টেকনিশিয়ান পলু বাগদী লকডাউন এর মধ্যে ভিন রাজ্যে আটকে পরে মারা গেল, ঘরে ছ'মাসের ছেলে


অনুভব করলে সত্যি ঘটনা

অশোক ঘোষ

(নির্দেশক, থিয়েটার্স ওয়ার্কাস)

মাটির দাওয়াতে একটা বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা পলু বাগ্দীর ছেলেটা, কতো আর... এই তো মাস ছয়েক আগে জন্মেছে.... ! কোমরে ঘুমসি কবজ, আগেকার দিনের ফুটো তামার পয়সা, শেকড় ইত্যাদি বাঁধা !
তার ওপর থেকে একটা কাপড়ের আঁচল ছেঁড়া দিয়ে হামাগুড়ি দিতে শেখা কচি টাকে বেঁধে রাখা, যাতে নিচে পড়ে না যায় !


অদূরে পলুবাগ্দীর উঠুনে বহু পুরনো মোটা একটা আম গাছ, গরমের দিন গাছে ছোটো ছোটো আম ধরেছে !সেই গাছের গোড়ায় বসে পলুর বউ গোবর ছাই আর কুঁচো খড় মিশিয়ে দু হাতে চটকাচ্ছে.... একটু পরে ঘুঁটে দেবে ওই মোটা আম গাছের গোড়ায়, গাছের যতদূর হাত যায় তার !
ছেলেটা চিল চিৎকার দিচ্ছে, হিসি করে সেটা দু হাতে থাবড়াচ্ছে... হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের কাছে আসতে চায়, পারেনা... কোমরের বাঁধা দড়িতে টান পড়ে, আর চিৎকার করে কাঁদে সে.., . নাক দিয়ে সর্দি ঝরছে অঝোরে !


ছবি : সৈকত ঘোষ ফেসবুক প্রোফাইল


দুর থেকে আরতি মানে পলুর বউ... ছেলেকে নানা শব্দ করে, কথা বলে ভোলানোর চেষ্টা করেও পারে না !
... "ওলে বাবলে, ছোনা রে, পুন্তু  আমার, কাঁদে না.."এক তাল গোবর নিয়ে থপাস করে গাছে মারে...., এভাবেই চলছিল বেশ কিছুক্ষন ধরে, প্রায় অর্ধেক মাখা গোবর শেষ হলে আরতি ছেলের কাছে আসে.... কচির ক্ষিদে মেটাতে !
ব্লাউস ছাড়া একটা আধ ময়লা কাপড় পরা আরতি কোনোরকমে কনুই দিয়ে কাপড় সরিয়ে আদরের কচি কে বুকের দুধ দেয়... বাচ্চা নিপ্রানে দুধ টানতে থাকে !



... "আমি ঠিক বুজেছি.. চোনাল ক্ষিদে পেয়েছে.. কাও, কাও,খেয়ে খেলু খেলু করো... আমি বাকী গোবর টা দিয়ে দি... !"
যথারীতি ঘুঁটে দেওয়ার কাজে মন দেয় আরু, ও বলা হয়নি আরতির স্বামী আরু বলেই ডাকে আরতিকে !
এখন কচি টা খেলছে আপন মনে !পেটের জ্বালা টা আর নেই... দুর থেকে পলুর গলা ভেসে আসে... "কোথা গেলিরে আরু, তোর গোবর দেওয়া হোলো? 


পুকুর থেকে স্নান সেরে ঘরে আসে পলু, কচির দড়ি খুলে তাকে কোলে নিয়ে নাকের সিগনি নিজের জামাদিয়ে মুছে উপর্যপুরি চুমু খেয়ে আদরে ভরিয়ে দেয় কচি কে ! পুকুর ঘাট থেকে হাত ধুয়ে আরু আসে... কচি কে পলুর কোল থেকে  নিয়ে ঘরে গিয়ে পিঠ চাপড়ে ঘুম পাড়ানির ছড়া বলে... কচি ঘুমিয়ে পড়ে !
দাওয়ায় পলু কে খেতে দেয় আরু ! পলু মন দিয়ে ভাত খেতে খেতে বলে... "সাতদিনের বাজার কোরে দিলাম... "
সাতদিন ঘর আসবেনি,
--- কচি কে নিয়ে একা থাকবো ? 
... "সাতদিন ? যখন বলি তখন তো মন দিয়ে শোনো না, সাতদিন শুটিং, ট্রেন এ যেতে দেড় দিন আসতেও তাই... বাকী তিন দিন মেথার দোকান থেকে যা লাগবে এনে নেবে !"




