লোকশিল্পীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাসন্তীর ম‍্যানগ্রোভ থিয়েটার



তিথি দাস

বাসন্তী : প্রতিবার নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে‌ও সমস্ত ঝড়-ঝঞ্জার হাত থেকে সমগ্র বাংলাকে রক্ষা করে সুন্দরবন। বাংলার দক্ষিণাঞ্চল ঘিরে সবুজ প্রাচীরের  মতো দাঁড়িয়ে আছে  ম‍্যানগ্রোভ অরণ‍্য। গত সপ্তাহে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আমফানে বিপর্যস্ত গোটা সুন্দরবনের জনজীবন। সুন্দরবনের  প্রত‍্যেকটি অঞ্চলে অধিকাংশ মানুষ‌ই বর্তমানে গৃহহীন ও নিরন্ন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সংকটে বাসন্তী, গোসাবার লোকশিল্পীরা‌ও। অনাহারে বিনিদ্রভাবে একবুক জলে রাত কাটাচ্ছেন অধিকাংশ লোকশিল্পীরা। এই দুঃসময়ে লোকশিল্পীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে‌ন বাসন্তীর ম‍্যানগ্রোভ থিয়েটারের প্রধান সজল মন্ডল।



আমফান ঝড়ের পূর্বে লকডাউনের কারণে রুটিরুজি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বাসন্তী গোসাবার লোকশিল্পীদের। এই ঝড় তাদের কাছে "মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা"-এর মতো এসে পড়ে‌। লকডাউনে কাজ হারানো লোকশিল্পীদের অধিকাংশ‌ই বিভিন্ন দলের যাত্রাশিল্পী। যাদের একমাত্র রোজগারের পথ হল পালাগান। করোনা আবহে গ্রামে গ্রামে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পুজো-পার্বণ বন্ধ। তাই বন্ধ পালাগান‌ও। পার্বণের সন্ধ্যায় মঞ্চে হয় না ষষ্ঠী‌র পালা, শীতলার পালা, বনবিবির পালা। এই সংকটকালে ভগবান‌ও ঘরবন্দি। এরপর‌ই ঘূর্ণিঝড় আমফান উড়িয়ে দিয়েছে মাথার ছাদ, কেড়ে নিয়েছে মুখের অন্ন, ভাসিয়ে নিয়েছে শেষ সম্বল‌টুকু। লকডাউনের প্রথম পর্যায় থেকেই এরকমই প্রায় ৭০জনের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখেছেন ম‍্যানগ্রোভ থিয়েটারের সজল মন্ডল এবং তার দলের নাট‍্যকর্মীরা। প্রায় নয়বছর ধরে লোকশিল্পীদের সাথে কাজ করছেন সজল মন্ডলের দল। তাঁর কথায়, "পেটের থেকে বড়ো আর্ট কিছু হয় না"। তাই দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন সারা ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। ইতিমধ্যে তিনি ও তাঁর দল খাদ‍্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে‌ন ভাই ভাই নাট‍্যসংস্থা, বনবিবি অপেরা, শ্রীহরি অপেরার শিল্পীদের কাছে।



সজল বাবুর কথায় জানা যায়, আমফান ঝড়ের পর বর্তমানে বাসন্তী গোসাবা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন থেকে। ঝড়ের তান্ডবে মাথায় ছাদ হারিয়েছে‌ন বহুমানুষ, রয়েছে জলসংকট , বিদ্যুৎ ও মোবাইল পরিষেবা ব‍্যাহত। একবুক জলে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেই জল ভেঙে খাদ‍্যের সংস্থানে বেরোচ্ছে বহুমানুষ। সেই মানুষের মুখে অন্নের জোগানের জন‍্য ২৯মে থেকে একটি কমিউনিটি কিচেন তৈরির কথা ভাবছেন ম‍্যানগ্রোভ থিয়েটারের নাট‍্যকর্মীরা। সেখানে প্রায় ১৫০জনের খাদ‍্যসংস্থান করা হবে। এভাবেই যতদিন সম্ভব তারা থাকতে চান সর্বহারা মানুষের পাশে।



ম‍্যানগ্রোভ অরণ‍্য যেমন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে রক্ষা করে চলেছে বাংলাকে। তেমনই ম‍্যানগ্রোভ থিয়েটারের সদস্যরা সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে এক‌ইভাবে ভরসা জুগিয়ে চলেছে সুন্দরবনের লোকশিল্পীদের। সার্থক তাদের নাট‍্যদলের নামকরণ। কঠিন সময়ে সফলভাবে এগিয়ে চলুক তাদের সাহায্যের কর্মকাণ্ড। সেরে উঠুক সুন্দরবন। সুস্থ হোক শিল্পের মঞ্চ। শুভকামনা র‌ইল 'নাট‍্যমেব জয়়তে' পত্রিকার তরফ থেকে।


Post a Comment

0 Comments