কে প্রাপ্তবয়স্ক ইত্যাদি নানা প্রশ্ন, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ধেয়ে আসতে থাকল মনোজদার দিকে। মনোজদার তাতে কিছু আসত না। মনোজদা যাত্রার স্ক্রিপ্ট বগলে নিয়ে হাসতে হাসতে চলে যেত। এরকম নাট্যকার কি রঙ্গমঞ্চ আগে কখনও দেখেছে! 


দেখেছে বইকি। নিশ্চয়ই দেখেছে। বঙ্কিমচন্দ্র তখন বেঁচে। তাঁর "সীতারাম" উপন্যাসের নাট্যরূপ বেঙ্গল থিয়েটারে অভিনীত হচ্ছে। নাট্যকার / পরিচালক সীতারাম উপন্যাসের সঙ্গে নাটকের পার্থক্য ঘটালেন। শেষে গিয়ে সীতারামের সঙ্গে শ্রীর মিলন হলো। তাছাড়া জয়ন্তীর সঙ্গে মৃন্ময়ের বিয়ে দেখানো হলো। সন্ন্যাসিনী জয়ন্তীর বিয়ে দেখানো হলো কেন - এই প্রশ্নের উত্তর নাট্যকার / পরিচালক বলেছিলেন, "বঙ্কিমচন্দ্র জয়ন্তীকে সারা জীবন সন্ন্যাসিনী রেখে ঠিক করেন নি। তার মতো এক সুন্দরী যুবতী চিরকাল গেরুয়া পরে হাতে চিমটে নিয়ে কাটাবে এটা ঠিক নয়। তাই বঙ্কিমের অবিচার দূর করতেই "সীতারাম"-এর নাট্যরূপে এমন পরিবর্ত্তন ঘটানো হল"। নাট্যকারের ক্ষমতা!!


যাত্রায় যেখান দিয়ে অভিনেতারা প্রবেশ / প্রস্থান করেন, সেই জায়গাকে "গেট" বলে। অভিনেতারা প্রথমবার অভিনয়ের জন্যে মঞ্চে প্রবেশ করার সময় ঐ "গেট" কে নমস্কার করেন এবং সংলাপ বলতে শুরু করেন। বিশেষ করে পাড়ায় যাত্রা হবার সময়, ঠিক ঐ সময় কোনো কোনো অভিনেতাকে দর্শক আসন থেকে নানাভাবে বিরক্ত করার চেষ্টা হতো, চিৎকার করে বা তার নাম ধরে চেঁচিয়ে ইত্যাদি। 



পাড়ায় যাত্রা হচ্ছে। দর্শক খুব মন দিয়ে যাত্রা দেখছে। মনোজদা অভিনয় করছে। সে করছে একজন পুলিশের চরিত্র। পরনে হাফপ্যান্ট, মাথায় শোলার টুপি, জুতো-মোজা। মনোজদা ঐ গেটে নমস্কার করে সংলাপ বলতে যেই শুরু করবে, তখনই দর্শক আসন থেকে কেউ একজন ভয়ঙ্কর চিৎকার করে বলে উঠল, "ম-নো-জ-কু-মা-র।" মনোজদা সেই চিৎকার শুনে কি করল? নার্ভাস না হয়ে সংলাপ শুরু করল? না কি রোষ কষায়িত দৃষ্টিতে দর্শক আসনের দিকে তাকাল? এসব কিছু না করে মনোজদা ঐ দর্শকের থেকেও আরো জোরে চিৎকার করে বলল, "তোর বাবাকে বলগে যা"।

    আজকের পর্দা এখানেই পড়ল।   চলবে...



লেখক : তুষার ভট্টাচার্য

'ক্লাসিক' চন্দননগর নাট্যসংস্থার সঙ্গে যুক্ত ১৯৭২ সাল থেকে, ভালোবাসেন থিয়েটার । থিয়েটারের যেকোন কাজই প্রিয় কাজ তার ।
২০০১ সালে সরকারী চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন, আজও যুক্ত আছেন থিয়েটার চর্চায় ।

Post a Comment

0 Comments