ভাল্লাগেনে... কচির দুধ ? 
"ধাঙড়ে পিসির কাছ থেকে দু পোয়া করে নিয়ে নেবে... আমি ফিরে এসে পয়সা দোবো... আর তাকের ওপর 500 টাকা রেখেছি.. !" 
উঠে পরে পলু হাত ধুতে ঘাটে যায় !
এই কটা ভাত আর উনি খেতে পারলে নে, এই এঁটো ভাত টা আমায় গিলতে হবে, দশ দিন কচি কে নিয়ে... 
"কী ভাক ভাক করছ, এর আগে থাকোনি !"
তখন তো কচি ছেলোনি ? যখনই শুঁটিন এ যেতে... আমার মাকে এনে রেকে যেতে !
... "সেরম মনে হলে ডেকে নাও তোমার মাকে... যে কদিন আমি না আসি.. এখানে থেকে যাক বুড়ি.. "
মাকে বুড়ি বোলবেনে বলে দিলুম...
--- বুড়ি !
---রেগে গজরাতে গজরাতে আরতি থালা বাসন তুলে ঘাটে যায়.... পলু হাসতে হাসতে একটা বিড়ি ধরিয়ে পাশে থাকা ফোন তুলে শাশুড়ি কে এখানে কদিনের জন্যে আসতে বলে... শুটিং এর কাজে বাইরে যাচ্ছে বলে জানায় !



জামা কাপড় পরে, বড় লাগেজ ব্যাগে টুকিটাকি কিছু জিনিস ঢুকতে ব্যস্ত হয়ে পরে সে !
পলু শুটিং এর একজন মজদুর বলা যায়..! অনেকদিন সে এ লাইনে আছে, মাধ্যমিক পাস করেই জীবিকার সন্ধানে কোলকাতায় ছোটে... বেশ কিছুদিন বিখ্যাত আলোকশিল্পীর ছেলে জয়রাজ এর কাছে কাজ করছিলো... হঠাৎ গাড়ি দুর্ঘটনায় জয়রাজ এর মৃত্যু তার জীবনের মোর ঘুরিয়ে দেয় !
যোগাযোগ হয় ষ্টুডিও পাড়ায়, মজুরের কাজে যোগ দেয় সে !কখনো ট্রলি ঠেলা, কখনো আলোর স্ট্যান্ড ধরা, শুটিং এর জুতো সেলাই থেকে চন্ডি পাঠ যত রকমের মজদুরী সব কাজে হাত পাকিয়ে এখন পাকাপাকি ক্যামেরা কেয়ার টেকার এর কাজে সে সফল.... ক্যামেরার আঙ্গেল সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরী হয়ে গেছে তার, যার ফলে প্রচুর হাউস তাকে ডাকে, প্রচুর চিত্রগ্রাহক আবার পলু কে ছাড়া কাজ করতে চায় না ! যখনি কোথাও ক্যামেরা বুক করে কোনো হাউস তখনই  জানিয়ে দেয় তাদের ক্যামেরাম্যান পলু কেই চায় কেয়ার টেকার হিসেবে... !
ব্যাগ কাঁধে বেরোবার সময় আরু কে কাছে ডাকে পলু... কচি ঘুমোচ্ছে ! আরতির চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে... পলু বুকের কাছে টেনে নেয় তার আরু কে... 

..."দুর বোকা, কাঁদছো কেন  ! মোটে দশ দিন.. তোমার মা কাল সকালেই আসছে... ফোন এ পয়সা ভরে দিয়েছি." 
কতো বললাম আমায় ফোন এ ধোরা কোরা টা শিককে দাও... !
ফোন নিয়ে আসে আরতি, সবুজ টা টিপবে যখন ফোন আসবে এটা বুঝিয়ে বেড়িয়ে পরে পলু !
স্টেশন এর বেঞ্চে বসে বিড়ি খেতে  খেতে ভাবছিল পলু বাড়ীর কথা ! কচিটার জন্যে সত্যি মনটা ছটপট করে ওঠে তার.... ট্রেন ঢোকার শব্দে বিড়ি টাকে পায়ে থেঁতলে একটা কামরায় উঠে যায় পলু !
হাওড়া নেমে বড় ঘড়ির উদ্দেশে পা বাড়ায়.. ওখানেই ইউনিটের সকলে আসবে !




দূরপাল্লার ট্রেন এ নির্দিষ্ট কামরার বরাদ্দকৃত জায়গা খুঁজে বসে যায় পলু !
ট্রেন ছুটে চলে গন্তব্যে !
প্রথম দিন নেমে শুটিং স্পটের পাশে একটা থাকবার জায়গা দিয়েছে তাদের টেকনিসিয়ান দের, পলুর ঘরটা একদমই পছন্দ নয়... সবাই থাকবার অব্যবস্থা নিয়ে নানা ক্ষোভ উগরে দেয় প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাছে, নির্বিবাদী পলু ভেবে চলে তার কচির কথা!
চার দিনে পড়লো শুটিং, এখনো তিন দিন... !
ওদিকে পলুর শাশুড়ি এসেছে মেয়ের ঘরে, আরতি সংসার সামলায় আর কচি কে সামলায় তার মা !
এভাবেই চলছিল আরতির সংসার... আর মাত্র একদিন পরেই ফিরে আসবে পলু... প্রতিবার শুটিং সেরে বাইরে থেকে ফিরলে কিছু না কিছু একটা নিয়ে আসে পলু, কচি আসবার পর টানা দশদিন এই প্রথম... মন টা আনন্দে নেচে ওঠে তার, কচির জন্যে কিছু একটা আনবে পলু... এসব নানান সাতপাঁচ ভাবতে দুপুরে চোখ টা লেগে গেসলো... পাড়ার লোকদের চিৎকারে উঠে বাইরে এসে যা জানলো তাতে করে আঁতকে উঠলো আরতি.... কাল থেকে দোকান বাজার বন্ধ, ইস্কুল কলেজ ছুটি, গাড়ি ঘোড়া নাকি সব বন্ধ... এমন কী বাড়ি থেকে বেরোতে দেবে না কাউকে... মাথায় যেন বজ্রাঘাত পড়লো আরতির... দাওয়ায় ধপ করে বসে পড়লো...., ঘরে ঢুকে কাপড় টা ঠিক করে পরে বেরিয়ে গেল মাকে বলে!



পাড়ার মোড়ে বাসু স্যাকরার দোকানে গিয়ে হাজির... !
.. "কী গো বৌমা এই অসময়ে!"
আমার পায়ের মল টা করতে হবেনে কাকা, তুমি ট্যাকাটা ফিরত দাও !
.. "সে তো তৈরী হয়ে গেছে, পালিশ টা বাকী... কাল থেকে তো সব বন্ধ.. করোনা না কী যেন একটা মারণ রোগ এসেছে.. পলু তো বাইরে ! এখন আর আসতে পারবে নে.. দেখো কী করবে !"
আনমনে বাড়ীর পথ ধরে আরতি, হঠাৎ হাতে থাকা ফোন টা বেজে ওঠে... পলু বাইরে যাবার পর এই ফোন তার নিত্য সঙ্গী... কখন ফোন আসে তাই ফোন সে হাত ছাড়া করে না কখোনো ! এই মাত্র পলুর কথাই ভাবছিলো আরতি... ফোন কানে দেয়, অপর প্রান্ত থেকে পলুর গলা ভেসে আসে... "হ্যালো আরু, কেমন আছো... আমার কচি কেমন আছে? "
দুদিন ফন করোনি কেন !!সবাই ভালো আছে... তুমি.. 
কথা বলতে পারেনা একটা চাপা কান্না ঠিকরে বের হয় আরতির গলা দিয়ে... !
... "আরে কাঁদছো কেন,আমাদের শুটিং বন্ধ আজ থেকেই, গোটা দেশ বন্ধ.. কোম্পানি সবাই কে বাড়ী ফেরার ব্যবস্থা করছে, চিন্তা কোরোনা, এই সপ্তার মধ্যেই ফিরবো !সাবধানে থাকবে, আমি কাল আবার ফোন করবো... !"


হুম, তারপর বহুদিন ফোন এসেছে পলুর... এখন সপ্তাহে একদিন একটু খোঁজ নেয় পলু... ! নায়ক নায়িকা সহ অন্যান্য শিল্পী ও নামি চিত্রকর দের ফেরার বিশেষ ব্যবস্থা করলেও পলুরা কজন এখনো  যমুনার তীরে আশ্রয় নিয়েছে... ! অবর্ণনীয় কষ্টে তাদের দিন কাটছে, খাবার নেই, জল নেই... তার সঙ্গে আছে পুলিশ এর অত্যাচার.. !সম্প্রতি দু একটি রাজ্য তাদের   লোকদের ফিরিয়ে নিয়ে গেলেও পিলুদের যে কবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সে আশাতেই দিন গুনছে !ইতিমধ্যে পিলু তার মোবাইল টা কম দামে বেচে পেটের গর্ত বোঝাচ্ছে.... বাড়িতে একটা ফোন করবে তার উপায় নেই ! রাতে যমুনার তীরে শুয়ে দু চোখের পাতা এক করতে পারে না ! আরু আর তাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ কচির কাছেই মন পরে থাকে... !
বেহুঁশ জ্বর কচির, সারা রাত ধরে জল পটি দেয় আরতি.. জ্বর কমার নাম নেই... পাড়ার মোড়ে দু দুটো ওষুধের দোকানে ডাক্তার বসতো, তারা কেউ আসছে না !


একজনের কাছ থেকে মোবাইল চেয়ে বাড়িতে ফোন করে পলু.... আরতি ফোন ধরে... 
.. "কে আরু, আমি পলু বলছি, এখনো মরিনি গো... প্রাণে বাঁচলে আমি যে ভাবেই হোক পৌঁছবো.. চিন্তা করোনা.. কচি কে লক্ষ রেখো.. কী হোলো কথা বলছো না কেন... এই আরু.', 
 পুলিশ আরতির হাত থেকে ফোন নিয়ে কচির অসুস্থ্যতার কথা জানায়... 
.. "শুনুন, আপনার ছেলে আজ নয়দিন জ্বরে ভুগছে, আপনার স্ত্রীর কাশী থামছে না, আমরা ওদের দুজনকেই হসপিটাল এ নিয়ে যাচ্ছি... ! আর আপনার শাশুড়ি কেও !ফোন কেটে যায় !



ভোরের দিকে পলুর চিৎকারশোনা যায়... "আরু, আমি এসেছি দরজা খোলো... আরু... "
বিছানায় ধরফর করে উঠে বসে আরতি, বিছানা থেকে উঠে দরজা খোলে.... 
পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঁকি দিলেও কিছুটা মেঘ ঢাকা আঁধার.. সামনে দাঁড়িয়ে লোকাল থানার পুলিশ... পলু বাগদি আপনার স্বামী ? 
হুম, আমি তার বউ আরতি দাস... কেন !
 প্রচন্ড জ্বর নিয়ে দিল্লিরএকটা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল.... গতকাল সেখানে সে মারা যায়... 
একটা কাক তারস্বরে ডেকে যায়.... আরতি নিশ্চল পাথর যেন... সকালের সূর্য টাকে ঢেকে দেয় কালো মেঘ... ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসে ওঁয়া ওঁয়া...! চিৎকার করে মাটিতে আছড়ে পড়ে আরতি.... দুটো হাত দিয়ে নিজের বুক টাকে উপর্যুপরি চাপড়াতে থাকে..... !!
আচ্ছা পলুর ছেলে কচির জ্বর কমেছিল... বলতে পারবেন কেউ ?


(একটি কাল্পনিক গল্প, এর সঙ্গে বাস্তবের কোন মিল নেই । কোন ব্যক্তি বা সংস্থা এই ঘটনার মধ্যে নিজেকে খুঁজে নিতে চাইলে তার দায় নাট্যমেব জয়তে পত্রিকার নয়)


অশোক ঘোষ (নির্দেশক, থিয়েটার্স ওয়ার্কাস)


Post a Comment

0 Comments